সরকারি চাকরি নিয়ে এ উম্মাদনার ভবিষ্যৎ কী?

সম্প্রতি সরকারি চাকরির জন্য শিক্ষিত যুবসমাজের মধ্যে প্রতিযোগিতার পরিমাণ বেড়েছে বহুগুণ। সামান্য কিছু পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলে সেখানে আবেদন পড়ছে লাখের ওপর। আর দেশের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত চাকরি বিসিএসের সার্কুলার হলে তো কথাই নেই! সর্বশেষ ৩৮তম বিসিএস যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। মাত্র ২০২৪টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন তিন লাখ ৮৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী! কিন্তু সরকারি চাকরির জন্য শিক্ষিত যুবসমাজের এ উম্মাদনার পরিণাম কী? ভবিষ্যতেই বা এর ফল কী হতে পারে?

এক কথায় এর জবাব হলো এর ফল মোটেও ভালো নয়। কারণ হিসেবে মোটাদাগে বলতে পারি, দেশের শিক্ষিত যুবসমাজের অধিকাংশই এখন সরকারি চাকরির পেছনেই দৌড়াচ্ছেন। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যাল (বুয়েট), মেডিক্যাল থেকে শুরু করে দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় ভালো ও মেধাবী জনবল পেলেও ব্যক্তি-উদ্যোগে ভালো কিছু করার মতো সম্ভাবনাময় জায়গাগুলো পিছিয়ে পড়ছে। তেমন কোনো নতুন উদ্যোক্তাও তৈরি হচ্ছে না। বেসরকারি খাতেও মেধাবী যুবসমাজের উপস্থিতি খুব সামান্য।

কিন্তু উচ্চশিক্ষিত যুবসমাজের সরকারি চাকরিতে ব্যাপক আগ্রহী হয়ে ওঠার পেছনে কারণ কী? এর উত্তরে বলা যায়Ñবেশি বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা থেকে শুরু করে কিছু ক্ষেত্রে জনগণের সেবা করার মতো বিষয়গুলো কাজ করে। কিন্তু সরকারি চাকরির বাইরে এসব শিক্ষার্থীর অন্য কিছু করার পরিবেশই বা কতটুকু আছে? তাদের উদ্যোক্তা বা অন্য কোনো কিছুতে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগই বা কতটুকু?

এ বিষয়ে সম্প্রতি কথা হয় একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তাদের বক্তব্য, সরকারি চাকরি ছাড়া অন্য কিছু করাটা কঠিন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে নি¤œ-মধ্যবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারি চাকরি আর কিছু ক্ষেত্রে বেসরকারি চাকরিই ভরসা। আর উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শুরুর পর থেকে চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত অনেককেই টিউশনি বা পার্টটাইম চাকরি করে নিজের খরচ চালিয়ে নিতে হয়। সেখানে উদ্যোক্তা কিংবা অন্য কোনো ক্ষেত্রে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে গেলে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, তার সংকুলান করা এসব পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়। ব্যাংক কিংবা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়াটাও বেকার যুবকদের জন্য খুবই জটিল কিংবা কিছু ক্ষেত্রে অসম্ভবও। এজন্য সরকারি চাকরিই তাদের শেষ ভরসা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী দেশে এখন বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ। যার মধ্যে অধিকাংশই উচ্চশিক্ষিত। স্নাতক বা তার বেশি ডিগ্রিধারী প্রতি ১০০ জনের ৯ জনই বেকার। এ বিপুলসংখ্যক বেকারের কর্মসংস্থান কোনোভাবেই সরকারি চাকরির মাধ্যমে করা সম্ভব নয়। আর প্রতি বছর যে পরিমাণ শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে চাকরির বাজারে আসছেন, তার চেয়ে অনেক কম কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে আনুপাতিক হারে প্রতি বছরই বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা।

এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দেশের শিক্ষিত বেকারদের সবাই যাতে সরকারি চাকরির পেছনে না ছোটেন, সেজন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। মেধা ও শিক্ষার ধরন অনুযায়ী চাকরির খাতে যুবসমাজকে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা করা যেতে পারে। যেটা এদেশে এখন নেই বললেই চলে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো যুবসমাজকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এদেশে তরুণ উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য অনেক খাত ও মেধা থাকলেও নানা কারণে অনেকেই এদিকে অগ্রসর হতে চান না। এর মূল কারণ অবশ্যই অর্থ। এছাড়া নিরাপত্তার অভাব ও অনিশ্চয়তাও এজন্য দায়ী। যারা তরুণ উদ্যোক্তা হতে চান বা আগ্রহী, তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। এছাড়া অন্য যে বিষয়গুলোকে তারা সমস্যা মনে করেন, সেগুলো চিহ্নিত করে অবশ্যই তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে করতে হবে।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। স্বাভাবিকভাবেই এর একটা বড় অংশই তরুণ ও যুবক। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই জনসংখ্যার এ অংশটি অর্থনৈতিক উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এজন্য তাদের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশ আরও এগিয়ে যাবে, অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবেÑএতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তারা অতিমাত্রায় সরকারি চাকরিনির্ভর হয়ে পড়লে বেকারত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি মেধারও অপচয় হবে। এমনটা হলে তা দেশের জন্য কোনোভাবেই ভালো ফল নিয়ে আসবে নাÑএতে কোনো সন্দেহ নেই।

 

তৌহিদুর রহমান

touhiddu.rahman1Ñgmail.com