সরবরাহ বেশি হলে চালের দাম কমছে না কেন

মোতাহার হোসেন: কোনো পণ্যের দাম বাড়লে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে নিম্ন, মধ্যম ও সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। কয়েক দিন ধরে চালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। চালের দাম বৃদ্ধি নিয়ে কয়েক দিন ধরেই পত্রপত্রিকা, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমেও খবর প্রকাশ হচ্ছে।
খবরে বলা হচ্ছে, হঠাৎ করেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চালের দাম বেড়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে প্রতি কেজি চালের দাম বেড়েছে তিন থেকে চার টাকা। সে হিসেবে ৫০ কেজি বস্তার দাম বেড়েছে ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। মূলত চালের মজুত, সরবরাহ পর্যাপ্ত হলেও রহস্যজনক কারণে চালের দাম বাড়িয়েছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। এ নিয়ে পরিচালিত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানেও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তারা বলেছে, চাল নিয়ে অসাধু চক্র ‘চালবাজি’ করছে।
সরকারি হিসাবে দেশে চালের ঘাটতি ১০ লাখ টন; কিন্তু আমদানি হয়েছে ৮২ লাখ টন, অর্থাৎ প্রায় ছয়-সাতগুণ বেশি। সরকারি হিসাবে গত বছরের বন্যায় প্রায় ১০ লাখ টন চালের উৎপাদন কম হয়েছিল। কিন্তু গত এক বছরে সব মিলিয়ে ৩৭ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। আরও ৪৫ লাখ টন রয়েছে আমদানি প্রক্রিয়ায়। আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার ও ব্যাংকঋণের সুবিধা নিয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা চাল আমদানি করছেন। ২০১৭ সালের এপ্রিলে আকস্মিক পাহাড়ি ঢল-বন্যায় সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওরে ফসলহানি ঘটে। প্রকৃতির এ রোষে এসব অঞ্চলে চাল উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওর, শনির হাওরসহ প্রধান প্রধান হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে এ বছর বোরো মৌসুমে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে আট লাখ টনের মতো। পাহাড়ি ঢল-বন্যায় প্রায় পাঁচ লাখ টন চাল উৎপাদন কম হয়েছে। একই কারণে নেত্রকোনায় উৎপাদন কম হয়েছে তিন লাখ টন। কিশোরগঞ্জে উৎপাদন কম হয়েছে আড়াই লাখ টন। অর্থাৎ তিন জেলায় উৎপাদন কম হয়েছে সাড়ে ১০ লাখ টনের মতো। মৌলভীবাজারসহ আরও দু-তিনটি জেলায় অকাল বন্যা-ঢলে দুই লাখ টনের মতো চাল উৎপাদন কম হয়। কয়েকটি জেলায় এ বছর ব্লাস্ট রোগের কারণে বোরোর ফলন কম হয়েছে। আবার কোনো কোনো জেলায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি হয়েছে। যেমন সাতক্ষীরা, দিনাজপুর, পাবনাসহ বোরো ধান উৎপাদনের জন্য পরিচিত জেলাগুলোয় ফসলহানির খবর মেলেনি। বলা যায়Ñসুনামগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ কয়েকটি জেলায় ১২ থেকে ১৩ লাখ টন চাল উৎপাদন কম হয়েছে। এটাই ঘাটতি। যে দেশে এক বছরে প্রায় চার কোটি টন চাল, গম ও ভুট্টা উৎপন্ন হয়, সে দেশে এই ঘাটতি চালের বাজারকে অস্থির করে তুলতে পারে না। এমন অবস্থায় বিষয়টি গুরুত্বসহ দেখে দ্রুত অসাধু চাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এবং তাদের গুদামে শিগগিরই অভিযানে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অসাধু চক্র চালের অবৈধ মজুত গড়ে তোলা ও খোলাবাজারে চালের সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এমন অবস্থায় চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে অসাধু ব্যবসায়ী, চালের সিন্ডিকেটদের আইনের আওতায় দ্রুত আনতে হবে। পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকার প্রধান বাজারগুলোয় এখন প্রতি কেজি মিনিকেট (সরু) চালের দাম ৬৬ টাকা। প্রতি কেজি নাজিরশাইলের দাম ৬৫ থেকে ৬৮ টাকা। কিন্তু ঢাকার বাইরে চালের দাম এরচেয়ে অনেক কম। রাজধানীতে চালের দামের এই ঊর্ধ্বগতির জন্য অসৎ ব্যবসায়ীদের কারসাজিকে দায়ী করেছেন ক্রেতাসহ সংশ্লিষ্টরা। সদ্য শুরু হওয়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে আমদানি করা চালের ওপর ২৮ শতাংশ শুল্ক পুনরায় আরোপ করার অজুহাতে রাজধানীর অসৎ ব্যবসায়ীরা চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ চিত্র রাজধানীর বাইরেও বিরাজমান। গত বছর দেশে আগাম বন্যা ও হাওরে পানি বাড়ায় ধানের ফলন নষ্ট হয়েছিল। কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর সর্বমোট ১৬ লাখ টন ফসলের ক্ষতি হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে সরকার চাল আমদানির মাধ্যমে এ সংকট কাটিয়ে ওঠার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকার চালের আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে প্রথমে ১০ শতাংশ ও পরবর্তীকালে দুই শতাংশ নির্ধারণ করে। চালের আমদানি শুল্ক ছাড়ের সুযোগ নিয়ে এ সময় পর্যন্ত দেশে মোট প্রায় ৬০ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। এছাড়া এ বছর দেশে বাম্পার ফলন হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এ বছর চালের উৎপাদন চার কোটি টন ছাড়িয়ে যাবে। অথচ চালের দাম বাড়ছে। দেশের কৃষক যাতে তাদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য পান, সেজন্য ৩৮ টাকা কেজি দরে মোটা চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কৃষক সরকার নির্ধারিত ৩৮ টাকা কেজি দরেই সরকারি গুদামে চাল সরবরাহ করছেন। মফস্বলের বাজারগুলোয় মোটা চালের দর ৩৮ টাকার বেশি নয়। এছাড়া সেখানে সব ধরনের চিকন চালের কেজি ৪৮ থেকে ৪৯ টাকার মধ্যে। অথচ রাজধানীতে চালবাজারের চিত্র মফস্বলের বাজারের তুলনায় পুরোপুরি বিপরীত। রাজধানীতে প্রতি কেজি চিকন (মিনিকেট) চালের দর এখন সর্বনি¤œ ৬২ থেকে ৬৬ টাকা। এছাড়াও ৬৫ থেকে ৬৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে নাজিরশাইল।
হঠাৎ কী কারণে চালের দাম বেড়েছেÑজানতে চাইলে পাইকারি ব্যবসায়ীরা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘ঈদের কারণে পরিবহন ও শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে; আবার কোথাও কোথাও রাস্তা সংস্কার, সম্প্রসারণ কাজ চলছে। চালের মোকাম নামে পরিচিত নওগাঁ বা দিনাজপুর থেকে এক ট্রাক চাল রাজধানীতে আনতে যেখানে ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকা পরিবহন ব্যয় হতো, সেখানে এখন ৩২ থেকে ৩৫ হাজার টাকা লাগছে। এর প্রভাব পড়ে চালের দামে। একইভাবে নওগাঁ থেকে চট্টগ্রামে এক ট্রাক চাল নিতে ব্যয় হচ্ছে ৪০ হাজার টাকা। এর ওপর কারও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।’ ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে, ঈদের পর শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে চালের মোকামগুলোয়। ট্রাক পাওয়া গেলেও এর চালক বা হেলপার পাওয়া যাচ্ছে না। আবার গুদাম থেকে চাল ট্রাকে তোলার জন্য শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। আবার পাওয়া গেলেও আগের তুলনায় দ্বিগুণ পারিশ্রমিকে কাজ করাতে হচ্ছে। তাই চালের দাম বাড়ছে বলে জানান তিনি।
গত ৭ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে চালের আমদানি শুল্ক দুই শতাংশ থেকে বাড়িয়ে আগের ২৮ শতাংশে উন্নীত করার পর থেকেই রাজধানীতে চালের দাম বাড়ছে। ঈদের পর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি পরিবহন ব্যয় ও শ্রমিক সংকট।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকার সব সময় বাজার নিয়ন্ত্রণে মোটা চালের ওপর গুরুত্ব দেয়। সরু বা চিকন চালের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি সরকারকে তেমন ভাবিয়ে তোলে না। এ সুযোগে অসৎ ব্যবসায়ীরা রাজধানীতেই সব সময় চালের দাম বাড়ান। এছাড়া রাজধানীতে মোটা চালের তুলনায় চিকন চালের বিক্রি বেশি। তাই দাম বেড়ে যাওয়ার পর তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়। এক ধরনের হুলুস্থুল শুরু হয়। প্রকৃতপক্ষে দেশের চালবাজারে কোনো অস্থিরতা নেই। গ্রামগঞ্জে মোটা-সরু সব ধরনের চালের দামই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
জয়পুরহাটের একজন চাল ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, ‘রাজধানী ছাড়া দেশের কোথাও চালের দাম বাড়েনি। দেশে চালের দাম বৃদ্ধির সংবাদটি পুরোপুরি ভিত্তিহীন। দাম বৃদ্ধির কোনো সুযোগ নেই। যদি চালের দাম কোথাও বেড়ে থাকে, তা বেড়েছে রাজধানীতে। আর এর জন্য দায়ী অসৎ ব্যবসায়ীরা। তারা সুযোগ বুঝেই চালের দাম বাড়িয়েছেন অনৈতিক মুনাফার জন্য। ৫৬ লাখ টন চাল আমদানি করা হলো দুই শতাংশ আমদানি শুল্ক দিয়ে। সেই ৫৬ লাখ টন চাল নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আসছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে ধান-চালের বাম্পার ফলনও হয়েছে। বাম্পার ফলনের মধ্যেও চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে না আসাও রহস্যের জš§ দিচ্ছে। আর এর জন্য যারা দায়ী, তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
অথচ বিশ্ববাজারে চালের বাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। তিন সপ্তাহের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে চালের দাম প্রতি টনে ৩৫ থেকে ৪০ ডলার কমে গেছে। বিশ্ববাজারে প্রতি টন চালের দাম এখন ৪০০ ডলারের নিচে। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে দেশে বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে প্রায় দুই কোটি টন। আমন উৎপাদন হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টন। চলতি মাস পর্যন্ত এক বছরে আমদানি করা হয়েছে প্রায় ৫৬ লাখ টন চাল। সোয়া তিন কোটি টন চাহিদার বিপরীতে দেশে বছরজুড়ে চাল ছিল প্রায় চার কোটি টন। এ হিসেবে চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি। এরপরও দাম না কমে কেন বাড়ছে, তার কোনো উত্তর কারও কাছে নেই। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার দেশের নিম্ন ও মধ্যম শ্রেণিসহ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]