সামাজিক অনাচার ও বৈষম্য প্রতিরোধে হও আগুয়ান

 

তৌহিদুল হক: মানব সমাজের সমবেত জীবনধারার পশ্চাতে অন্যতম শানে নুজুল হলো বয়স, শিক্ষা, ক্ষমতা, অর্থ প্রভৃতি নিয়ে বৈষম্যের বিষয়গুলোকে মানবিকতা দিয়ে জয় করে জীবনের শুদ্ধতার কোরাস গাওয়া এবং বিশ্বাস করা সেই বন্ধনে যেখানে মিলেমিশে যাওয়ার প্রবণতাই মূল লক্ষ্য। মানুষ বিশ্বাস করে এগিয়ে যাবে মানবের তরে; তবেই সুস্থ সমাজ, তবেই পুষ্টিকর সমাজ। একটি সমাজের সামগ্রিক চিত্র বদলে দেয় মানুষ, আবার মানুষই সমাজের উন্নয়নে মানবিক পদচারণকে কলুষিত করে। সময়ের দাপটে মানুষের মানবিক চেহারার মুখোশ উম্মোচন হয়। বিভিন্ন সামাজিক ঘটনা বা সমস্যা সমাজের মধ্যকার মানবিক শক্তিকে যেমন স্তিমিত করে দেয়, আবার সমস্যাও মানুষকে মানবিক করে, মানুষের প্রতি মায়ার বন্ধন দৃঢ় করে। মানব ও উন্নয়ন ইতিহাস পর্যালোচনায় লক্ষণীয় যে, বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশ মানুষকে একত্র করেছে। মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে একত্র হয়েছে, আবার স্বার্থের প্রয়োজনে দূরে অবস্থান করেছে। মানুষ প্রয়োজনে এ ধরনের আচরণ করছে, কিন্তু মানুষ মানুষকে ভুলতে পারেনি। এটিই হলো সমাজ টিকে থাকার মূল শক্তি। এ শক্তির কারণেই সমাজ টিকে থাকবে।

একটি সুস্থ, সুন্দর সমাজের স্বপ্ন সবাই দেখে, সবাই প্রত্যাশা করে সব হৃদয়ে ফুটুক সেই ফুল যা গন্ধবিলাসী আয়োজনে জীবন সাজাতে আরামীয় অনুশীলনের ক্লান্তিহীন বয়ে চলা। এই জায়গায় বাঙালি সমাজ মার খেয়েছে বারবার, এখনও খাচ্ছে দেদার। মূল কারণ হলো মানবিকতায় ভরপুর সমাজ তৈরিতে যেসব উপাদান অপরিহার্য, তার মধ্যে মানুষই প্রধান। আবার মানুষ নিয়েই গন্ডগোল বেশি, মানুষ সৃষ্টি করে বন্ধনের বিপরীত সংগীত, যা সমগ্র সমাজের জন্য কলঙ্কময়, মানবের নীরব জ্বালা।

সম্প্রতি সমাজে শিশু ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন ও হত্যা, টিজিং, জনসমাগম স্থানে প্রকাশ্যে অসম্মানজনক আচরণ প্রদর্শন, মানবিক বোধের অবক্ষয়, ভিনদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ প্রভৃতি সামাজিক অসঙ্গতিগুলো সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর সমাজ তৈরির পেছনে বড় বাধা। প্রশ্ন হলো, এ বাধা সৃষ্টি করছে কে? উত্তর মানুষই সৃষ্টি করছে। মানুষ হিংস্র হচ্ছে মানুষের ওপর, প্রতিষ্ঠিত করছে নিজ ক্ষমতার দাপট। সর্বোপরি, সমাজের পারস্পরিক প্রীতির অনুষ্ঠানে সংঘটিত হচ্ছে অপ্রত্যাশিত, ন্যক্কারজনক হট্টগোল।

মানুষের ব্যবহার, সমাজ কর্তৃক আয়ত্ত মূল্যবোধের চর্চা, মানুষের হƒদয়ের অনুভব বোঝার মতো মানসিকতা ধারণ করাই হলো মানবের কাজ। মূলত, এ সকল আচরণের সর্বব্যাপী অনুশীলনের মধ্য দিয়ে মোটামুটি মাত্রায় গ্রহণযোগ্য একটি মানব সভ্যতা দাঁড়িয়েছে, যা মানবের নিজস্ব তাগিদেরই ফসল। বাংলাদেশে সম্প্রতি আমরা দেখছি কীভাবে বড়দের হাতে শিশুরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বড়রা ক্ষতি করছে বড়দের। তারা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে সমাজের নিয়ম-কানুনকে তথা দেশের প্রচলিত আইন ও শৃঙ্খলাকে। যেভাবে সমাজের অবক্ষয় হচ্ছে এভাবে আর কত দিন কিংবা কত ঘটনা ঘটলে টনক নড়বে আমাদের?

বিস্ময়কর লাগে যে, একজন মানুষের শারীরিক আকার পেতে সংগ্রাম করতে হয় নয় মাস কিংবা কম-বেশি। পক্ষান্তরে, সামাজিক জীব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করানোর সংগ্রামটি আজীবনের। এ সংগ্রাম জীবন থেকে জীবনে। জীবন গড়তেই কেটে যায় আজীবন।

স্বাধীনতা পরবর্তী পর্যায় থেকে বাংলাদেশের সমাজ ইতিহাস হিসাব করলেও একটি ফলন্ত পর্যালোচনা সম্ভব। এরই ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকসহ উন্নয়নের সব ধারার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে, যার খেসারতই আমরা এখন দিচ্ছি। কারণ, রাজনীতি পরিণত হয়েছে সর্বত্র প্রভাব বিস্তারকারী একটি প্রক্রিয়ায়। প্রশ্ন উঠতে পারে, কীভাবে এটি হলো। রাজনীতিকে মানবসেবায় ব্যবহার যতটা হয়েছে, তার চেয়ে অপব্যবহারই হয়েছে বেশি। এই অপব্যবহারে মানুষের অপরাধী প্রবৃত্তির মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর লাগাম একদিনে টানা সম্ভব নয়। কারণ রাজনৈতিক দলগুলো দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংগ্রামের অনেক বিষয়েই একমত হতে পারেনি। সেখানে রাজনৈতিক আলোচনায় সামাজিক বিষয়গুলো অনেকাংশেই উপেক্ষিত। এই উপেক্ষিত ভাবনা আমাদের নিয়ে যায় বর্বরতার অতল গহ্বরে, যেখানে মানুষ ভয় পায় মানুষকে!

সময়ের সঙ্গে সামাজিক বিষয়গুলো নিয়ে অনেক দেশই উন্নত ও মার্জিতভাবে চিন্তা করতে শিখেছে, শিখিনি শুধু আমরা। আমরা মনে করি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সব শিখে নেবে। এটি একটি ‘তথাকথিত’ চিন্তা বা প্রত্যাশা। এ প্রত্যাশা বর্তমানে পূরণ হচ্ছে না, বলা যায় হবেও না। অশুভ শক্তির হাতে ছেড়ে দিয়ে দেশ, সমাজ, সমষ্টি বা সংগঠন কোনোমতে চলে যায় বটে, তবে বেশি দূর নয়।

দৈহিক আত্মাকে সামাজিক আত্মায় পরিণত করতে হলে ‘সামাজিক বিনিয়োগ’ করতে হবে। আমাদের দেশে সামাজিক বিনিয়োগ প্রক্রিয়াটি এখনও যথেষ্ট আলোচনায় আসেনি। সরকার মনে করে, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষকে সামাজিকভাবে পরিপক্ক করবে। এ আশা একেবারে ভিত্তিহীন নয়। তবে সমাজ প্রতিষ্ঠানকে সার্বিকভাবে পরিচালনার জন্য চাই পর্যাপ্ত অর্থের বিনিয়োগ। বিনিয়োগ করলে মুনাফা প্রত্যাশা করা সম্ভব। সামাজিক বিনিয়োগও মানুষের মানবিকতা বৃদ্ধি, সংরক্ষণ ও অনুশীলনে অভ্যন্তরীণ চাপ বৃদ্ধি করবে।

চলতি বছরের বর্তমান সময় পর্যন্ত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দেয়া তথ্য মতে, সারা দেশে বিভিন্ন বয়সের ৪৬৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। সারা দেশে ধর্ষণের চেষ্টা ও ধর্ষণের পর ২৬ জনকে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ উল্লেখ করে, বর্তমান সময় পর্যন্ত ১১৫ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওসিসি বিভাগের তথ্য মতে, গত মাসে ৮১ জন নারী ও শিশু শারীরিক, মানসিক ও ধর্ষণের কারণে ভর্তি হয়। ওসিসি আরো তথ্য প্রদান করে যে, অন্যান্য সময়ে এ সংখ্যা ৫০/৫৬ থাকে, কিন্তু বর্তমানে অতীতের তুলনায় শিশুর সংখ্যা বেশি।

সাম্প্রতিক এ ঘটনাগুলোর সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে যে সব সমাধানমূলক বা নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে আশানুরূপ ফল পাওয়া যেতে পারে প্রথমত, প্রতিটি ঘটনার বিচার অতি অল্প সময়ের (ছয় মাসের বেশি নয়) মধ্যে সম্পন্ন করা ও গণমাধম্যের ব্যাপক পরিসরে প্রচার করা দরকার। দ্বিতীয়ত, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য সামাজিক বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বাঙালি ঐতিহ্য অনুসারে সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কর্মযজ্ঞ সাজাতে হবে। তবেই পারস্পরিক সম্প্রীতি সময় থেকে সময়ান্তরে ছড়িয়ে পড়বে। তৃতীয়ত, প্রতিটি ঘটনার বিষয়ে সব ধরনের রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতা, অর্থ, স্বজনপ্রীতিসহ বিচার বা ঘটনাকে প্রতিহত করে এসব উপাদান দমনের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চতুর্থত, সব ধরনের অপরাধও কিন্তু অপরাধীদের একধরনের ধ্বংসাত্মক কমিটমেন্ট। তাই পরিবার, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষার কোর্স চালু করা এবং সবার জন্য তা বাধ্যতামূলক করা দরকার যাতে সবার মধ্যে গঠনমূলক কমিটমেন্ট সৃষ্টি হয়। পঞ্চমত, বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় প্রায় বিলুপ্ত ক্লাবঘর, পাঠাগার, খেলাধূলার সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে আপনত্ববোধ যেমন তৈরি করতো, তেমনই সিনিয়র ও জুনিয়রদের মধ্যে একধরনের মেলবন্ধন তৈরি করত। এ মেলবন্ধনই মানুষের শক্তি, আবেগের এক চূড়ান্ত রূপ, যা বেঁচে থাকার অন্যতম পাথেয়। এ মেলবন্ধনই মানুষকে যুগে যুগে সামাজিক করেছে। মানুষের মধ্যে তৈরি করেছে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি। এ বন্ধন মানুষকে কর্মের মাধ্যমে এমন একটি জায়গায় উপনীত করেছে, যা দর্শনের বিচারে মহত্ত্বের গভীরতায় মহিয়ান।

বর্তমান সময়ে বাংলার সম্প্রীতি চর্চার এ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশিত মাত্রায় ক্রিয়াশীল নয়। সময় এখন মানুষকে যোগাযোগের এমন একটি মাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে, যার নাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগের এ মাধ্যমটি ভার্চুয়াল জগতে মানুষকে প্রবেশ করিয়ে আসক্তি সৃষ্টি করছে। এটি বিভিন্নভাবে মানব সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মানুষকে অভ্যস্ত করছে ধ্বংসাত্মক আচরণে, যা আমাদের সমাজের জন্য কল্যাণসূচক নয়।

একজন মানুষের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো সমাজে মানুষের মধ্যে তার অবস্থান। অর্থাৎ একজনের দুঃখে কতজন বেদনার হাসি হেসেছে, কতটা শূন্যতাবোধ গ্রাস করেছে অন্যদের। এ শক্তি, এ মন্ত্র মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে অনন্তকাল। অনন্তকালের যাত্রায় মানুষের মানবিক পরিচয়ের পরিপূরক বলতে কিছুই নেই। মানবতার পরিচয় মানবতা দিয়ে, মানবতার বিকল্প আরও মানবতা।

বাংলাদেশের অতীত সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে এবং অনুশীলনের মাধ্যমে রূঢ়তার বিপরীতে মানবতার সেøাগান অনুশীলনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

সর্বশেষ, সবার মনটা মানসিক বিষাদগ্রস্ত হয় এ ধরনের আচরণগত বিচ্যুতি প্রতিরোধে সবার সমবেত প্রচেষ্টাই পারবে আমাদের সামাজিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে, পারবে মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ ও সম্প্রীতির অনুভূতি সদা জাগ্রত রাখতে। ভুলে গেলে চলবে না কত লক্ষ জনম ঘুরে ঘুরে/ আমরা পেয়েছি ভাই মানব জনম/ এ জনম চলে গেলে… আর পাবো না।

 

সহকারী অধ্যাপক

সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

[email protected]