‘সিএফওর দক্ষতার ওপর নির্ভর করে একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নতি’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার চায়না-বাংলা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো. আমজাদ হোসেন, এসিএমএ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

মো. আমজাদ হোসেন, এসিএমএ চায়না-বাংলা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও)। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। তিনি দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) একজন সহযোগী সদস্য

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই…

মো. আমজাদ হোসেন, এসিএমএ: ক্যারিয়ার শুরু করি চায়না-বাংলা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগে অফিসার হিসেবে। ওই প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাত বছর কাজ করি। পদোন্নতি পেয়ে একই বিভাগের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এরপর সেভেন সার্কেল বাংলাদেশ লিমিটেডে অ্যাকাউন্টস, কস্টিং, বাজেট অ্যান্ড কন্ট্রোলিং বিভাগের ম্যানেজার হিসেবে যোগ দিই। পদোন্নতি পেয়ে অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগের ডিজিএম হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। দীর্ঘ ৯ বছর এ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন শেষে আবার ২০১৮ সালে চায়না-বাংলা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে ফাইন্যান্সকে কেন বেছে নিলেন?

আমজাদ হোসেন: ফাইন্যান্সকে পেশা হিসেবে বেছে নেব এমন পরিকল্পনা ছিল না। মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলাম। ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তির সময় লক্ষ্য পরিবর্তন করি। বড় ভাইয়ের পরামর্শে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হই। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করে অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগে কাজ শুরু করি। একইসঙ্গে মনে হয়েছিল ফাইন্যান্স বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ে কাজ করার জন্য পেশাগত ডিগ্রি প্রয়োজন। তখন চাকরির পাশাপাশি আইসিএমএবিতে ভর্তি হই। এভাবে ফাইন্যান্স পেশাকেই ক্যারিয়ার হিসেবে গড়ে তোলার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিই।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে প্রধান অর্থ কর্মকর্তার ভূমিকা ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাই…

আমজাদ হোসেন: প্রতিষ্ঠানে একজন সিএফও বা প্রধান অর্থ কর্মকর্তার ভূমিকা ও গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিষ্ঠানের ক্রমবিকাশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ফাইন্যান্স কর্মকর্তা সে ক্রমবিকাশে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সিএফও’র বড় দায়িত্ব। প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বৃদ্ধিতে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে থাকেন তিনি। ফাইন্যান্স কর্মকর্তা কেবল অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স নিয়েই কাজ করেন না। তাকে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানের অন্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হয়। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর এই অর্থায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সিএফওকেই নিতে হয়।

শেয়ার বিজ: ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট (এফআরএ) কোম্পানির ওপর কীরূপ প্রভাব ফেলবে?

আমজাদ হোসেন: অনেক আলোচনা ও সমালোচনার পর ২০১৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর এফআরএ পাস হয়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিংয়ের স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য আইনটি করা হয়েছে। আইনটি অডিটরদের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। এ আইনের সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সঠিক চিত্রটি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টে প্রতিফলিত হবে। এতে করে শেয়ারহোল্ডারদের পাশাপাশি দেশ উপকৃত হবে।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশের করনীতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

আমজাদ হোসেন: কাস্টমস, ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক, আয়কর ও করপোরেট কর এগুলোই মূলত সরকারের রাজস্ব খাতের প্রধান উৎস। এর মধ্যে করপোরেট করহারের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি, তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানি, ব্যাংকিং কোম্পানি ও অন্য কোম্পানির করহার ভিন্ন। জনগণের কল্যাণেই করনীতি করা হয়েছে। তবে সব মিলিয়ে বলতে চাই করপোরেট করের বিষয়টি নিয়ে আরও চিন্তার সুযোগ রয়েছে। সরকারের উচিত, করহার কমিয়ে করের আওতা ও পরিধি বাড়ানো।

শেয়ার বিজ: কোম্পানিতে সিএফও’র জন্য কী ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকে?

আমজাদ হোসেন: সব কাজেই চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ পেশাও ব্যতিক্রম নয়। সময়ের সঙ্গে আইন-কানুন, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসার পরিবেশ-পরিস্থিতি পরিবর্তিত হচ্ছে, যা এ পেশার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া সিএফওকে প্রতিষ্ঠানের সব বিভাগের সঙ্গে কাজ করতে হয়। সব বিভাগের সমন্বয় বা সহযোগিতা নিয়ে কাজ করতে হয়। এ সবকিছু পরিচালনার মধ্যে চ্যালেঞ্জ থাকে। এছাড়া অর্থায়ন, বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত থাকা, সরকারের বিভিন্ন আইন-কানুন, কর্তৃপক্ষ তথা শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ চিন্তা করে ব্যবসাকে এগিয়ে নেওয়ার মধ্যেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে সিএফওকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

আমজাদ হোসেন: পেশা হিসেবে চ্যালেঞ্জিং ও মর্যাদাপূর্ণ। একটি প্রতিষ্ঠানের সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একমাত্র সিএফওই মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারেন। সিএফও’র দক্ষতার ওপর একটি প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়ন নির্ভরশীল।

শেয়ার বিজ: যারা এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ…

আমজাদ হোসেন: যারা ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের স্বাগত জানাই। এ পেশায় কাজের অনেক সুযোগ রয়েছে। একাডেমিক পড়ালেখার পাশাপাশি পেশাগত কোর্স ও দক্ষতা থাকলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। প্রথমেই লক্ষ্য স্থির করতে হবে আগামী দিনে নিজেকে প্রতিষ্ঠানের কোন পর্যায় দেখতে চান। এ লক্ষ্য সামনে রেখেই কাজ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত-শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি সততা ও পরিশ্রমই তাকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে।