মত-বিশ্লেষণ

সাংবাদিকদের জন্য ন্যায়বিচার

লিয়ন উইলেমস: প্রখ্যাত সৌদি সাংবাদিক এবং নিজ দেশের সরকারের সমালোচক জামাল খাসোগি। নির্যাতন, হত্যা, তারপর তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে-ছিঁড়ে ছিন্নভিন্ন করা হলো ইস্তাম্বুলের সৌদি কন্স্যুলেটের মধ্যে। এরও পর কেটে গেল আট মাসের বেশি সময়। প্রথম দিকে খাসোগির জীবনে যা ঘটেছিল, তা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য সৌদি আরব পিছুটান দেখাতে থাকে। কিন্তু তুরস্ক তখনই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু করল। যতটা আশা করা হয়েছিল তদন্তে ততোটা বেরিয়ে এলো না।
তুরস্ক সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য যে খুব বেশি কথা বলে তাও বলা চলে না। সেক্ষেত্রে আমরা ২০১৮ সালের ঘটনা স্মরণ করতে পারি। তখন ৮০’র বেশি সাংবাদিক বিভিন্ন অভিযোগে দীর্ঘদিনের কারাভোগ অথবা আর্থিক জরিমানায় দণ্ডিত হন। কিন্তু খাসোগির হত্যার ক্ষেত্রে তুর্কি সরকার প্রচণ্ড ঘৃণা ও ক্রোধ প্রকাশ করল। এক্ষেত্রে হয়তো তারা অনেক বেশি কূটনীতিক সুবিধা বাগিয়ে নিতে চেয়েছে। তুর্কি বিচারপতিরা আন্তর্জাতিক চুক্তি বা বাধ্যবাধকতা অনুসারে এই মামলা ভালোভাবে তদন্ত করার আদেশ জারি করেন।
কিন্তু সৌদি আরব উল্টোরথে চলতে থাকে। তারা আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনে তদন্তে সহায়তা করার বিষয়টি যেন তুড়ি মেরেই উড়িয়ে দিল। শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এই রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রটি ১১ সন্দেহভাজনের ওপর শুনানি চালাল। কিন্তু জাতিসংঘের বিচারবহির্ভূত হত্যা বা নির্বিচার মৃত্যুদণ্ডবিষয়ক বিশেষ দূত এগনেস ক্যালামার্ডের বক্তব্য অনুসারে এই গোপনতাপূর্ণ রুদ্ধদ্বার শুনানিতে কেবলই অপরাধীকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছেÑন্যায়বিচারকে সুরক্ষা করার বিষয়টি তারা বেমালুম উপেক্ষা করেছে।
‘আমরা জানি না কে এখানে আসামি সাব্যস্ত হলো, তাদের মধ্যে কে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখী, এমনকি দায়ই-বা কী ছিল’। বার্লিনের এক সাম্প্রতিক সম্মেলনে ক্যালামার্ড এভাবে মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, পশ্চিমা সরকারগুলোর ‘উচিত নয় কোনো বিচার-বিবেচনা না করেই এই শুনানি প্রক্রিয়ার অনুমোদন দেওয়া, যেখানে সব ধরনের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে উপেক্ষা করা হয়েছে।’
স্বচ্ছতা ও যথাযথ প্রক্রিয়া না মেনে যে ফৌজদারি মামালা এখানে সম্পন্ন করা হয়েছে তার ফলাফলে যদি আন্তর্জাতিক মহল সন্তুষ্ট হয়, তবে খাসোগির মামলা ভেস্তে যাবে এবং সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে সৃষ্টি অপরাধের দায়মুক্তিকে একেবারে শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার প্রচেষ্টা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দুর্ভাগ্যক্রমে এই মামলার ফলাফলে এমন একটি দৃষ্টান্তই সৃষ্টি হতে চলেছে।
১৯৮২ সালের এল সালভাদরের গৃহযুদ্ধে এই শোচনীয় পরিস্থিতির উচ্চতা অনুভব করা গিয়েছে। সে যুদ্ধে কর্নেল মারিও রিজ মেনা তার সেনাদলগুলোকে এল পারেইসো নগরীর ঠিক বহির্মুখে ওঁত পেতে থাকার নির্দেশ দিয়েছিল। ডাচ্-গণমাধ্যম আইকন’র চারজন সাংবাদিকও তখন ওই শহরে যুদ্ধের প্রতিবেদন তৈরির কাজ করছিলেন। এ সময় তারা ওই ফাঁদের পাশ দিয়ে হাঁটাহাঁটি করছিল। বরাবরের মতোই তাদের সেখানে নির্মমভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
বিশ্বব্যাপী এসব অত্যাচার জুলুম বেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতির মধ্যেই এল সালভাদরের সরকার সত্য লুকিয়ে ফেলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে থাকে। তারা দাবি করেন সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যেকার সংঘটিত ক্রসফায়ারের মধ্যে পড়ে দুর্ঘটনাবসত তাদের মৃত্যু হয়েছিল। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরকার সালভাদরীয় সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে, নির্দেশনা দিয়ে ও রশদ জুগিয়ে সাহায্য করেছিল। কাজেই সাংবাদিক হত্যার এই দাবির প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র সরকার সালভাদরীয় সেনাবাহিনীকে খোলাখুলিভাবে জনসমক্ষে সমর্থন জোগাল। প্রতিক্রিয়ায় আমস্টারডামের যুক্তরাষ্ট্রীয় কন্স্যুলেট জেনারেলের ওপর ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।
ওই ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের সহকর্মীরা বিষয়টিকে ভুলতে পারেননি। তারা গবেষণা চালাতে থাকে। তাদের গবেষণা ফলাফলে দেখা গেল, চার সাংবাদিককে নিতান্ত ইচ্ছা করেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছিল। এর এক দশক পরেই ১৯৯৩ সালের কথা, ইউএন ট্রুথ কমিশন সালভাদরের গৃহযুদ্ধ নিয়ে তদন্ত শুরু করে। এই তদন্তে সাংবাদিকদের গবেষণার ফলাফলের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। অথচ রিজ মেনা এখনও মোটামুটি ভালোভাবেই বেঁচে আছেন। তার বয়স এখন ৭৯ বছর। সে ওয়াশিংটনের এক শহরতলিতে বাস করেন।
প্রথমত, এই যুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতে মানবাধিকার সমুন্নত করার লক্ষ্যে যে মামলা পরিচালিত হচ্ছিল ১৯৯৩ সালে, সে সময়ে সেনাবাহিনী, সংসদীয় দল ও গেরিলা যোদ্ধাদের রাজক্ষমা আইনে দায়মুক্ত করার জন্য একটি রায় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে সালভাদরীয় সুপ্রিম কোর্ট এই রায়কে পাল্টে দেয় এবং অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা দেয়।
বর্তমানে একটি দুর্বল কারিগরি সক্ষমতা ও অপর্যাপ্ত লোকবল নিয়ে সালভাদরীয় প্রসিকিউটর কাজ করে যাচ্ছে। রিজ মেনা এবং এল সালভাদরের গোপন পুলিশ বাহিনীর সাবেক প্রধান ফ্রান্সিসকো এন্টনিও মোরানের বিরুদ্ধে একজন নিহত সাংবাদিকের ভাইয়ের দায়ের করা অপরাধবিষয়ক মামলায় প্রসিকিউটর কাজ করছেন। তিনি সন্দেহভাজন অভিযুক্তকারীদের ওপর তদন্ত চালাচ্ছেন। কিন্তু ন্যায়বিচার যে এখানে প্রতিষ্ঠিত হবেই তা পরিষ্কার করে বলা যায় না। এটা খুব বিরল ঘটনা। অন্তত এ কারণে যে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যে কোনো অপরাধের দায়মুক্তি একটি সহনীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
এই পুরোদস্তুর চিত্রটিই আসলে সৌদি আরবে বিরাজ করছে। খাসোগি হত্যার ভেতর দিয়েই কেবল তার পরিসমাপ্তি হয়নি। কয়েক ডজন সাংবাদিক এখনও সৌদি আরবের কারাগারে বন্দি। এদের মধ্যে তুর্কি বিন আবদুল আজিজ আল-জাস্সার নামের এক সাংবাদিককে লাগাতার নির্যাতন চালিয়ে তারা হত্যা করেছে গত বছর। সৌদি আরব এ আচরণ করেও কোনো কূটনীতির দণ্ডের সম্মুখীন হয়নি।
তার মানে এই নয় যে, সাংবাদিকদের ওপর যারা অপরাধ সংঘটিত করল তারা যে কোনো উপায়ে দায়মুক্তি পেয়ে গেলেই সবকিছু চুকে যায়। গত বছরের স্লোভাকিয়ায় ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকিয়ে দেখতে পারি: ২৭ বছর বয়সী সাংবাদিক জ্যান কুসিয়াক একটি রাজনৈতিক দুর্নীতির ভেতর দিয়ে অপরাধ সংগঠনের মামলা নিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এ অবস্থায় কুসিয়াক ও তার বাগদত্তা মার্টিনা কুসনিরোভা গুলিতে নিহত হন। হত্যাকাণ্ডের পর জনগণ রাস্তায় নেমে আসে আর দাবি জানায়, এই হত্যাকাণ্ডের দায় রাষ্ট্রজনকে নিতে হবে। তারাই এসব ঘটিয়েছে।
একদিকে জনগণের চাপ, আরেক দিকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দাবি একযোগে চাপ সৃষ্টি করল। ফলে একটি জোরালো ও শক্তিশালী প্রভাব পড়তে থাকে: প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলেন, জেনারেল প্রসিকিউটর পরিবর্তন করা হলো এবং শুরু হলো ব্যাপক পরিসরে তদন্ত প্রক্রিয়া। মার্চ মাসে মারিয়ান কচনার নামের এক ব্যবসায়ী এই হত্যাকাণ্ডের হুকুমদাতা হিসেবে অভিযুক্ত হয়।
তবে এল সালভাদরে ন্যায়বিচার পরিবেশিত হবে বলে একটি আশা এখনও মিটমিট করে জ্বলছে। তাই ধন্যবাদ জানাতে হয় মানবাধিকারবিষয়ক আইনজ্ঞ ও সমাজকর্মীদের, ভুক্তভোগীদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ পারিবারিক সদস্যদের এবং তাদের সাবেক সহকর্মীদের। ধন্যবাদ জানাতে হয় ডাচ সরকারের চাপ সৃষ্টি উদ্যোগকে এবং পাবলিক প্রসিকিউটর অফিসকে যারা আইকন’র নিহত সাংবাদিকদের আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে উপাত্ত সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাংবাদিকদের ওপর সংগঠিতসহিংস অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতে ন্যায়বিচার সমুন্নত করতে ‘ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড’, ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ ও ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’ নামের সংগঠনগুলো ‘সত্যের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী’ স্লোগানে নানামুখী প্রচেষ্টায় কাজ শুরু করেছে। এ ধরনের অপরাধের তদন্ত কাজগুলো পুরো মামলা পরিচালনা প্রক্রিয়ার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করবে। এমনকি তদন্ত কাজগুলো পরিচালনায় সাংবাদিক, ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ ও গণ-উপাত্ত গবেষকদের নিয়ে একটি দল গঠন করতে হবে।
জনচাপকে অনুপ্রাণিত করতে স্লোভাকিয়ায় যা হতে দেখলাম, তা সবখানেই হতে হবে: তদন্তকারীদের উচিত হবে তাদের প্রাপ্ত সব তথ্য-উপাত্ত ডকুমেন্টারি কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর কাছে পেশ করা। যদি এসব করেও অপরাধীদের ন্যায়বিচারের আওতায় আনার কার্যকর পদক্ষেপকে উদ্দীপ্ত করা না যায়, তবে আমরা একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে তুলব যারা সাংবাদিকদের ওপর সংগঠিত নানা রকম অপরাধের মামলা স্বচ্ছতার সঙ্গে উম্মুক্ত জনগণের আদালতে পরিচালনা করবে।
সারা বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকরা প্রতিটি দিনই নিজ জীবনকে তুচ্ছ করে চলছে। ক্ষমতায় বসে থাকা মানুষগুলো যা কিছু লুকাতে চায় তা আলোর মুখ দেখাতেই কেবল এদের নিরন্তর প্রচেষ্টা। খাসোগি, মাল্টার ডাফনে কারুয়ানা গালিজিয়া ও বেলারুসের পাভেল শেরেমেতের মতো যেসব সাংবাদিক তাদের জীবনের চূড়ান্ত মূল্যটুকুও পরিশোধ করে চলে গিয়েছেন তারা ন্যায়বিচার পাওয়ার দাবিদার। তারা কাজ করেছেন তাদের নিজ স্বার্থে নয়, বরং সেই সাংবাদিকদের স্বার্থেই করেছেন, যারা এখনও এই পৃথিবীতে বেঁচে আছেন; তারা কাজ করেছেন তাদের পাঠকদের জন্য, দর্শকের ও শ্রোতাদের জন্য সবাইকে তারা জানাতে চেয়েছিলেন দুনিয়ার সত্যিকার চিত্রটা আসলে কী।

ডিরেক্টর, ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে
ভাষান্তর: মিজানুর রহমান শেলী

সর্বশেষ..