সম্পদশালী হওয়ার আগেই কি বুড়িয়ে যাচ্ছে এশিয়া?

জোংকিয়াং হা, স্যাং-হাইওপ লি ও ডংহায়ুন পার্ক: কর্মক্ষম জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবে এগিয়ে আছে এশিয়ার দেশগুলো। এখানে বিপুল কর্মশক্তি থাকার পাশাপাশি সঞ্চয়ের সুযোগও রয়েছে। এ বিষয়গুলো অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে আরও গতিশীল করছে। কিন্তু চলতি দশকে এসে এ ধারায় কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। জাপানের পথ অনুসরণ করে পিপলস রিপাবলিক অব চায়না (পিআরসি) ও রিপাবলিক অব কোরিয়ার (দক্ষিণ কোরিয়া) মতো দেশগুলোয়ও কর্মক্ষম জনশক্তির সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। এশিয়ার অন্য দেশগুলোর অর্থনীতিও নিকট ভবিষ্যতে জনমিতির এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্বের অন্যান্য এলাকার তুলনায় অনেক দ্রুতগতিতে দিন দিন বোঝা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে এশিয়ায় বিপুলসংখ্যক বয়স্ক জনগোষ্ঠী। অনেক অঞ্চলে কর্মক্ষম জনশক্তির তুলনায় কাজ করতে অক্ষম জনশক্তির পরিমাণ বেশি হয়ে গেছে। এখানে দ্রুত প্রজনন হার কমে যাওয়ার বিষয়টিও ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। অধিকন্তু এশিয়ার অনেক দেশই এখনও উন্নয়নশীল দেশ। স্বাভাবিকভাবেই এখানে একটি প্রশ্নের অবতারণা হচ্ছে। তা হলোÑসম্পদশালী হওয়ার আগেই কি বুড়িয়ে যাচ্ছে এশিয়া?
বয়স্ক জনশক্তি যদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর করে দেয়, তাহলে এশিয়ার জন্য তা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। এ অঞ্চলেবপুলসংখ্যক মধ্যম আয়ের জনশক্তি রয়েছে। ফলে এ জনমিতির কারণে মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে যেতে পারে এশিয়া। এই সম্ভাবনা সামনে রেখেই এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সম্প্রতি ‘বয়স্ক জনশক্তি বৃদ্ধি এবং এশিয়ার মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার সম্ভাবনা’ শীর্ষক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে। মূলত তিনটি বিষয় সামনে রেখে জনমিতির কারণে মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার বিষয়টি নিয়ে কাজ করা হয়েছে।
প্রথমত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও এককেন্দ্রাভিমুখিতার ওপর জনমিতিক প্রভাবকগুলোর ভূমিকা থাকা উচিত। গবেষকরা কর্মক্ষম জনশক্তির সংখ্যা ও প্রবৃদ্ধির হারের মধ্যকার সম্পর্ক খতিয়ে দেখেছেন। এই অনুপাত সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও পর্যায়ক্রমে প্রবৃদ্ধিকেও প্রভাবিত করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, উন্নয়নের মাত্রা ও উর্বরতার মধ্যে একটি নেতিবাচক সম্পর্ক থাকা উচিত। যখন একটি দেশের অর্থনীতি উন্নত হতে থাকে, তখন সেটিকে আরও উন্নত শিক্ষা ও আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করার প্রয়োজন হয়। এজন্য দরকার পড়ে আরও বেশি মানবসম্পদ, যা থেকে আবার আরও উন্নত শিক্ষা ও মানবসম্পদ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।
তৃতীয়ত, জনসংখ্যার সহায়ক অনুপাতের নিম্ন হারের জন্য জন্মহার বৃদ্ধির প্রবণতাও কম হওয়া উচিত। এটা অন্য শর্তগুলোর তুলনায় অনেক বেশি জটিল। কারণ কম প্রজনন হার স্বল্প মেয়াদে এই সহায়ক অনুপাত বাড়িয়ে দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা কমিয়ে দেয়।
পেন ওয়ার্ল্ড টেবিল ৯.০ এবং ১৯৭০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১৭৮টি দেশের বৈশ্বিক উন্নয়ন সূচকটি ব্যবহার করে একটি প্যানেল গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথম ও দ্বিতীয় শর্তটি এডিবির ৩০টি সদস্য দেশে বেশ সন্তোষজনক। তৃতীয় শর্ত যেটি নিম্ন উর্বরতার হার একটি দেশের মোট জনসংখ্যার খুব কমসংখ্যক মানুষকে কর্মক্ষম রাখে, তা খুবই জটিল। উর্বরতা ধীরে ধীরে এবং জটিল গতিশীলতার মাধ্যমে জনসংখ্যার জন্য সহায়ক বিষয়গুলোর অনুপাতকে প্রভাবিত করে।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জনসংখ্যা অধিকহার বৃদ্ধির প্রবণতা ও দ্রুতগতির রাষ্ট্রীয়ভাবে চালিত সমর্থন অনুপাতের মধ্যে সম্পর্ক দেখানোর জন্য একটি শক্তিশালী মডেল দাঁড় করানো হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নিম্ন প্রজনন হারের কারণে উচ্চ সহায়ক অনুপাতে দীর্ঘ মেয়াদে খুবই নিম্ন হারের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। অন্য কথায়, যদি প্রজনন হার কমে যাওয়া স্বল্প মেয়াদে জনসংখ্যার সহায়ক অনুপাতকে বাড়িয়ে দেয় কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে কমিয়ে দেয়, তাহলে এককেন্দ্রাভিমুখিতা বিশিষ্ট অগ্রসর অর্থনীতিতে মন্দা ঘটাতে পারে। এছাড়া মাধ্যমে মধ্যম আয়ের ফাঁদ আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রথম দৃশ্যপটে জনসংখ্যার জন্য মূল সহায়ক অনুপাত (আনূভূমিক অক্ষ) এবং অনুমানমূলক দৃঢ় রাষ্ট্রীয় সহায়ক অনুপাতগুলোর (শীর্ষ অক্ষ) মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টি দেখায়। যদি জন্ম-মৃত্যুর হার চলমান সময়ে স্থির থাকে তাহলে কোনো প্রকৃত সহায়ক অনুপাত দীর্ঘ মেয়াদে একই বিন্দুতে মিলিত হতে পারে। এই দুই অনুপাত দেখায় একটি বিপরীত ‘ইউ’ সম্পর্ক দেখায়, যা সুপারিশ করে যে, খুব কম এবং খুব বেশি সহায়ক অনুপাত দীর্ঘ মেয়াদে একটি নিম্ন সহায়ক অনুপাতের দিকে পরিচালিত করে। এর মাধ্যমে এটা দেখা যায় যে, শূন্য দশমিক ৬৫ এর বেশি সহায়ক অনুপাত কখনো সুষম হতে পারে না, যতক্ষণ না সাম্প্রতিক জন্ম-মৃত্যুহার বহুলাংশে পরিবর্তন হয়। এশিয়ায় অনেক মধ্য আয়ের দেশ ইতিমধ্যে শূন্য দশমিক সাত কিংবা তারও বেশি অতিক্রম করেছে। অধিকন্তু এশিয়ার দুই-তৃতীয়াংশ দেশে জনসংখ্যার জন্য সহায়ক অনুপাত কমে যাচ্ছে অথবা খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে তা কমে যেতে পারে।
অবসরের বয়সসীমা বৃদ্ধি এশিয়ার বয়স্ক জনসংখ্যার ক্ষতির বিষয়টি কমিয়ে দিতে পারে: এই গবেষণা থেকে প্রধান যে তথ্য উঠে এসেছে তা হলো, সাধারণভাবে এশিয়ার বিশেষ করে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতি জনমিতি দ্বারা চালিত এবং তা মধ্যম আয় ফাঁদের শর্ত পূরণ করেছে। জনসংখ্যার জন্য সহায়ক অনুপাতের হ্রাস শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এটা সম্ভাব্য একটি মধ্যম আয়ের ফাঁদ তৈরিতে অবদান রাখতে পারে। যদিও একটি অযৌক্তিক মন্দার জন্য কোনো কারণ নেই, যেহেতু এই ঝুঁকি এড়ানোর জন্য এশিয়ার নীতিনির্ধারকদের হাতে পছন্দ করার মতো অনেকগুলো বিকল্প নীতি রয়েছে।
সর্বোপরি নীতিনির্ধারকরা অবসরের বয়সসীমা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। এতে কর্মক্ষম জনশক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের অবসরের পরিমাণও কমিয়ে নিয়ে আসবে। যদি অবসরের বয়সসীমা ৬৫ থেকে বৃদ্ধি করে ৭০ করা হয়, তাহলে গবেষকদের তৈরি করা মডেল দেখায় যে, দ্রুতগতির রাষ্ট্রীয় সহায়ক অনুপাত দক্ষিণ কোরিয়ায় তিন দশমিক ৪৫ শতাংশ, চীনে চার দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডে চার দশমিক ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া দ্রুত ও সূক্ষ্ম গতিতে প্রজনন হার কমে যাওয়া রোধ করতে দেশগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। আরো ব্যাপকভাবে বললে প্রজনন হার একটি সুষম পর্যায়ে রাখার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, চীন সম্প্রতি ‘এক সন্তান’ নীতি থেকে বেরিয়ে এসেছে, যেটা অত্যন্ত আশাজাগানিয়া একটি খবর।
সবশেষে বলা যায়, মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যক্তি পর্যায়ে খরচ কমিয়ে নিয়ে আসা আরও বেশি মানবসম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে উৎসাহিত করতে পারে। এর মাধ্যমে ধীর প্রবৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট ক্ষতিকর প্রভাবগুলো প্রশমিত হতে পারে এবং ফলস্বরূপ কর্মীসংখ্যা হ্রাসও রোধ হতে পারে। জনমিতির লভ্যাংশ কমতে থাকলে তা পরে মানবসম্পদ ক্ষেত্রে আরও বেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে, যা মধ্যম আয়ের এশিয়ার জন্য আরো সুষম ও উৎপাদন নির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন।

অধ্যাপক জুনকিউং হা, হ্যানইয়াং ইউনিভার্সিটি,
অধ্যাপক স্যাং-হাইওপ লি, ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াই
ও ডংহায়ুন পার্ক, মুখ্য অর্থনীতিবিদ, অর্থনৈতিক গবেষণা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা বিভাগ, এডিবি

এডিবি ব্লগ থেকে ভাষান্তর তৌহিদুর রহমান