সাহসের সঙ্গে গঠনমূলক সমালোচনা করাও নৈতিকতা

আবদুল মকিম চৌধুরী : নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় সমাজের সর্বত্র। এক দুঃসময়ে বাস করছি আমরা বিশিষ্ট নাট্যকার অধ্যাপক মমতাজ উদ্দীন আহমেদ যাকে ‘হারামি সময়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অনৈতিকতা আমাদের এতই পেয়ে বসেছে, নৈতিকতার সংজ্ঞাই ভুলে যাচ্ছি আমরা।

সম্প্রতি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ২০তম দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সাবেক গভর্নর বলেছেন, ‘আমরা যারা গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি, আমরা জানি আমাদের একটি স্বাক্ষরযুক্ত কাগজের কত মূল্য। সবাই বিশ্বাস করছে, এটাই টাকা। এটাই নৈতিকতা। ঠিক তেমনই ব্যাংকে অর্থ থাকার পরও কেউ চেক দিয়ে টাকা না পেলে সেটি নৈতিকতা বর্জিত।’

রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ-আইডিইবি মিলনায়তনে সম্মেলনে ‘অর্থশাস্ত্র ও নৈতিকতা: বিশেষ প্রায়োগিক ক্ষেত্রসমূহ’ শীর্ষক অধিবেশনে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

নৈতিকতা বিষয়ে সাবেক গভর্নরের সংজ্ঞা ও উদাহরণ তার প্রজ্ঞা ও খ্যাতির সঙ্গে বেমানান। তার কথার রেশ ধরে একজন শিক্ষক বলতে পারেনÑআমরা শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি, আমরা মানুষ গড়ার কারিগর। অভিভাবকেরা বিশ্বাস করে সন্তানদের পড়ানোর জন্য পাঠিয়েছেন, শিক্ষার্থীরাও আমাদের কাছে পড়ছে। এটি বিশ্বাস, এটিই নৈতিকতা।

সবাই নিজের মতো করে বিশ্বাস ও নৈতিকতার ব্যাখ্যা দিলে সমাজ এগোতে পারবে না। কারণ, সাধারণ মানুষ মনে করে দায়িত্ব ও নৈতিকতা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়Ñযথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করার নামই নৈতিকতা। একজন শিক্ষক যথাসময়ে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন, দায়িত্বে ফাঁকি দেন না; কর্মস্থলে না এসে হাজিরা খাতায় সই দেন না। কাজ না করে বেতন নেন না। শিক্ষার্থীদের কাছে অনুকরণীয় ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো পর্যায়ে জড়িত থাকেন না। এমন শিক্ষককে নৈতিকতাসম্পন্ন বলি।

একজন প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ভালো করেই জানেন, একখানা কাগজের ‘কাগজি মুদ্রা’ হয়ে উঠতে কী যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। বিভিন্ন প্রক্রিয়া, নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রভৃতি বিবেচনায় একখানা কাগজ হয়ে ওঠে ‘কাগজি মুদ্রা’। এটিকে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করার মধ্যে বিশ্বাস ও নৈতিকতার কোনো স্থান নেই, এটি করা মানে দেশের আইন মেনে চলা। নিজের প্রয়োজনেই নাগরিকরা এ আইন মানতে বাধ্য। গভর্নরের প্রতি বিশ্বাস তো পরের কথা, এ আইন পরিপালন রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ও দেশপ্রেমের দৃষ্টান্তও নয়। নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের প্রশ্ন আসবে তখন যখন কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়া স্বতপ্রবৃত্ত হয়ে এমন কাজ থেকে নিজে বিরত থাকা, অন্যকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করা; যে কাজে দেশের ক্ষতি হয়।

গভর্নরের বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে বিভিন্ন পেশাজীবীরা নিজেদের মতো করে বিশ্বাস ও নৈতিকতার দৃষ্টান্ত দেবেন। নিজের একটি বক্তব্যওে উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারতেন তিনি। জামালপুরে নিজের প্রতিষ্ঠিত দিগপাইত শামসুল হক ডিগ্রি কলেজে ‘শিক্ষার পরিবেশ ও মান উন্নয়ন’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় শিক্ষকদের উদ্দেশে এই গভর্নর বলেছিলেন, শিক্ষকেরা নিয়মিত পাঠদান করছেন কি না, ফাঁকি দিচ্ছেন কি না প্রভৃতি দেখার জন্য অভিভাবকদের লাঠি হাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসে বসে থাকা উচিত।’ তিনি শিক্ষকতা পেশার বিরুদ্ধে বলেননি, বলেছেন শিক্ষকদের অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে।

বিশ্বাস ও নৈতিকতার দৃষ্টান্ত হিসেবে সাবেক গভর্নর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নিজের কোনো মহৎ কাজকে তুলে ধরতে পারতেন, যদি উল্লেখ করার মতো তেমন কিছু থাকে। নাগরিক ও দায়িত্ববান কর্মকর্তার দুই ধরনের কাজ বা দায়িত্ব থাকেÑআবশ্যিক ও ঐচ্ছিক। দুই ধরনের কাজ তখনই নৈতিকতার অন্তর্ভুক্ত, যখন এতে সততা, স্বচ্ছতা থাকে।

যত দূর জানি, দায়িত্বপালনকালে এ গভর্নর নৈতিকতা প্রশ্নে দৃঢ়তার পরিচয় দিতে পারেননি।

তার এমন কিছু কাজ রয়েছে, যেগুলো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ারই উদাহরণ। তিনি একক সিদ্ধান্তে ১০ জন সিবিএ নেতার শাস্তি মওকুফ করে দিয়েছেন। ঈদুল আজহার আগে শেষ কার্যদিবসে ৩ নভেম্বর ২০১১ গোপনে এ ১০ জনের শাস্তি মওকুফ করেন তিনি। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া ছয়জন আবার চাকরিতে যোগ দিয়েছেন তার আদেশবলেই। ১৮ আগস্ট ২০০৯ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আহমেদ জামালের কক্ষে একই বিভাগের যুগ্ম পরিচালক (তৎকালীন উপপরিচালক) সাহিদার রহমানকে মারধর করা হয়। এর পরদিন সাহিদার রহমান ওই ১০ জনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। কয়েক দফা তদন্তে অভিযোগ প্রমাণ হলে ৭ এপ্রিল তাদের বিরুদ্ধে উল্লিখিত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর আগে ২৮ ফেব্র–য়ারি এ ১০ জনকে সর্বশেষ দফায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি বিধির ৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এক সপ্তাহের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশে তাদের কয়েকজনকে চাকরিচ্যুত ও অপর কয়েকজনকে কেন বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। তাদের জবাবে সন্তুষ্ট হতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শাস্তি মওকুফের ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যেও অসন্তোষ ছিল।

ওই মারধরের ঘটনায় সাহিদার রহমান মতিঝিল থানায় মামলা করেছিলেন। শাস্তি মওকুফের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে ৯ নভেম্বর তৎকালীন গভর্নরের কাছে দেওয়া চিঠিতে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ন্ত্রণ বিধি অনুসারে মামলা চলাকালে কাউকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা যায় না। আমি বিনয়ের সঙ্গে আপনাকে সে কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।

অভিযুক্ত ওই ১০ সিবিএ নেতা গভর্নরের কাছে আপিল আবেদন করলে একটি পুনর্বিবেচনা কমিটি গঠন করেন গভর্নর। নির্বাহী পরিচালক আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসানের নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের ওই কমিটি এ বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে, আপিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র গভর্নরের।

সাহিদার রহমানকে লাঞ্ছনার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের সিবিএ নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারকে প্রতিবেদন দেয়। এতে ওই ১০ সিবিএ নেতা ও কর্মীর নাম উল্লেখ করে অনতিবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতেও বলা হয়েছিল।

হাস্যকর ব্যাপার হলো, কাগজি মুদ্রায় নিজের স্বাক্ষর থাকাকে নৈতিকতা বলে আখ্যা দিয়েছেন সাবেক এই গভর্নর। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকে শৃঙ্খলা আনয়নে কী ভূমিকা রেখেছেন তিনি। নৈতিকতার দৃষ্টান্ত হিসেবে সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদের একটি কাজের কথা তুলে ধরতে পারতেন তিনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থাকাকালে (বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে) কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিশৃঙ্খলা ও গভর্নরের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের কারণে ৩০ অক্টোবর ২০০৩ তৎকালীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১০ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এ সিদ্ধান্ত সর্বমহলে প্রশংসিত হয় এবং এতে বাংলাদেশ ব্যাংকে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা পায়।

কেন্দ্রীয় বাংকের রিজার্ভ চুরি নিয়েও কিছু বলতে পারতেন। ব্যাংকে অর্থ থাকার পরও কেউ চেক দিয়ে টাকা না পেলে সেটি নৈতিকতা বর্জিতÑএমনও বলেছেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক দখলের যে উৎসব চলছে এবং এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে ভূমিকা রাখছে, তা নৈতিকতাবর্জিত কি না, তা নিয়ে কিছু বলেননি তিনি। ব্যাংকে অর্থ থাকার পরও কোন ব্যাংক চেকের টাকা পরিশোধ করছে না, তাও খোলাসা করেননি সাবেক এই গভর্নর। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফারমার্স ব্যাংকের সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই এমন মন্তব্য করেছেন তিনি। আমরা জানি না, প্রতিবেদকের ধারণা ঠিক কি না। সাবেক গভর্নর যদি ফারমার্স ব্যাংক নিয়ে বলে থাকেন, কৌশলে বলতে পারতেন, শতশত লোক রানা প্লাজা ধরে নড়াচড়া করতে না পারলেও এক ব্যক্তিই কোনো ব্যাংক ধসে দিতে পারেন।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির নেতারা ভালো করেই জানেন, নৈতিকতার অভাব আমাদের প্রধান সমস্যাগুলোর একটি। দেশকে এগিয়ে নিতে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার পথ সুগম করতে নৈতিকতার বিকল্প নেই। ‘অর্থশাস্ত্র ও নৈতিকতা: বিশেষ প্রায়োগিক ক্ষেত্রসমূহ’কে অধিবেশেনের শিরোনাম করে সংস্থাটি এ বার্তা দিয়েছে যে, তারা এ বিষয়ে কেবল সচেতনই নয়; উত্তরণে পথও খুঁজছে। সংস্থাটির গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্তকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেন দেশের নীতিনির্ধারকরা। এ সংস্থার সভা সেমিনারে বরেণ্য অর্থনীতিবিদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের গুণীজন আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আলোচনা করেন, প্রবন্ধ পাঠ করেন। তাদের নির্মোহ নিরপেক্ষ কথা-লেখায় থাকবে উন্নয়ন ও সম্ভাবনার চুলচেরা বিশ্লেষণ, সরকারের প্রতি পরামর্শ এবং পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের করণীয়। এখানে তারা সাহসের সঙ্গে সত্য উচ্চারণ করবেন, গঠনমূলক সমালোচনা করবেন; এটিও নৈতিকতা।

 

গণমাধ্যমকর্মী

amchy9Ñgmail.com