সম্পদ ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারের বিষয়টি সমান করতে হবে

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন: ৮ মার্চ এলে নারী অধিকারের বিষয়ে দেশজুড়ে শোভাযাত্রা, সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামসহ নানা আনুষ্ঠানিকতা দেখা যায়। আর এ আনুষ্ঠানিকতাগুলো নির্দেশ করে নারী এ সমাজের পৃথক একটি জনগোষ্ঠী। নারী ও পুরুষের এ ধরনের বিভাজন নারীকে মূল স্রোতধারার একটি ভিন্ন আবহে নিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে নারী সমাজে নারীই হয়েই থাকছে, অন্যদিকে মানুষ হিসেবে তার স্বীকৃতিটা গৌণ হয়ে যাচ্ছে ক্রমেই। দেশের কথিত সুশীল সমাজে কিছু নারীবাদী নামে সুশীলের আবির্ভাব হয়েছে যারা নারীকে মানুষ হিসেবে নয়, নারী হিসেবেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। আর এ ধরনের কার্যক্রমের ফলে নারী-পুরুষের পারস্পরিক সৌহার্দ্য কমছে, পারিবারিক বিরোধ বাড়ছে, সমাজে ঘটছে বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনা।

স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের তথ্যমতে আগের চেয়ে বিবাহবিচ্ছেদের হার কয়েকগুণ বেড়েছে, কারণ নারী ও পুরুষের পারস্পরিক অধিকারের বিষয়টি পারিবারিক দ্বন্দ্বে রূপ নিচ্ছে। সমাজে কেন নারীরা নিগ্রহ বা নির্যাতনের কবলে পড়ছে তার মূল কারণ অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে। নারীর শারীরিক কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য পুরুষের চেয়ে ভিন্ন এবং নারী ও পুরুষের দৈহিক শক্তিরও পার্থক্য রয়েছে। এ ধরনের পার্থক্যজনিত কারণে কি একজন নারী নির্যাতন বা নিপীড়নের শিকার হচ্ছে? মূল বিষয়টি কিন্তু তা নয়। সমাজে দৈহিকভাবে শক্তিশালী কেউ প্রভাবশালী হয় না সব সময়। সমাজ যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের নিয়ন্ত্রণ করার শক্তির উৎসটার স্থল কিন্তু ভিন্ন, কারণ সমাজনিয়ন্ত্রকরা দৈহিক শক্তির প্রয়োগ করে অন্যের মাধ্যমে। তাই দেখা যায় সম্পদ ও অর্থনৈতিক শক্তির বলে যারা বলীয়ান, তারাই সমাজের নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে হাজার বছর ধরে সামাজিক নীতি-রীতি ও যে প্রথা প্রচলিত আছে, সে প্রথার কারণে নারীরা সম-অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পুরুষতান্ত্রিকতা বা নারীবাদ নিয়ে যারা বিতর্কের ঝড় তোলেন, তারাই নারীকে পশ্চাদগামী করছেন।

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় পুরুষতান্ত্রিকতা বিরাজ করছে, এ বিষয়টি বিচার-বিশ্লেষণসাপেক্ষ ব্যাপার। বেশ কয়েকটি স্থানীয় সরকার এবং জাতীয় সরকারের নেতৃত্ব নারীরা নিয়ন্ত্রণ করছে। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের পর থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশটির সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দুই নারী, তারপরও কেন নারীবান্ধব সমাজব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। দুই বছর ওয়ান-ইলেভেনের সরকার বাদ দিলে দীর্ঘ ২৫ বছর দেশটির মূল দায়িত্ব ছিল নারীদের হাতে। বাংলাদেশের সংসদের স্পিকার ও সরকারপ্রধান নারী। দেশের কিছু কথিত বিদগ্ধ পণ্ডিতজন আছেন যারা বলে থাকেন, এই দুই নারী সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর ভর করে। সামাজিক বাস্তবতায় দেখা যায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা বলে যে প্রথাকে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে, তা কি সত্যিই পুরুষতান্ত্রিকতা, নাকি ক্ষমতাকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ? বিষয়টি যদি সম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক হয় তাহলে কেন বা কী করে সরকারের প্রধান হিসেবে নারীরা দায়িত্ব পালন করলেন? ‘তন্ত্র’ বা ‘বাদ’ দিয়ে সামাজিক সম্প্রীতি বা সহাবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করা একটু কষ্টকর, কারণ আইন দিয়ে সমাজ-রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু পারস্পারিক সৌহার্দ্য গড়ে তোলা যায় না। পারস্পারিক সৌহার্দ্য ও মমত্ব সৃষ্টির জন্য মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক স্বস্তি গড়ে ওঠে আর্থিক সক্ষমতার মধ্য দিয়ে, তাই মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টির সৃষ্টি হয় আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। ফলে দেখা যায়, আর্থিকভাবে নারী বা পুরুষ যে কেউ সক্ষম হন সেই নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে এবং সমাজে তা-ই ঘটছে। নারী বা পুরুষ যে-ই হোক না কেন সবল দুর্বলের ওপর পীড়ন চালায়। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় মানুষের অসহায়ত্বটাকে হাতিয়ার বানিয়ে নির্যাতন চালানো হয়। এখানে লিঙ্গ বা জেন্ডার কোনোটাই মূল বিষয় নয়, মূল বিষয় হলো ক্ষমতা। আর এই ক্ষমতার উৎপত্তি আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।

একটা সময় ছিল এদেশে পুরুষরা বিয়ে করার আগে নারীদের পণ দিত, যাকে এককথায় যৌতুক বলা যায়। এই পণপ্রথা দীর্ঘদিন চালু ছিল, তবে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি; কারণ পণগ্রহীতা নারী বিয়ের পর স্বামীর ঘরে চলে আসত। ওই সময়কার বিবাহিত নারীটি বিয়ের পর স্বামীর ঘরে উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও তার পারিশ্রমিকটা আর্থিক মাণদণ্ডে মূল্যায়িত হতো না। এ ছাড়া উৎপাদিত পণ্যে তার কোনো অধিকার থাকত না। ফলে নারীর গ্রহণ করা পণ বা যৌতুকটি জনসম্মুখে আসত না, পরোক্ষভাবে তা স্বামীর সংসারে ব্যয় করা হতো। সময়ের পরির্বতনে নানা কারণে নারীর নির্ভরতা বা বেঁচে থাকার উপায় বা অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় তার স্বামী নামক পুরুষটি। নারীর জীবনে পুরুষের একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়ানোর আরেকটি কারণÑনারীর কর্মক্ষেত্র না থাকা, কৃষিভিত্তিক ও গৃহস্থালি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নারীর পারিশ্রমিক না থাকা আর উৎপাদনের মালিকানা না থাকা। নারীর শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা ছিল না বলে তারা দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে সেই সময় গড়ে উঠতে পারেনি। নারী তখন পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই বাবার পরিবার কন্যাসন্তানটিকে পাত্রস্থ করার জন্য যে কোনো মূল্যের বিনিময়ে বিয়ের ব্যবস্থা করে, আর তখন থেকে উল্টো যৌতুক প্রথা শুরু হয়। অর্থাৎ মেয়ের দায় সারানোর জন্য বাবা যৌতুকের মাধ্যমে তাকে বিয়ে দেয়। আর এই যৌতুকটা দাম্পত্য জীবনে নানা কাজে যৌথভাবেই ব্যয়িত হয়েছে। তবে এই যৌতুকটা বিনা পরিশ্রমে লাভ করার ফলে লোভ বাড়তে থাকে। একসময় যৌতুক প্রথাটি সমাজে মহামারি আকারে বিস্তার লাভ করে। যৌতুক পাওয়ার আশায় পুরুষরা নারীদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালায়। যৌতুক বিষয়টি পারিবারিক দ্বন্দ্বের মূল কারণ হিসেবে দাঁড়ায়। তাছাড়া নারী নির্যাতন যৌতুকের কারণে বাড়তে থাকলে রাষ্ট্র আইন করে তা বন্ধের ব্যবস্থা নেয়। নারী নির্যাতন রোধকল্পে যৌতুকবিরোধেী আইন তৈরি হয়। সরকার নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করে। বিশেষ কোটাধীন নারীরা সরকারি কর্মক্ষেত্রে চাকরির সুযোগ পায়। সরকারি-বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠানে নারীরা চাকরি করছে।

বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নারী শিক্ষকের হার ৬ শতাংশের বেশি। নারীরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ায় সমাজে নিজেদের একটি অবস্থান সৃষ্টি করতে পেরেছে। বর্তমানে যৌতুকের বিষয়টি ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে স্বাবলম্বী কতিপয় নারী পুরুষের কাছে নানা কৌশলে যৌতুক দাবি করছে। আর এই দাবি পুরুষেরা পূরণ করতে না পারায় তাদের ওপর কিছু নারী শ্বেতনির্যাতন চালাচ্ছে। এই নির্যাতনের চিত্রটা নি¤œমধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোয় বেশি। এ ধরনের নির্যাতনের শিকার পুরুষেরা সমাজলজ্জার ভয়ে কিছু বলতে পারছে না, তবে এ ধরনের শ্বেতনির্যাতনের সংখ্যা নেহাত কম নয়। অন্যদিকে নির্যাতিত পুরুষরাই আবার বর্তমানে নারী নির্যাতন নিরোধ আইনের কবলে পড়ছে আর আইনি হয়রানির শিকার হচ্ছে। সম-অধিকারের কথা বললে যৌতুকসহ নির্যাতন আইনটি নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হয় এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যেহেতু নারী এবং পুরুষ উভয়েই মানুষ। নারী নির্যাতনের নিরোধকল্পে তৈরি আইনটিরও অপপ্রয়োগ হচ্ছে। ফলে অপপ্রয়োগকারী কিছু নারীর কারণে সমাজের বৃহৎ নারীর অংশকে সমাজ ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছে। নারী নির্যাতন নিরোধবিষয়ক আইন নিয়ে চটকদার রসালো গল্প তৈরি হচ্ছে, যার জন্য নারীদেরই সামাজিকভাবেই হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়।

সম-অধিকার বিষয়টি নারী. পুরুষ বা হিজড়া (বর্তমান সরকার তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে) যে কোনো জেন্ডারের ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে সম্পদ ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারের বিষয়টি সমান করতে হবে। বাবা-মায়ের সন্তান হিসেবে নারী, পুরুষ কিংবা হিজড়া যে কেউ হোক না কেন বাবা-মায়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকার সবার সমান হওয়া প্রয়োজন। স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর সব সম্পত্তির মালিক তার স্ত্রী এবং স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার সব সম্পত্তির মালিক তার স্বামী হবেÑএ রকম আইন তৈরি করা দরকার। তবে এখানে উল্লেখ থাকতে হবে যে অন্যত্র বিয়ে করলে আর সম্পত্তির মালিকানা দাবি করতে পারবে না, কারণ স্বামী মারা গেলে তার স্ত্রী সম্পত্তির যে অংশ পায় তাতে করে তার চলে না, ফলে সন্তানদের ওপর নির্ভশীল হতে হয়। অপরদিকে স্বামীর বেলায়ও তদ্রƒপ ঘটনা ঘটতে পারে। আর এ ধরনের আইন তৈরি হলে মা-বাবা উভয়ের অবর্তমানে সন্তানেরা সম্পত্তির মালিক হবে। একজনের মৃত্যুর পর সন্তানেরা সম্পত্তির মালিক হতে পারবে না। এর ফলে বয়োবৃদ্ধ অবস্থায় নারী বা পুরুষের সন্তানের ওপর নির্ভরতাটা কমবে। নারীকে নারী ভেবে তার অধিকারের কথা ভাবলে শুধু চলবে না, সমাজে মানুষ হিসেবে নারীকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আর সব মানুষের সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। তাই নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে সম্পদ ও সম্পত্তির ওপর নায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ মানুষের অধিকার ও তার প্রায়োগিকতা নিহিত থাকে সম্পদ বা সম্পত্তির মালিকানার ওপর। সম্পদের মালিকানায় অন্যায্যতা রেখে সম-অধিকারের বিষয়টি ভাবা ঠিক নয়।

 

ফ্রিল্যান্স লেখক

shahzia84Ñyahoo.in