সালমা-রুমানাদের ম্যাচ ফি মাত্র ৬০০ টাকা!

ক্রীড়া প্রতিবেদক: সমাজের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার! কথাটা স্পষ্ট করে সংবিধানের মৌলিক অধিকার অংশে লেখা আছে। কিন্তু বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার সেই প্রত্যয় শুধু কিতাবেই আছে, আমাদের যাপিত জীবনে এর ছিটেফোঁটাও যেন নেই! দিন শেষে নারী-পুরুষের একই নোনা ঘামে দেশ এগিয়ে চললেও পারিশ্রমিক আর প্রশংসায় যোজন যোজন দূরত্ব! আশ্চর্য হওয়ার কিছুই যেন নেই। এই তো গতকাল কুয়ালালামপুরের কিনরারা একাডেমি ওভাল মাঠে সগৌরবে উড়ল লাল-সবুজ পতাকা। ভারতকে তিন উইকেটে হারিয়ে নারী এশিয়া কাপের শিরোপা জিতলেন বাংলাদেশের মেয়েরা। ছয় বারের চ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে টাইগ্রেসরা রচনা করলেন নতুন এক ইতিহাস!
কিন্তু সেই সাফল্যের পর খোদ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) কর্তারা এখন পর্যন্ত ঘোষণা করেননি কোনো অর্থ পুরস্কার। যেখানে বাংলাদেশ দল সর্বশেষ নিদহাস ট্রফির মতো ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠেই সাকিবরা পেয়েছেন কোটি টাকা অর্থ পুরস্কার। এমনকি অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট জয়ের পর তাৎক্ষণিকভাবেই জুটেছে কোটি টাকা ইনাম!
বৈষম্যটা অবশ্য গোড়াতেই! সাকিব-তামিমদের মাসিক বেতন সালমা-রুমানাদের তুলনায় আকাশছোঁয়া। ছেলেদের ক্রিকেটে প্রথম শ্রেণির চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড় ৮৫ জন। ‘এ প্লাস’ শ্রেণিতে মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান, মাশরাফি বিন মুর্তজা ও তামিম ইকবালের মাসিক বেতন চার লাখ টাকা। ‘এ’ শ্রেণির একমাত্র খেলোয়াড় মাহমুদউল্লাহ পান মাসে তিন লাখ টাকা। ‘বি’ শ্রেণিতে থাকাদের বেতন দুই লাখ টাকা। ‘সি’ শ্রেণিতে বেতন দেড় লাখ। আর ‘ডি’ শ্রেণির এক লাখ টাকা। অথচ মেয়েদের কেন্দ্রীয় চুক্তির বাইরের ক্রিকেটারদের কোনো বেতন নেই। কেন্দ্রীয় চুক্তির অঙ্কটিও একেবারে করুণা করার মতোই। তিনটি গ্রেডে ৩০, ২০ ও ১০ হাজার টাকা করে বেতন!
এখানেই শেষ নয়, ছেলেদের জাতীয় লিগে প্রথম স্তরে ম্যাচ ফি ২৫ হাজার টাকা। দ্বিতীয় স্তরে ২০ হাজার। বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে ম্যাচ ফি ৫০ হাজার টাকা। মেয়েদের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ম্যাচ ফি মাত্র ৬০০ টাকা! আজকাল দিনে এর চেয়ে বেশি আয় করেন একজন দিনমজুরও!
এমন লজ্জাজনক বিষয়গুলো নিয়ে অবশ্য কম লেখালেখি হয়নি। কিন্তু প্রবল দাপুটে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বারবারই নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। এই তো সেদিনও পুরুষ-নারী ক্রিকেটারের এমন পারিশ্রমিক বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তুললে তিনি বলেন, ‘আপনি কার সঙ্গে তুলনা করছেন সেটা বললে বুঝতে পারব। বিরাট কোহলি যে পারিশ্রমিক পাচ্ছে ভারতের নারী দলের অধিনায়ক তা পায় না। ম্যাচ ফি অন্য জিনিস। আমার তো মনে হয় সৌম্য-ইমরুলরা যা পায়, মেয়েরা তার কাছাকাছিই পায়। ওরা (মেয়েরা) হয়তো পায় ৪০-৫০ হাজার টাকা আর তারা ‘বি’ ক্যাটেগরির ক্রিকেটার পায় ৭০ হাজার। সাকিব-মাশরাফি-তামিমের বেতনের যদি কথা বলেন তাহলে বলব ওরা তো বেশি পাবেই।’
খোদ বোর্ড প্রধান যখন এভাবে ভাবেন, তখন আর কিইবা প্রত্যাশা করতে পারেন সালমা, রুমানারা। অথচ তাদের হাত ধরেই ২১ বছর পর বড় কোনো ট্রফি পেল বাংলাদেশ। যেখানে সাকিবরা আক্ষেপ সঙ্গী করে ফিরছেন, সেখানে নারীরা ফিরবে মাথা উঁচু করে!
কেন এই বেতন বৈষম্য? এ নিয়ে গতকাল শেয়ার বিজকে বিসিবি পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি বলেন, ‘দেখুন, এখন ওরা জিতেছে বলেই প্রশ্নটা উঠেছে। আমি মনে করি আরও আগেই এ জায়গায় সংশোধন করা উচিত ছিল। কারণ মেয়েদের পারিশ্রমিক আর ম্যাচ ফি একেবারেই অপ্রতুল। আমার বিশ্বাস, এখন অন্তত যারা এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন তারা গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবন করবেন।’ বিসিবির এ পরিচালক আরও বলেন, ‘কেন এতদিন তাদের বেতন আর ম্যাচ ফি বাড়ানো হয়নিÑএ প্রশ্ন এখন আর করে লাভ নেই। আমার মনে হয় এখন সময় এসেছে সত্যি অনুধাবনের। মেয়েরা খেললে আরও অনেক কিছুই পেতে পারি আমরা। ওদের পাশে থাকা উচিত। আগের ভুলগুলো শুধরে বোর্ডের অবশ্যই এখন সালমাদের পাশে থাকা উচিত।’
বৈষম্যটা শুধু ঘরোয়া ক্রিকেটেই নয়, আন্তর্জাতিকেও একই হাল। বাংলাদেশ জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়রা একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতি ম্যাচে পান দুই লাখ টাকা। নারী ক্রিকেটারদের প্রতিটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে পায় আট হাজার টাকা। মানে পুরুষ ক্রিকেটারদের ২৫ ভাগের এক ভাগ। যদিও ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার নারী ক্রিকেটারদের এমন বৈষম্যের শিকার হতে হয় না।
দেশের ক্রিকেটের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি সঙ্গী করে ফিরলেও হয়তো তেমন সুখবর মিলবে না। সালমাদের কী পুরস্কার দেওয়া যায় সেটা নিয়ে আজ নাকি বোর্ডসভায় বসবেন কর্তারা। হয়তো কিছু নগদ অর্থ পুরস্কার মিলবে। কিন্তু দৃশ্যপট বদলানোর কোনো লক্ষণই নেই। কর্তাদের দায় তো আছেই। সঙ্গে স্পন্সর প্রতিষ্ঠানগুলোও নারী ক্রিকেট উন্নয়নে এগিয়ে আসছে না!
এক দশক ধরে জাতীয় দলে খেলেও নারী ক্রিকেটারদের গাড়ি কিংবা বাড়ি হয়নি। হয়তো পাবলিক বাসে চড়েই দু’দিন বাদে প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করতে যাবেন, রুমানা-জাহানারা কিংবা সালমা খাতুনরা। অন্তর্জালে এ নিয়ে দুয়েক কথা লেখা হলেও ভাগ্য বদল হবে না গোটা জাতিকে ঈদ উপহার এনে দেওয়া এই ক্রিকেটারদের!