‘সর্বত্র মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার চর্চা নিশ্চিত হলে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার ডরিন পাওয়ার জেনারেশনস অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেডের মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগের প্রধান ও এইচআর স্পিকস বাংলাদেশের লিড কনসালট্যান্ট এসএম আহ্বাবুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

এসএম আহ্বাবুর রহমান ডরিন পাওয়ার জেনারেশনস অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেডের মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগের প্রধান ও এইচআর স্পিকস বাংলাদেশের লিড কনসালট্যান্ট। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। পরে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এমবিএ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) থেকে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট কমপিটেন্সিস (এইচআরএমসি) কোর্স সম্পন্ন করেন। তিনি বাংলাদেশ সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্টের (বিএসএইচআরএম) একজন সহযোগী সদস্য। সফলতার স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ‘এইচআর গুরু’ হিসেবে ভূষিত হয়েছেন তিনি

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই

এসএম আহ্বাবুর রহমান: ২০০৭ সালে একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে অপারেশনস (এইচআর, অ্যাডমিন) বিভাগে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবনের শুরু। এরপর ২০০৯ সালে পলমল গ্রুপের এইচআর বিভাগে যোগ দিই। ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিন বিভাগের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এরপর সুপার স্টার গ্রুপের এইচআর বিভাগের ম্যানেজার হিসেবে এক বছর কাজ করি। ২০১৭ সালে ডরিন পাওয়ার জেনারেশনস অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেডের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান কাজ শুরুর আগে বছরখানেক সময় মদিনা গ্রুপের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে কেন বেছে নিলেন?

আহ্বাবুর রহমান: মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগেই যে ক্যারিয়ার গড়ব এমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। বরং ছোট বেলায় ইচ্ছা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হব। কিন্তু কর্মজীবনে প্রবেশের পর মনে হয়েছে এইচআর পেশাটিই আমি উপভোগ করছি। এছাড়া মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের কাজ হলো মানুষকে জানা, মানুষকে নিয়ে কাজ করা। আমি মানুষকে নিয়ে কাজ করতে, জানতে ও বুঝতে ভালোবাসি। মানুষের সঙ্গে মিশতে ভালোবাসি ও তা উপভোগ করি। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ এটি। তাছাড়া আমি ধরাবাঁধা নিয়মের বাইরে কাজ করতে পছন্দ করি। উন্নয়নমূলক ও সৃজনশীলে কাজে আমার বেশ আগ্রহ রয়েছে। যেহেতু এইচআর প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের উন্নয়নে কাজ করে একইসঙ্গে সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে তাই মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি।

শেয়ার বিজ : প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ এইচআরের ভূমিকা গুরুত্ব সম্পর্কে বলুন

আহ্বাবুর রহমান: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ এইচআরের গুরুত্ব অপরিসীম। একটা সময় এইচআরের কাজ শুধু কর্মী ছাঁটাই বাছাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এইচআরদের কর্মপরিধি বেড়ে গেছে। শুধু তাই নয়, এইচআরকে এখন ব্যবসার কৌশলগত অংশীদার বলা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এইচআর বিভাগ। প্রতিষ্ঠানের কর্মী বাহিনীকে সুসংগঠিত করছে। এছাড়া কর্মী বাছাই, নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের পর তাদের উন্নত করা, দক্ষতা বৃদ্ধি করা, কর্মীকে সঠিক জায়গায় নিয়োগ দেওয়া মানবসম্পদ বিভাগের কাজ। কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে প্রতিষ্ঠানের রেভিনিউ (আয়) বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক। বর্তমানে উদ্যোক্তারা বুঝতে পারছেন মেশিনই সবকিছু নয়, মেশিনের পেছনে যে মানুষ কাজ করে তারাই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সম্পদ। তাদের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে ব্যবসার সফলতা। আর এইচআর ম্যানেজার প্রতিষ্ঠানের সেসব কর্মীদের ক্রমাগতভাবে দক্ষতা বৃদ্ধি করে, প্রেষণা দিয়ে, দৈনন্দিন নানা সমস্যার সমাধান করে, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে ধরে রেখে ব্যবসার সফলতার জন্য কাজ করেন। তাই মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার সঠিক চর্চা যেমন এগিয়ে নেয় ব্যবসাকে তেমনি সর্বত্র মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার চর্চা নিশ্চিত হলে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের জন্য চ্যালেঞ্জিং বিষয় কী?

আহ্বাবুর রহমান: কর্মক্ষেত্রে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হয়। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক কর্মী ও মালিকদের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেন। কর্মী ও মালিক উভয়পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপককে এগিয়ে যেতে হয়। অনেক সময় কর্মীদের নানা চাওয়া পাওয়া থাকে আবার মালিকপক্ষের নানা প্রতিবন্ধকতা থাকে এসব বিষয় মাথায় রেখে কর্মীদের প্রেষণার দিক নিশ্চিত করে এগিয়ে যাওয়াটা অন্যতম একটা চ্যালেঞ্জ। এছাড়া স্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠানে সঠিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার চর্চা হচ্ছে না ওইসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করাটা আরও বেশি চ্যালেঞ্জের। এইচআরের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কর্র্মী নির্বাচনের সময় অনেক ধরনের সুপারিশ থাকে; এসব কিছুর মধ্য দিয়ে একজন ভালো কর্মী বাছাই করা অনেক চ্যালেঞ্জের। এছাড়া এমপ্লয়ী এনগেজমেন্টও কম চ্যালেঞ্জের নয়।

শেয়ার বিজবাংলাদেশের এইচআর প্রাকটিস সম্পর্কে জানতে চাই

আহ্বাবুর রহমান: বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশে বেশ পরিবর্তন এসেছে। ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে। আগে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে এইচআর প্রাকটিস ছিল কিন্তু বর্তমানে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে এ বিভাগ রয়েছে। উদ্যোক্তারা এইচআর বিভাগের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। এছাড়া বিভিন্ন পেশাগত সংগঠনগুলো সঠিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা চর্চার জন্য কাজ করছে। এইচআরের পরিধি বেড়েছে।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপককে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

আহ্বাবুর রহমান: পেশা হিসেবে এইচআর যেমন চ্যালেঞ্জিং তেমনি সম্মানজনকও বটে। তিনি প্রতিষ্ঠানের একজন কৌশলগত ব্যবসায়িক অংশীদার। আমি পেশাটি বেশ উপভোগ করছি।

শেয়ার বিজ: যারা পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন

আহ্বাবুর রহমান: এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহীদের স্বাগত জানাই। আগ্রহীদের বলতে চাই, স্নাতক পর্যায় থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত কোন বিষয়ে পড়বে, কোন সেক্টরে ক্যারিয়ার গড়বে। যারা এইচআরে আসতে চান তাদের স্নাতক পর্যায় থেকেই নানা ধরনের কোর্স, পড়ালেখা, সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে পরামর্শ দেব। যেমন বিএসএইচআরএমের সদস্য হতে পারে। নানা ধরনের ট্রেনিং, সেমিনার ও কোর্সের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। নিজেকে ডেভেলপ করার মধ্যে রাখতে হবে। লক্ষ্য ঠিক রেখে পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যেতে হবে।

শেয়ার বিজ: সফল মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক হতে হলে কী কী গুণ থাকা জরুরি বলে মনে করেন?

আহ্বাবুর রহমান: সফল হতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি জানতে হবে, জ্ঞান অর্জন করতে হবে। সময় ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হতে হবে। দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া শিখতে হবে। সৎ ও সময়নিষ্ঠ হতে হবে। শেখার আগ্রহ থাকতে হবে। নিজেকে সব সময় শেখার মধ্যে রাখতে হবে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলি থাকতে হবে। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে। আর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।