‘সময়গুলো ঘুমন্ত সিংহের’

নিগূঢ় সত্য আবিষ্কারের চেষ্টা

 

তরুণ কবি পলিয়ার ওয়াহিদের এ কাব্যগন্থে আছে নিগূঢ় সত্যকে আবিষ্কারের প্রাণান্ত চেষ্টা। আছে দেশপ্রেম ও ভালোবাসা। আছে গ্রামের নানা বিবর্তনের গল্প। সোপার্জিত জীবনযাপনে যে প্রবল দুরন্তপনা নিয়ত সঙ্গী, তা অনিবার্যভাবে অনেক উপমার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে এ কাব্যগ্রন্থে।

৫৩টি কবিতার সমন্বয়ে মলাটবন্দি এ গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘মহুয়ার মুখ’। শুরু করেছেন এভাবে ‘মহুয়ার মুখ পাকা ধানক্ষেতের মতো সচ্ছল/নভেরার ভাস্কর্যের মতো বাঁকানো তার চোখ ও নাকের গড়ন/যাকে পাঠের পর ধানের শীষের ন্যায় নুয়ে পড়ে মন’। চরণ কটিতে কবি দেশপ্রেম বোঝাতে যেসব উপমা ব্যবহার করেছেন, তা অসাধারণ। শেষ দুটি চরণ আরও চমৎকার ‘সে আমার পৌরুষ-ডালে ফুটে আছে ভুঁইচাঁপা ফুলের মতো/মাতৃভূমি যেমন পৃথিবীর অন্য কোনো ভূমির চেয়ে স্বমহিমায় উজ্জ্বল’।

‘আত্মঘাতী’ কবিতায় ফুটে উঠেছে বর্তমান সমাজব্যবস্থার চিত্র। কবি লিখেছেন‘কেবল মৃত্যুর ফুলে বেঁচে থাকা যায়Ñএ কথা জানে আমাদের সংক্ষিপ্ত জীবন/তবুও কাদের হাতে দ্যাখো উঠে গেছে চীনাবাদামের চাষ/আখের রসের অভাবে দ্যাখো জন্ডিসে ভুগছে তাবৎ শহর!/মা আমাকে বলছেনÑ/কাঠবাদামের গাছে পড়েছে বজ্রনিপাত/ভাঁটাখোলার দিকেই নাকি হেঁটে গেছে খেজুরের যইবতী দল/পাকা ইটে পুড়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রাম!’ পাঠক দেখুন, উপমার ব্যবহার! সত্যই আজ চাষা আর চাষা থাকছে না, হয়ে যাচ্ছে ভূমিহীন। তাদের ভিটেমাটি গিলছে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। ইটভাটাগুলো খেয়ে ফেলছে গাছগাছালি। এ কবিতার শেষাংশে কবি হতাশা ব্যক্ত করেছেন‘সময় অভাবে গোলপাতা ছাউনিতে বসে/কেউ-ই শুনছে না দাদির গল্প আর/গেন্দা ফুলের তাই খুবই মন খারাপ!’

‘সময়গুলো ঘুমন্ত সিংহের’ শিরোনামে কবিতাও আছে এ গ্রন্থে। এ কবিতায় তিনি সময়কে তুলে এনেছেন। সময়কে কখনও তিনি মেষশাবকের মতো শান্ত, আবার কখনও প্রজাপতির মতো চঞ্চল বলেছেন। বলেছেন, ‘প্রতিজ্ঞায় পাথর অথচ মানবিকতায় ঘাসের মতো সবুজ’। শেষে বলেছেন, ‘আমি চিরকাল খরগোশের মতোন দ্রুত/আর বাতাস এবং পাখির মতো স্বাধীন’। মড়কে আক্রান্ত বীজ শিরোনামে কবিতায় লিখেছেনÑ‘কোথাও দেখছি না তো নতুন বীজের আভা/শুদ্ধ বীজ ছাড়া কীভাবে মিলবে চারা?/বিশুদ্ধ জমিনের অভাব! সবদিকে হিংস্র লাভা/জুলুম বেড়েছে তাই ঝরে আকাশের তারা’! ভালো ফসলের জন্য বিশুদ্ধ বীজ প্রয়োজন এবং সে বীজ যে আজ প্রভাবশালীদের নগ্ন থাবার কারণে মড়কে আক্রান্ত, তা-ই স্পষ্ট করেছেন।

কবিতাগুলোয় মুগ্ধতা আছে, তবে কবি কতটুকু সফলÑতা পাঠকই বিচার করবেন। এ কালে আমাদের কবিতায় ব্যবহƒত শব্দগুলো প্রাত্যহিক জীবনের বাইরে খুব যে যেতে পারছে তা নয়। সম্ভবত তা ঠিক হবে না ভেবেই নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন কবি। তার এ গ্রন্থ পাঠককে মুগ্ধ করবে আশা করি। কাব্যগ্রন্থখানি একুশে গ্রন্থমেলায় এনেছে অগ্রদূত প্রকাশনী। প্রচ্ছদ ফারুক মুহাম্মদ। ৬৪ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থের দাম ১৫০ টাকা। পাওয়া যাচ্ছে ১৩১ নম্বর স্টলে।

 

আমিনুল ইসলাম সোহেল