মত-বিশ্লেষণ

সমুদ্র ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণের ভূমিকা

পিটার থমসন ও ইসাবেলা লোভিন: ভারতের উড়িষ্যার সমুদ্র উপকূলীয় নারী কৃষকরা সংকটকালকে একটি দারুণ সুযোগে পরিণত করেছেন। সাইক্লোন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি তাদের সম্প্রদায়কে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এছাড়া সেখানকার উর্বর ভূমি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। ফলে বেশ কিছু বছর ধরে তারা আয় করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। এমনকি তাদের স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টির চাহিদা পূরণও হুমকির মুখে পড়েছিল। এতে তারা নিজেদের আরও বেশি প্রান্তিক বা বঞ্চিত বলে মনে করছিল।
পরে লিঙ্গগত উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে তারা একটি উদ্ভাবনী ও সাধারণ সমাধান পেয়ে গেছে। এটি তাদের সম্প্রদায়ের ভাগ্য পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখছে। এসব উদ্ভাবনের মধ্যে দুটি হলো ম্যানগ্রোভ নার্সারি ও ভাসমান বাগান করার উদ্যোগ।
নারীদের দ্বারা ম্যানগ্রোভ নার্সারি পরিচালনার মাধ্যমে তাদের আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এসব নার্সারির গাছ জলাভূমিতে লাগিয়ে সেখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, যা প্রাকৃতিক বায়োশিল্ড বা রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। এগুলো তীব্র ঝড়ের কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস ঠেকিয়ে দিচ্ছে এবং উপকূলীয় অধিবাসীদের জীবন বাঁচিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি তাদের সম্পদও রক্ষা করছে। জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হওয়ার কারণে এসব বনভূমি বিভিন্ন ধরনের দ্রব্য ও সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করছে, যার মধ্যে খাদ্য, উপকরণ ও মাছের মতো জলজ প্রাণীও রয়েছে। এছাড়া এই বনভূমি বিপুল পরিমাণ কার্বন গ্রহণ করছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কাজ করতে সাহায্য করছে।
পানি বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা থেকে ভূমিকে রক্ষা করতে নারীরা বাঁশ ও স্থানীয় অন্যান্য উপকরণের সাহায্যে প্রচলিত পন্থায় এক ধরনের ভাসমান স্থাপনা তৈরি করছে। এসব উপকরণের মধ্যে কচুরিপানা, সার, জৈবসার ও পলি রয়েছে। এই ভাসমান বাগানে তারা মসলা ও সবজি উৎপাদন করছে। সেখান থেকে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি তাদের আয়ের পথও তৈরি হয়েছে।
এই উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে স্থানীয় উন্নয়নকারীরা গ্রামগুলোয় কমিটি করে দেওয়ায়। এসব কমিটিতে স্থানীয় নারী ও পুরুষদের সমান সুযোগ দেওয়া হয়েছে। নারীদের আরও বেশি ক্ষমতায়ন করা হয়েছে, যাতে তারা তাদের সামনে আসা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে। ফলে তারা সমস্যা সমাধানে আরও ভালো অবস্থানে থাকতে পারবে। এ কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে ‘পরিবর্তন’। এই জুতসই ক্ষুদ্র নামটিই সেখানে পুরো সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।
লিঙ্গভিত্তিক এই সফলতার গল্প কিন্তু একক কোনো দৃষ্টান্ত নয়। মেক্সিকো উপসাগরকে ক্যারিবিয়ান সাগর থেকে আলাদা করেছে ইউকাটান উপদ্বীপ। সেখানকার একজন নারীর পুনর্ব্যবহার বিষয়ে সহযোগিতামূলক কর্মকাণ্ড জাতীয় স্বীকৃতি পেয়েছে। এর মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম গতিলাভ করেছে। সেখানকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হাজারো মানুষ জলাভূমি ও সৈকত পরিচ্ছন্ন কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। এতে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
এদিকে ফিলিপাইনে নারীদের উদ্যোগ দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা রাখছে। তাদের মৎস্যবিষয়ক কর্মকাণ্ডের কারণে মাছ উৎপাদন, ম্যানগ্রোভ উন্নয়ন ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এতে সেখানে মানুষের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দরিদ্র মৎস্যজীবী পরিবারগুলোর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। উড়িষ্যা ও ইউকাটানের মতো এ বিষয়টিও জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সমুদ্রকেন্দ্রিক সব ধরনের খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে লিঙ্গগত প্রয়োজনীয়তার কথা মানুষ বুঝতে শুরু করেছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সমুদ্রবিষয়ক সংস্থা এবং ওয়ার্ল্ড মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি সমুদ্র, বন্দর, মৎস্য আহরণ ও সংশ্লিষ্ট শিল্পে লিঙ্গগত শূন্যস্থানের বিষয়টি তুলে ধরা শুরু করেছে। গত মাসে একটি আন্তর্জাতিক নারী অভিযাত্রীদলের যাত্রা শুরু হয়েছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ওয়াইল্ড লাইফ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে। তারা গবেষণার পাশাপাশি জানার চেষ্টা করছে কীভাবে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক গঙ্গা নদী হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পৌঁছায়। তাদের মূল লক্ষ্য হলো প্লাস্টিকপ্রবাহের বিষয়ে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা দূর এবং এর কার্যকর সমাধানের পথ খুঁজে বের করা।
সম্প্রতি ১১তম বিশ্ব সমুদ্র দিবসে লিঙ্গসমতার মাধ্যমে কীভাবে মানবজাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অবহেলিত সমুদ্র রক্ষায় কাজ করা যায় সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সমুদ্র আমাদের খাদ্যের জোগান দেয়, শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য অক্সিজেন দেয়। এছাড়া বিশ্বজুড়ে বেঁচে থাকা ও জীবনধারণের জন্য সমুদ্রের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এটি এ গ্রহে আমাদের টিকে থাকার নিশ্চয়তা দেয়। বেশ কিছু জরুরি চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে সহায়তা করে, যার মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং এক হাজার কোটি মানুষের জন্য চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত খাদ্যের সুষম জোগানের নিশ্চয়তা। এ কারণে বিশ্বের দেশগুলো একটি বিস্তৃত ও সর্বজনীনভাবে সমুদ্র রক্ষার পরিকল্পনার বিষয়ে একমত হয়েছে। সুষম উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৪ নম্বরে সমুদ্রের নিচের জীবন ও এর ১০টি বিশেষ লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে। লিঙ্গগত বিষয় কীভাবে এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়তা করতে পারে, সে বিষয়টিই আমরা আলোকপাতের চেষ্টা করছি।
উদাহরণস্বরূপ মৎস্য খাতে নিয়োজিত নারীরা প্রায় অর্ধেক কর্মীর চাহিদা পূরণ করতে পারে। অথচ এখন পর্যন্ত তারা কম দক্ষতার ও স্বল্প মজুরির মৌসুমি কাজেই বেশি জড়িত। এমনকি তাদের শ্রম অধিকারও সংরক্ষিত নয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থার তথ্যানুযায়ী, সমুদ্রতীরবর্তী ও উচ্চ চাহিদার মৎস্য আহরণ কাজে পুরুষরা ব্যাপকভাবে জড়িত। অন্তত ৮১ শতাংশ পুরুষ মাছ ও জলজ সম্পদ সংগ্রহে কাজ করে থাকে। অপরদিকে মৎস্যবিষয়ক পরবর্তী পর্যায়ের কাজে, বিশেষত মাছ প্রক্রিয়াজাতের সঙ্গে অন্তত ৯০ শতাংশ নারী যুক্ত। অথচ প্রায় একই ধরনের শ্রমের বিনিময়ে নারীরা পুরুষের তুলনায় মাত্র ৬৪ শতাংশ মজুরি পায়। পুরুষের মতো সমানভাবে স্থানীয় সম্পদের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও সেগুলোর প্রায়োগিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের বলার অধিকার কম।
লিঙ্গবৈচিত্র্যের অভাবে উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া নারীদের কারণে সুষম সমুদ্রকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার সমস্যা সমাধানে যে সুযোগ তৈরি করা যেত, তাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যাংক মূলধন সংগ্রহ, আর্থিক সংস্থান, প্রযুক্তি, বাজার তথ্যপ্রাপ্তি ও উদ্যোক্তা হতে সহযোগিতা পাওয়ার ক্ষেত্রেও নারীরা উল্লেখযোগ্যহারে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। এ অবস্থার অবশ্যই পরিবর্তন হওয়া উচিত।
অন্যান্য শিল্প ও কৃষির মতো খাতে যেভাবে লিঙ্গ সমতাভিত্তিক সমাধান বের করা হয়েছে, সমুদ্রভিত্তিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও সে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। বৈশ্বিক নানা ধরনের সমস্যা মোকাবিলায় এখন নারীদের যুক্ত করার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। নারীদের যখন ভূমির অধিকার প্রদান, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও বাজারে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছে, তখন তারা খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যের উৎপাদন অন্তত ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মানে হলো উৎপাদনশীলতা ও সুষম জীবিকা নির্বাহ, মৎস্য আহরণ ও জলজসম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে একই সঙ্গে সুফল পাওয়া যেতে পারে।
সমুদ্র রক্ষায় যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা সমাধানের ক্ষেত্রে লিঙ্গসমতার ব্যাপারটি যুক্ত করতে হবে। অনেক সরকার, অলাভজনক সংস্থা, মানবপ্রেমী, বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তা পূর্বঘোষণা ছাড়াই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে আমাদের সমুদ্র রক্ষার ক্ষেত্রে। লিঙ্গগত ক্ষেত্রে বাড়তি মনোযোগ দেওয়ার মাধ্যমে আমরা এটিকে বেসরকারি ক্ষেত্রে ও সম্প্রদায়গুলোতে ব্যাপকহারে গতি সঞ্চার করে সমুদ্রের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ তৈরিতে সহযোগিতা করতে পারি।
এসডিজির ১৪ নম্বর লক্ষ্য ও গ্রহের স্বাস্থ্য স্বাভাবিক রাখার প্রচেষ্টা যথেষ্ট কম হবে যদি জনসংখ্যার অর্ধেক অংশকে এড়িয়ে যাওয়া হয়, যারা এ লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারত। সমুদ্র রক্ষায় যে কোনো ধরনের প্রচেষ্টায় অবশ্যই লিঙ্গভিত্তিক সংযুক্তি করতে হবে। একইভাবে তাদের এর সঙ্গে সুষম পন্থায় যুক্ত করতে হবে।

পিটার থমসন জাতিসংঘ মহাসচিবের সমুদ্রবিষয়ক বিশেষ দূত
ইসাবেলা লোভিন সুইডেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী

উইফোরাম থেকে ভাবানুবাদ তৌহিদুর রহমান

সর্বশেষ..