সরকারের ধান-চাল সংগ্রহে চাই সুবিবেচনা

গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘১০ লাখ টন ধান-চাল কিনবে সরকার’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি রোববার সচিবালয়ে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে দেওয়া খাদ্যমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে তৈরি। বোরোর বাম্পার ফলন হওয়ায় সরকার এবার ১০ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্য স্থির করেছে বলে মন্ত্রী সেখানে যে সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন, সেটি ইতিবাচক বলতে হবে। খেয়াল করার বিষয়, গত বছরে আগাম বন্যার কারণে সরকারি পর্যায়ে বোরো ধান-চাল সংগ্রহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। তার পরিণাম বা প্রভাবে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায় চালের দাম এবং সেই সঙ্গে জনদুর্ভোগ। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এমন দিকে মোড় নেয় যে, সরকারকে নিতে হয় চাল আমদানির সিদ্ধান্ত। সেজন্য রাজস্ব ছাড়ও দিতে হয় তাকে। কিন্তু এবার যেহেতু বোরোর ফলন ভালো, তাই অধিক পরিমাণে তা সংগ্রহ করাই হচ্ছে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত। মন্ত্রী অবশ্য এ প্রশ্নের ভালো জবাব দিতে পারেননিÑবোরোর বাম্পার ফলন সত্ত্বেও কেন কমছে না চালের দাম। তিনি শুধু এটুকু বলেছেন, চালের বাজার ‘স্থিতিশীল’ রয়েছে। এর দ্বারা কী বোঝাতে চাইলেন, স্পষ্ট নয়। তবে সরকারের এ সিদ্ধান্তকে অনেকে সাধুবাদ জানাবেন যে, বোরো ধান ও চালের দাম ২ টাকা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে চলতি সংগ্রহ মৌসুমে। গত বছর ৩৪ টাকা দরে ৮ লাখ টন এবং ২৪ টাকা দরে ৭ লাখ টন চাল ও ধান কিনেছিল সরকার। এবার মজুদ পরিস্থিতি ভালো থাকায় অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে কম। অন্যদিকে ৩৪ টাকা উৎপাদন খরচ ধরে সরকারিভাবে বোরো সিদ্ধ চাল, আতপ ও ধানের কেজিপ্রতি দাম ধরা হয়েছে যথাক্রমে ৩৮, ৩৭ ও ২৬ টাকা। অনেকেই মনে করেন, ক্রয়মূল্যের এমন বৃদ্ধি কিছুটা হলেও কৃষককে উৎসাহ জোগাবে বোরো উৎপাদন ধরে রাখায়। এমনিতেই ধান-চালের দাম কম পেয়ে এবং অনেকটা লাভ মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে খুইয়ে বহু কৃষক উৎসাহ হারিয়েছে ধান উৎপাদনে। অথচ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের স্বার্থেও ধান-চাল উৎপাদনে তাদের উৎসাহ ধরে রাখাটা জরুরি।

এদিকে গমের ব্যাপারে দেখা যাচ্ছে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কম হওয়ায় সরকারিভাবে গম সংগ্রহ করা হবে না এবার। খাদ্য মন্ত্রণালয় তথ্য দিয়েছে, সরকারি গুদামগুলোয় বর্তমানে চাল ও গম মজুদের পরিমাণ যথাক্রমে ৯ লাখ ৬৯ হাজার এবং ৩ লাখ ৬২ হাজার টন। কথা হলো, গুদামে কতটা মজুদ থাকলে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবেÑসেটি এক জটিল ইস্যু। কোনো নির্দিষ্ট সীমা-পরিসীমা দিয়ে একে চিহ্নিত করা কঠিন বৈকি। কেননা দুর্যোগ কখন বা কী মাত্রায় আঘাত হানবে, সেটি আগে থেকে অনুমান করা দুঃসাধ্য। আর সরকারি গুদামগুলোয় যে খাদ্যশস্য মজুদ রাখা হয়, তা প্রধানত আপৎকালীন প্রস্তুতি। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা খাদ্যশস্য গুদামজাত করার একটা উদ্দেশ্য বটে। তবে আমরা বাজারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতেও দেখেছি, সরকার সাধারণত গুদাম খুলতে চায় না। বরং খাদ্য সংরক্ষণ করে রাখতে চায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কঠিনতর কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য। যুক্তি হিসেবে যে এটি প্রায় অকাট্য, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সমস্যা হলো, দীর্ঘদিন আপৎকালীন খাদ্যপণ্য গুদামে পড়ে থাকার কারণে ওগুলোর মানের অবনতি ঘটে, নষ্টও হয় প্রচুর এবং অনৈতিক সুযোগ তৈরি হয় একশ্রেণির সুযোগসন্ধানীর সামনে। এ অবস্থায় আমাদের পরামর্শ, দুর্যোগ ও বাজার পরিস্থিতি দুটোই আমলে নিয়ে খাদ্যশস্য সংগ্রহে আরও বিজ্ঞোচিত সমাধানের চিন্তা করা উচিত সরকারের।