সিজোফ্রেনিয়া

মানুষের ভেতর ও বাইরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে যেমন অসুখ হয়, তেমনি হয় মনেরও। এ অসুখ মানুষের জীবনকে সবচেয়ে বেশি অসুখী করে তোলে। এমনই একটি রোগ সিজোফ্রেনিয়া। এটি মানসিক রোগ। ২০ থেকে ৪৫ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী, নারী-পুরুষ যে কেউ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এ রোগের লক্ষণ হচ্ছে, চিন্তাধারা ও অনুভূতি প্রকাশের মধ্যে সংগতি না থাকা। এতে মনের স্বাভাবিকতা হারিয়ে যায়, মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। রোগাক্রান্তের পরিবার ও পরিচিতরা সমস্যায় পড়ে যান রোগীর অদ্ভুত আচরণ দেখে। তাদের সঙ্গে মানিয়ে চলাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ রোগকে অনেক সময় মানসিক রোগের ক্যানসার হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানুষের রোগজনিত অক্ষমতার প্রথম ১০টি কারণের একটি সিজোফ্রেনিয়া। এতে আক্রান্তরা সম্মানহীন, বন্ধুহীন, আত্মীয়হীন অবস্থায় জীবন যাপন করে। শারীরিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়ে, শিক্ষার সুযোগ হারায়, চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে, শারীরিক সুস্থতা নষ্ট হয়, চেহারা বিনষ্ট হয়। সামাজিক বন্ধন ছিঁড়ে যায়, সর্বোপরি ভবিষ্যৎ জীবন বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে না।
১৮৮৭ সালে জার্মান মনোবিদ এমিল ক্রেপলিন প্রথম এ রোগের সন্ধান পান। রোগটি মূলত চেতনাকে আক্রান্ত করে বলে ধারণা করা হয়। পরে আচরণ ও আবেগগত দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সৃষ্টি করে।

কারণ
সিজোফ্রেনিয়া মূলত মস্তিষ্কের রোগ। এ রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও আবিষ্কার সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন কারণে সিজোফ্রেনিয়া হতে পারে। মস্তিষ্কে সমস্যা, বংশগত কারণ, জš§কালীন কোনো জটিলতা, গর্ভকালীন মা ইনফ্লুয়েঞ্জা বা রুবেলায় আক্রান্ত হলে, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, মাথায় আঘাতজনিত কারণ, অতিরিক্ত ওষুধ সেবন ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত পরিবারে সিজোফ্রেনিয়া বেশি দেখা যায়। এছাড়া পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজনের প্রতি ভ্রান্ত বিশ্বাস, অহেতুক সন্দেহপ্রবণতা, অবাস্তব চিন্তাভাবনা, হ্যালুসিনেশন, অসংলগ্ন কথাবার্তা প্রভৃতি সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ। আর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষণ হচ্ছে অনাগ্রহ, চিন্তার অক্ষমতা, আবেগহীনতা, বিচ্ছিন্নতা প্রভৃতি।

প্রাথমিক কিছু বিষয়

রোগী কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না, কারও দেওয়া খাবার খেতে চায় না। সে ভাবে, তাকে খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে মেরে ফেলতে পারে।

এসব রোগী খুব আবেগপ্রবণ হয়, শিশুদের মতো আচরণ করে। অনেক সময় কান্নাও করে থাকে।

আক্রান্ত রোগী মনে করে তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তার স্বামী বা স্ত্রী, সন্তানও তাকে মেরে ফেলার জন্য আশেপাশের লোকেরা ষড়যন্ত্র করছে।

আক্রান্ত রোগী নিজের সঙ্গে কথা বলে। সে তার কল্পনায় মনে করে তার পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে এবং তার সঙ্গে কেউ কথা বলছে।

কোনো কারণ ছাড়াই অন্যকে সন্দেহ করে। সে মনে করে, সবাই তার তার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে।

অনেক সময় কানে অনেক ধরনের নাম ধরে ডাকা বা কথা বলার আওয়াজ শুনতে পায়। কিন্তু আসলেই তা আওয়াজ ছিল না। এটি তার মস্তিষ্ক-বিকৃতির কারণে হয়ে থাকে।

স্বাভাবিক মানুষের মতো চিন্তা করার কোনো শক্তি থাকে না। এ ধরনের রোগীর সুস্থধারার চিন্তাশক্তি নষ্ট হয়ে যায়।

সব সময় প্রাণনাশের ভয়ে থাকে। তাকে ও তার পরিবারকে হত্যা করা হবেÑএ ধরনের চিন্তা সব সময় তার মস্তিষ্কের মধ্যে ঘুরতে থাকে।

হঠাৎ করে হাসি, আবার কোনো কারণ ছাড়াই কান্না করে।

খুব বেশি রেগে বা উত্তেজিত হয়ে কাউকে মারতে চায়।

মানুষের সঙ্গে একেবারেই মিশতে
না চাওয়া।

কোনো কারণ ছাড়াই আত্মহত্যার
চেষ্টা করা।

এক স্থানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা।

আগে একেবারেই যা করত না, সে ধরনের আচরণ করতে থাকা।

পাবলিক স্থানে গায়ের কাপড় খুলে ফেলার চেষ্টা করা।

কথা শুনতে পায় কিন্তু তার সঙ্গে কেউ কথা বলছে না। আবার কেউ কথা না বললেও, এমনকি পশুপাখির আওয়াজ শুনতে থাকে। এ কারণে মাঝে মাঝে কানে তুলো বা আঙুল দিয়ে বসে থাকে।

গায়ে পোকামাকড়ের হাঁটার অনুভূতি পায়, মনে করে চামড়ার নিচে কিছু
হেঁটে চলেছে।

বিশেষ কোনো কিছুর গন্ধ পেতে থাকা, যদিও অন্যরা পায় না।

চিকিৎসা
সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তদের মধ্যে শতকরা ২৫ ভাগ চিকিৎসার পর সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। ৫০ ভাগ ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে। বাকি ২৫ ভাগ কখনও ভালো হয় না। এক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হচ্ছে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শমতো চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া। কারণ নিয়মিত ওষুধ ও কতগুলো মনোবৈজ্ঞানিক কৌশল প্রয়োগ ও উপদেশ মেনে চললে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
সিজোফ্রেনিয়ায় দু’ধরনের চিকিৎসা রয়েছে: ওষুধ প্রয়োগ ও সাইকোথেরাপি। সাইকোথেরাপির মধ্যে রয়েছে হ্যালুসিনেশন নিয়ন্ত্রণ, ফ্যামিলি থেরাপি, যোগাযোগের প্রশিক্ষণ, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের কৌশল প্রভৃতি। ওষুধ ও চিকিৎসার পাশাপাশি কমিউনিটি বেসড রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করতে হবে। শুরুতে চিকিৎসা করা হলে ফল ভালো হবে। চাকরির সংস্থান, বাসস্থানের ব্যবস্থা, যথাযথ শিক্ষার সুযোগ, উপযুক্ত বিনোদন, উষ্ণ ও ভালোবাসাপূর্ণ পারিবারিক জীবন তাদের আরোগ্য লাভকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এক কথায়, আমরা একটি ভালো
জীবনের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকি, তাদের প্রত্যেকের জন্য সেসব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

পরিবার ও সমাজের করণীয়
রোগীকে মানসিক চাপ না দেওয়া, তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করা ও চিন্তামুক্ত রাখা। যদি ওষুধ সেবনের মধ্যে থাকে, তবে ঠিকমতো ওষুধ খাচ্ছে কি না, চিকিৎসা নিচ্ছে কি না খেয়াল রাখতে হবে। সামাজিকভাবে রোগীর ক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। তাকে পাগল বিবেচনা করা যাবে না। এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। এ-ছাড়া সামাজিক মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে।

যেখানে সেবা দেওয়া হয়

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ

আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজ, মানসিক রোগ বিভাগ

পাবনা মানসিক হাসপাতাল

শিপন আহমেদ