সিটি ব্যাংকের সতর্কবার্তা, আতঙ্কিত ৭০০ কর্মকর্তা

পলাশ শরিফ: সিটি ব্যাংকে চলছে চরম আতঙ্ক। এফডিআর সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না করায় ৭০০ কর্মকর্তাকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে এফডিআরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেরও হুমকি দেওয়া হয়। আর এ নিয়ে চরম অস্থিতিশীলতা চলছে ব্যাংকটিতে।
জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে এসব কর্মকর্তাকে চিঠি দেওয়া হয়। ই-মেইল বার্তায় পাঠানো ওই চিঠিতে টার্গেট পূরণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি টার্গেট পূরণ না হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেরও হুমকি দেওয়া হয়।
চলতি সপ্তাহে সিটি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা এমনই একটি চিঠি পেয়েছেন। তিনি শেয়ার বিজকে জানান, চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন তিনি। টার্গেট পূরণ না করতে পারলে স্ত্রীর গয়না বিক্রি করে হলেও এফডিআর করতে হবে। তিনি বলেন, শাখায় যারা কাজ করেন, তাদের জন্য টার্গেট বেশি। আর প্রধান কার্যালয়ের জন্য টার্গেট অনেক শিথিল।
এদিকে কেবল চিঠিই নয়, মৌখিকভাবেও হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন কর্মকর্তারা। টার্গেট পূরণ না করলে প্রয়োজনে চাকরিও চলে যেতে পারে বলে হুমকি দিচ্ছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা।
ব্যাংকটির দায়িত্বশীল সূত্রের তথ্যমতে, তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য ‘অল এমপ্লয়ি ফিক্সড ডিপোজিট (এফডি) ক্যাম্পেইন’ চালু করেছে সিটি ব্যাংক। চলতি মাসের মধ্যেই প্রায় আটশ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহের জন্য এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্য পূরণ করতেই ব্যাংকটির দায়িত্বশীল প্রায় ৭০০ কর্মকর্তাকে এফডিআর সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে তা পূরণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এ নির্দেশনা পরিপালনে ব্যর্থতার বিষয়টি বার্ষিক পারফরম্যান্স মূল্যায়ন বিবেচনায় নেওয়া হবে বলেও ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছে। বেসরকারি পণ্য বা সেবা বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের মতো ব্যাংক কর্মকর্তাদেরও ‘লক্ষ্যমাত্রা’ নির্ধারণ করে দেওয়া নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সে সঙ্গে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে চাকরিতে বহাল থাকা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে ব্যাংকটিতে আতঙ্ক বাড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ব্যাংকিংয়ে তারল্য সংকট নতুন নয়। বেসরকারি অনেক ব্যাংকেই সংকট চলছে। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু এখানে ওষুধ ও বিমা কোম্পানির মতো ব্যাংকারদের এফডিআর সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। লক্ষ্য নিয়ে আমরাও কাজ করছি; কিন্তু এখানে তড়িঘড়িটা বেশি। এতে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। কয়েক যুগ ধরে কাজ করছি; কিন্তু এর আগে এমন বাজে অবস্থায় পড়তে হয়নি।’
তবে এফডিআর সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও তা পূরণে দেওয়া ‘চাপ’কে চলমান প্রক্রিয়া এবং পরিচালনা পর্ষদের নির্দেশেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে’ বলে দাবি করছেন ব্যাংকটির দায়িত্বশীলরা। আলাপকালে সিটি ব্যাংকের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ও মুখপাত্র মাসরুর আরেফিন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এর আগের বছরে আমি এক হাজার কোটি টাকার এফডিআর সংগ্রহ করেছি। এ বছর আমাকে ২৮০০ কোটি টাকা সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এজন্য আমরা ক্যাম্পেইন শুরু করছি। যার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এটা আমাদের কাজ; যার জন্য আমরা বেতন দিচ্ছি। যারা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছেন না, তাদের চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হচ্ছে। এটা চলমান প্রক্রিয়া, কোনো বাড়তি চাপ নয়। কারা এসব নিয়ে ননসেন্স কথাবার্তা বলছেন তা আমি জানি না।’
উল্লেখ্য, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে ১৯৮৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় সিটি ব্যাংক। প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে এটি শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বলে দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। ব্যাংকটিতে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মেধা-শ্রমে ভর করে পাঁচ বছরে ব্যাংকটির আয়-মুনাফায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০১২ সালে প্রায় ৭৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা কর-পরবর্তী মুনাফা করা ব্যাংকটি ২০১৬ সালে প্রায় ৪০৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা কর-পরবর্তী মুনাফা করেছে। তবে যাদের মেধা-শ্রমে ব্যাংকটির ভিত গড়ে উঠছে, সেসব কর্মকর্তার প্রতি অন্যায় আচরণের অভিযোগ রয়েছে।