সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বন্ধ হোক সড়ক দুর্ঘটনা

হাসান সাইদুল: না মরেও মরে গেলেন পায়েল। মরে গেছে বোধ করে পায়েলের চেহারা থেঁতলে দেয় নিষ্ঠুর ঘাতক চালক ও হেলপার, তারপর ধাক্কা দিয়ে খালে ফেলে দেয় বাসের সহযোগীরা। ২৩ জুলাই সকালে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ভবেরচর খাল থেকে পায়েলের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। স্কুল থেকে বাসায় লাশ হয়ে ফিরবে এটা কি কখনও ভেবেছিল নিহত শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মিম ও বিজ্ঞান বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম রাজিব।
রোববার (২৯ জুলাই) দুপুরে কালশী ফ্লাইওভার থেকে নামার মুখে এমইএস বাসস্ট্যান্ডে ১৫-২০ শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে ছিল। জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস ফ্লাইওভার থেকে নামার সময় মুখেই দাঁড়িয়ে যায়। এ সময় পেছন থেকে আরেকটি দ্রুতগতিসম্পন্ন জাবালে নূরের বাস ওভারটেক করে সামনে আসতেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। নিমিষেই উঠে পড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর। চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায় দুজন। এছাড়া আহত হয় আরও ১৫-২০ শিক্ষার্থী।
দুই.
কর্মজীবী মানুষগুলো সংসার কিংবা পরিবারের ভরণপোষণ মেটাতে ঘর ছেড়ে দূর-দূরান্তে পাড়ি জমায় একটু বাড়তি উপার্জনের তাগিদে। সেজন্য কর্মক্ষম মানুষগুলো ঘরে ফিরে বিশেষ কোনো দিনে বিশেষ করে মুসলমানদের বাড়ি ফেরারও একটা উৎসব দুই ঈদ। বিশেষ কোনো উৎসব এলে ঢাকা তথা দেশের বিভিন্ন শহর থেকে মানুষগুলো ঘরমুখী হয় শুধু পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ঈদের ছুটির দিনগুলো আনন্দে কাটাতে। কিন্তু মনের মাঝে জমে থাকা আনন্দবোধের বাসনা অনেক সময় বিপরীত হয়ে কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়ায়! জীবিত কেউ আনন্দ করতে ঘরে ফিরে লাশ হয়ে অথবা কেউ আনন্দভোগ করতে গিয়ে লাশ হয়ে যায়। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু অস্বাভাবিক বিষয় হলো আনন্দমুখর দিনগুলোতে যাত্রা এখন আর শুভ হয় না।
গত বছর রেবা ও সাহাতন নামের দুই নারী সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রূপশান্তি এলাকায় মধুপুর-জামালপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে হাঁটছিলেন। এ সময় জামালপুরগামী একটি মাইক্রোবাসের চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাদের চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই ওই দুজনের মৃত্যু হয়। তাদের বাড়ি উপজেলা সদরের রূপশান্তি এলাকায়। তারা দুজন প্রতিবেশী। ধনবাড়ী থানার ওসি মুজিবর রহমান বলেন, মাইক্রোবাসটি আটক করা হয়েছে। চালক পলাতক বলে জানান ওসি। এছাড়া গত বৃহস্পতিবার সারা দেশে ১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ যায় ২৯ জনের। গোপালগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, পাবনা, চুয়াডাঙ্গা, বগুড়া, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, রংপুর, টাঙ্গাইল ও ঢাকায় গত বুধবার গভীর রাত থেকে বৃহস্পতিবার রাতের মধ্যে এসব দুর্ঘটনার খবর জানা যায়।
সৌদিপ্রবাসী হালিম আকন্দ আগের রাতে দেশে ফেরেন। ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে গিয়েছিলেন স্বজনেরা। সেখান থেকে ভোররাতে বাগেরহাটে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন তারা। বাসায় নিথর দেহ ফিরলেও জীবন ফেরেনি। পথেই গোপালগঞ্জে বেপরোয়া বাসের সঙ্গে তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে পরিবারটির পাঁচ সদস্যসহ ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগে গত বুধবার রাতে সিরাজগঞ্জে বাস-মাইক্রোবাসের আরেকটি সংঘর্ষের ঘটনায় একই পরিবারের তিনজনসহ চারজন নিহত হন। এছাড়া ২৪ ঘণ্টায় আরও ৯ জেলায় সড়কে প্রাণ গেছে ১৩ জনের। এ নিয়ে গত ১৩৬ দিনে বিভিন্ন জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন এক হাজার ২৩৮ জন। রাজধানীর গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে বেপরোয়া গতির বাসের ধাক্কায় অটোরিকশার চালক জামাল হোসেন প্রাণ হারিয়েছেন। এ সময় অটোরিকশার চার যাত্রী গুরুতর আহত হন। তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনা একের ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছার বলে হয় না। আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনা একটি নিয়মিত বিষয় হলেও আমরা সবাই মিলে মিছিল করি; পোস্টার, ফেস্টুন আর ব্যানারে এর প্রতিকার করতে জড়ো হই। কিন্তু রোগ না হতেই ওষুধ খেলে তো হবে অর্ধবোকামি, আর বর্তমান বাজারে রোগ ধরার পর পরীক্ষা, তারপর আইসিইউ, সিসিইউতে থাকা, সেইসঙ্গে চিকিৎসকদের অবহেলা সব মিলিয়ে কল্পনা করলে বোঝা যাবে আমাদের দেশে কেন সড়ক দুর্ঘটনা হয়। দুর্ঘটনা তো ঘটেই, কেন ঘটে তাও আমাদের জানা; কিন্তু জানা আর মানা, সেইসঙ্গে পরিহার করা তিনটা আলাদা বিষয়। সেদিকে কারও নজর নেই। নজর শুধু ক্ষমতা আর দখল-টেন্ডারবাজিতে। সেখানেও তাড়াহুড়া, তো দুর্ঘটনা ঘটবেই।
তিন.
রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে বললে হয়তো অনেকে বোকা বলে আখ্যা দেবেন। তবে এটাও সত্য, রাজনৈতিক কারণ আছে, আছে নেশা আর দারিদ্র্যও। শুধু তা-ই নয় খুব ভোরবেলায় নিম্নবিত্ত শ্রমিকরা খুব তাড়াতাড়ি অফিস কিংবা গার্মেন্টে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল  হয়ে যায়।
খুব ভোরবেলায় চালক ঘুমের ঘোরে কিংবা নেশার ঘোরে প্রথমে অসতর্ক হয়ে গাড়ি চালায়। অন্যদিকে তাড়াতাড়ি গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য যেমন চালকের তাড়াহুড়া থাকে একইভাবে তাড়াহুড়া করে বাড়ে জ্যাম, বাড়ে সড়ক দুর্ঘটনাও।
দেশে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় আগাছার মতো গজিয়েছে তথা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে নামে-বেনামে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। মুচিখানা থেকে শুরু করে ফরেন ব্র্যান্ডের সিটি কিংবা ল্যান্ড কোম্পানিও রয়েছে, যে প্রতিষ্ঠানগুলোর অফিস সহকারীদেরও প্রাইভেট গাড়ি ভোরবেলায় সড়ক-মহাসড়কে ভিড়তে শুরু করে।
উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় গ্রামগঞ্জ থেকে নিম্নবিত্ত মানুষ শহরে পাড়ি জমায়, বেছে নেয় রিকশাভ্যান কিংবা ঠেলাগাড়ি চালানোর মতো কাজকে। তাাদের জন্য নেই বিকল্প কোনো সড়ক কিংবা রাস্তা।
ফুটপাতে বসে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে-উজিয়ে ওঠা টং, সেইসঙ্গে থাকে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের মালামাল কিংবা গাড়ি পার্কিং। সব একই সঙ্গে রাস্তা দখল করে।
চার.
দিন যত যাচ্ছে দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগছে। যেখানে আধুনিকতা বেশি ঠিক সেখানেই দুর্র্নীতি আর আতঙ্ক বেশি। দিন যত যাচ্ছে মানুষ ততই আধুনিক হচ্ছে। গ্রামীণ মানুষগুলো উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় শহরমুখী হচ্ছে। উন্নত হচ্ছে জীবনব্যবস্থা। কিন্তু কমছে না আতঙ্ক আর নির্মূল হচ্ছে না মৃত্যুকূপগুলো। প্রতিদিনই বাড়ছে গাড়ি, বাড়ছে না রাস্তা। অথচ হইহই করে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। মরছে না বিত্তশালীরা, মরছে নিরীহ মানুষ, যারা দিনে আনে দিনে খায়। বাসস্ট্যান্ড এলাকার কাছাকাছি সবচেয়ে বেশি প্রায় ৪১ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। এরপর বাজারের কাছের এলাকায় ২৮ দশমিক ৪০ শতাংশ । সংযোগ সড়কে ঘটে দুর্ঘটনার প্রায় ১৮ ভাগ। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের পাঁচটি জেলা সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ। এগুলো হলো কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও ঢাকা। ২০১২ সালে কুমিল্লায় সর্বোচ্চ ১২৪ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান এবং ঢাকায় ১০৫, টাঙ্গাইলে ১০২, সিরাজগঞ্জে ৯৬ ও চট্টগ্রামে ৯৫ জন প্রাণ হারান। ২০১২ সালের গবেষণায় বলা হয়েছে, মহাসড়কের সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে ৫৪ দশমিক সাত কিলোমিটার এলাকায়। ওই বছরে সারা দেশে মোট দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৬৩৭। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০২০ সালের মধ্যে দেশে দুর্ঘটনার হার দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এ অবস্থায় জাতিসংঘের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সরকার ২০২০ সালের মধ্যে দুর্ঘটনার হার অর্ধেকে নামিয়ে আনার কর্মকৌশল গ্রহণ করেছে। তবে তা নানা জটিলতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এক হাজার ৯৮৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় দুই হাজার ২৯৭ জন নিহত ও পাঁচ হাজার ৪৮০ জন আহত হয়েছেন। গত বছরের তুলনায় চলতি বছর এ সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সড়কে এক হাজার ৯৪১ জন নিহত এবং চার হাজার ৭৯৪ জন আহত হন। ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সারা দেশে বিভিন্ন মহাসড়ক, জাতীয় সড়ক, আন্তঃজেলা সড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে এসব প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটে।
বেসরকারি সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির নিয়মিত জরিপ ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। ২২টি জাতীয় দৈনিক, ১০টি আঞ্চলিক সংবাদপত্র এবং আটটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সংবাদ সংস্থার তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে বলে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৬৫টি দুর্ঘটনায় ৩৪ নারী ও ৪২ শিশুসহ ৩৩৩ জন নিহত এবং ৬৩২ জন আহত হন। এর মধ্যে ২৩ জুন ঈদুল ফিতরের ছুটির প্রথম দিন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আট দিনে ৭৩টি দুর্ঘটনায় ১১ নারী ও ১৫ শিশুসহ ১২০ জনের প্রাণহানি ঘটে, আর আহত হন ২২৬ জন। তবে ঈদ-যাতায়াত ব্যবস্থাপনা ও প্রাকৃতিক আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে ভালো থাকায় এ বছর ঈদের ছুটিতে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কম ঘটেছে বলে জাতীয় কমিটির পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় চলতি বছর সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এক হাজার ৮২৬টি দুর্ঘটনায় ২৬২ নারী ও ২৬১ শিশুসহ এক হাজার ৯৪১ জন নিহত এবং চার হাজার ৭৯৪ জন আহত হন। আর এ বছর প্রথম ছয় মাসে ৯৮৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯২ নারী, ৩১৫ শিশুসহ দুই হাজার ২৯৭ জন নিহত ও পাঁচ হাজার ৪৮০ জন আহত হন। এ হিসেবে দুর্ঘটনা ও নিহত হওয়ার হার যথাক্রমে আট দশমিক ছয় শতাংশ ও ১৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়েছে।
এ ব্যাপারে জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, এবার ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাতায়াতে সরকারি পদক্ষেপ বিগত বছরগুলোর তুলনায় ভালো ছিল, যে কারণে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কম ঘটেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে আইন ভঙ্গ করে পণ্যবাহী ট্রাকে ও বাসের ছাদে যাত্রী বহনসহ চালকদের অসতর্কতার কারণে কিছু মানুষের করুণ মৃত্যু হয়েছে।
পাঁচ.
১৯৯৮ থেকে ২০১২ সাল অর্থাৎ ১৪ বছরে সরকারি হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে ৪২ হাজার ৫২৬ জনের। বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরও বেশি, কারণ সব দুর্ঘটনাই সরকারি হিসাবে আসে না। সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে গাড়ির অতিরিক্ত গতি ৫৩ দশমিক ২৮ ভাগ। মোটরযান আইনে গতিসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া থাকলেও অধিকাংশ চালকই এ নিয়ম মানেন না। মহাসড়ক, শহর ও লোকালয়ের জন্য আলাদা আলাদা গতিসীমা রয়েছে। মহাসড়কে বাস, কোচ ও পিকআপের সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৫৫ কিলোমিটার। ভারী ট্রাক ও লরির গতিবেগ ৫০ কিলোমিটার। ট্রাক্টর ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা ৩০ কিলোমিটার। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর কারণ দেখানো হয়েছে ৩৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। পথচারীদের ভুলের কারণে মৃত্যু হয় তিন দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং অন্যান্য কারণে পাঁচ দশমিক ৭৮ শতাংশ। পুলিশের রেকর্ডে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত-আহতের আসল চিত্র আসে না। ২০১০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার, কিন্তু পুলিশের হিসাবে আসে এক হাজার ৯০০। বিশ্বব্যাংকের জরিপে নিহতের সংখ্যা বছরে প্রায় ১২ হাজার, কিন্তু বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে এ সংখ্যা ১৮ হাজার। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় অর্থনৈতিক ক্ষতি জিডিপির এক থেকে দুই শতাংশ দেড় শতাংশ ধরলেও প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।
পরিবার তথা দেশের অর্থনীতিতে এই যে বিরাট ক্ষতি, তা থেকে রক্ষাকল্পে আমাদের তেমন কোনো উদ্যোগ, কর্মপরিকল্পনা, আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা এর বাস্তবায়ন লক্ষণীয় নয়। একটা দুর্ঘটনা ঘটার পর গতানুগতিক রীতিতে তাৎক্ষণিকভাবে একটা কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়, তারপর এটা কোন আঁস্তাকুড়ে বা হিমঘরে গিয়ে পড়ে থাকে, তা আর আমরা জানতে পারি না। মিডিয়ার কল্যাণে কিছুদিন এটা নিয়ে হইচই! সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থা, ওভারলোডিং, ওভারটেকিং, ওভার স্পিড, গাড়িচালকদের অদক্ষতা, ভুয়া লাইসেন্স, বেপরোয়া ও নেশাগ্রস্ত হয়ে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন মেনে গাড়ি না চালানো, গাড়ির গতিসীমা অনুসরণ না করা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা, আইন প্রয়োগে শিথিলতা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ বা বাস্তবায়ন না করাÑএসব কারণেই প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব বিষয় নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি, মানববন্ধন, আন্দোলন, মিছিল-মিটিং কম হয়নি বা হচ্ছে না, কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। গাড়ির লাইসেন্স ও চালকের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি। দুর্নীতির কারণে আইন থাকলেও তার প্রয়োগ যথাযথ হয় না, বা হচ্ছে না। ‘মোটর ভেহিকেল অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩’ অনুযায়ী একজন চালককে লাইসেন্স দেওয়ার আগে মহাসড়কে তার ৩৫ মিনিটের গাড়ি চালানোর পরীক্ষা ও তাত্ত্বিক পরীক্ষা নেওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে তা কতটুকু পালিত হচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
ছয়.
ফ্লাইওভারের কাজ শুরু করতেই অনেকে মনে করেছেন যানজট একেবারেই কমে যাবে। আর যানজট কমলে দুর্ঘটনা কমবে। আর দুর্ঘটনা কমলে জনজীবনে আসবে স্বস্তি। অকালে হারাবে না প্রাণ। কান্না নিয়ে কাটবে না কোনো পরিবারের দিন। নগরীর অনেক ফ্লাইওভারের কাজ সম্পন্ন হলেও কমছে না যানজট। মহাসড়কের পাশাপাশি সরু পথেও চলছে গাড়ি। নগরীতে উন্নত জীবনের প্রত্যয় নিয়ে আসছে মানুষ। বাড়ছে জনগণ। দিন দিন গণপরিবহনের সংখ্যাও বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে সড়ক দুর্ঘটনাও। প্রতিদিনই ঝরছে তাজা প্রাণ। অনেকেই হচ্ছেন পঙ্গু। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) সূত্রে জানা গেছে, চালকদের তিন ধরনের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। এজন্য সারা দেশে বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং প্রশিক্ষক রয়েছেন মাত্র ১৪২! দেশে রেজিস্ট্রেশনকৃত ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ স্কুলের সংখ্যা মাত্র ৯৮। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনুমোদিত ড্রাইভিং প্রশিক্ষকদের একটা বড় অংশ কোনো কাজ করেন না। ট্রেনিং সেন্টারগুলোতেও প্রতিষ্ঠানের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সরকারের পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ বলছে, গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে তালিকাভুক্ত যানবাহনের সংখ্যা সাড়ে ২৮ লাখের বেশি। লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক আছে প্রায় ১৬ লাখ! এ হিসাবে সাড়ে ১২ লাখের বেশি চালক অবৈধ! যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে দেশ ৬০ লাখের বেশি চালক রয়েছে। অবৈধ চালকের সংখ্যা ৪৪ লাখ। লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক আছে মাত্র ১২ ভাগ। ২২ লাখ অনুমোদনহীন যানবাহন দাবড়ে বেড়াচ্ছে সড়ক-মহাসড়কে। বিআরটিএ সূত্র বলছে, পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের সুপারিশে কোনো রকম পরীক্ষা ছাড়াই এক লাখ ৯০ হাজার চালক পেয়েছেন ভারী যানবাহন চালানোর সনদ!
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিনে সারা দেশে গাড়ি নামছে চার শতাধিক। এর মধ্যে ঢাকাতেই নামছে ৩১৭। গাড়ির বিপরীতে গড়ে দিনে ১০ চালকও তৈরি হচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় নতুন চালক তৈরিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
একটি গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার জন্য ৪১টি আইটেম পরীক্ষা করতে হয়। অথচ মালিক আর গাড়ি দেখেই বিআরটিএ’র পরিদর্শক ফিটনেস সার্টিফিকেট দিয়ে দিচ্ছেন। এটা করলে নিরাপদ সড়ক কখনোই পাওয়া যাবে না। উন্নত দেশগুলোতে সঠিক সেবা ও মান নিশ্চিত করার জন্য সরকারি সংস্থা ‘রেগুলেটরি বডি’ হিসেবে কাজ করছে, যা আমাদের দেশে নেই। বর্তমানে ব্যাংককের যানবাহনের সংখ্যা ৭৫ লাখ। থাইল্যান্ডে সাড়ে তিন কোটি। বিশাল এ পরিবহন রাজ্যের দেখভাল করছে, কিন্তু দেশটির সরকারি পরিবহন নিয়ন্ত্রণ সংস্থার হাতে নেই। এতে সেবার মান বাড়ছে। দক্ষ চালক তৈরি হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনার মাত্রা কমছে। সেইসঙ্গে আনফিট কোনো পরিবহন রাস্তায় চলতে পারছে না। চোখে দেখে ফিটনেস সনদ দেওয়ার প্রবণতাও নেই সেখানে। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, উন্নত দেশগুলোতে নাগরিকের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। তেমনি নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের জবাবদিহিতাও রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের ৫২ শতাংশই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবার নেমে গেছে ছিন্নমূল বা দারিদ্র্যের কাতারে। বেঁচে থাকার জন্য পরিবারের সদস্যদের আর কোনো অবলম্বন নেই। কমছে না সড়ক দুর্ঘটনা। কমছে না ভুক্তভোগীদের চরম দুর্দশা। দুর্ঘটনার কবলে পড়ে যারা পঙ্গু হয়েছেন, তাদের জীবনে নেমে আসে যন্ত্রণা আর পরনির্ভশীলতার তীব্র যন্ত্রণা। আর্থিক অসচ্ছলতা নতুন কিছু নয়। সড়ক দুর্ঘটনা নির্মূলযোগ্য সমস্যা নয়, তবে ধীরভাবে কাজ করলে একসময় সড়ক দুর্ঘটনা শূন্যের কোঠায় যাবে, এমন আশা করা যায়। সরকারের পাশাপাশি জনগণ তথা সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বন্ধ হোক সড়ক দুর্ঘটনা।

গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]