সারা বাংলা

সিন্ডিকেটের দখলে যশোরের সবজিবাজার, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক

মীর কামরুজ্জামান মনি, যশোর: মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের দখলে যশোরের সবজিবাজার। প্রতিদিনই ঠকছেন চাষি ও খুচরা ক্রেতারা। সবজি চাষিরা সরাসরি খুচরা বিক্রেতাদের কাছে তাদের পণ্য বিক্রি করতে পারেন না। এ কারণে লাভের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে সিন্ডিকেটের পকেটে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে জেলায় ১৪ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে সবজি চাষ হয়েছে। এদিকে যশোরের বৃহত্তম পাইকারি সবজির বাজার সাতমাইল বারীনগর থেকে প্রতি হাটে প্রায় ৪০ ট্রাকেরও বেশি সবজি রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায়। যশোর শহর থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরত্বে সাতমাইল বারীনগর। সপ্তাহের প্রতি রোববার ও বৃহস্পতিবার এখানে হাট বসে। এছাড়া প্রতিদিন সবজি পাইকারি বেচাকেনাও হয়।
গত রোববার বারীনগর হাট ঘুরে দেখা যায়, যশোরের আশেপাশের গ্রাম থেকে ভ্যান ও নসিমনে করে চাষিরা এ হাটে বিভিন্ন ধরনের সবজি নিয়ে আসছেন বিক্রির জন্য। বারীনগর বাজারের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সব চাষির পটোলের দাম ফড়িয়ারা বলছেন প্রতি কেজি পাঁচ টাকা। সব ফড়িয়াদের দাম একই। চাষি তার পটোল ১০ টাকা দর চাইলেও শেষ পর্যন্ত পাইকারদের নির্ধারিত পাঁচ টাকা দামেই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। শুধু পটোল নয়, সব ধরনের সবজির দামই নিয়ন্ত্রণ করছেন ফড়িয়ারা। লোকসানের ভারে হাটে আসা শশা চাষির মুখে কোনো হাসি নেই। তবে ফুরফুরে মেজাজে পান খেয়ে ঠোঁট রাঙিয়ে ঘুরে ঘুরে সবজি কিনতে দেখা গেছে মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া ও ব্যাপারীদের।
এদিন বারীনগর হাটে ফড়িয়াদের নির্ধারণ করা দরে পেঁপে বিক্রি হয় ১২-১৩ টাকা কেজি, একই দিন যশোর বড় বাজারে খুচরা বিক্রি হয়েছে ২৫ টাকা কেজি। হাটে লাউ প্রতিটি বিক্রি হয় ১০-১২ টাকা, যশোর বড় বাজারে বিক্রি হয় ৩০-৪০ টাকা। হাটে উচ্ছের কেজি বিক্রি হয় ১২-১৩ টাকা, যশোর বড় বাজারে বিক্রি হয় ৬০ টাকা কেজি। হাটে সাদা বেগুন বিক্রি হয় ৩০ টাকা, যশোর বড় বাজারে ৫০ টাকা। হাটে বরবটি প্রতি কেজি বিক্রি হয় ১০ টাকা, যশোর বড় বাজারে ৪০ টাকা। হাটে পটোলের কেজি বিক্রি হয় পাঁচ টাকা, যশোর বড় বাজারে তা ২০ টাকা। হাটে জালি প্রতিটি বিক্রি হয় আট টাকা, যশোর বড় বাজারে ৩০-৩৫ টাকা। কচুরমুখী হাটে বিক্রি হয় ৩০ টাকা, যশোর বড় বাজারে ৫০ টাকা। হাটে করলা বিক্রি হয় ১৩-১৪ টাকা কেজি, যশোর বড় বাজারে ৪০ টাকা। হাটে কুশি বিক্রি হয় ৩-৪ টাকা, যশোর বড় বাজারে ২০-৩০ টাকা।
হাটে আসা সদর উপজেলার দৌলতদিহি গ্রামের সবজি চাষি জাকির হোসেন জানান, বারীনগর বাজারে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। মূলত এরাই নিয়ন্ত্রণ করে হাট। তারা একজোট হয়ে চাষির সবজির দাম নির্ধারণ করেন। এ মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়ারা বাজার থেকে চাষিদের সবজি কিনে নেন। এরপর দেশের বিভিন্ন মোকাম থেকে আসা ব্যাপারীদের কাছে নিজেদের পছন্দের দামে বিক্রি করেন।
হাটের পাশের গ্রাম বেলেঘাট থেকে সবজি বিক্রি করতে আসা চাষি মনিরুল ইসলাম জানান, তারা পাইকারি মণ হিসেবে সবজি বিক্রি করেন। এখানেও প্রতি মণে চার কেজি ঘাটতি দিয়ে সবজি বিক্রি করতে হয়। ৪০ কেজিতে ফড়িয়াকে ছাড় দিতে হয় দুই কেজি। আর ওজনদার বা কাটা করে যারা তাদের দিতে হয় দুই কেজি সবজি। অর্থাৎ এক মণ সবজিতে চার কেজি বাদ। চাষি প্রকৃত দাম পান ৩৬ কেজি সবজির।
হাটের পাশের গ্রাম শাহবাজপুর থেকে হাটে আসা চাষি আনোয়ার হোসেন জানান, তার চাষের খরচের টাকাও উঠছে না। হাট নিয়ন্ত্রণকারী ফড়িয়াদের সিন্ডিকেটের কারণে তারা সবজির ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।
তীরেরহাট গ্রামের চাষি রবিউল ইসলাম প্রতিটি ভালো মানের জালি বা কচি চালকুমড়া বিক্রি করেন আট টাকায়। তিনি জানান, প্রতিটি জালি ১৪ টাকায় বিক্রি হলে লাভবান হতেন। আট টাকায় বিক্রি হওয়ায় তিনি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বালিয়াঘাট গ্রামের চাষি আকবর আলী ভালো মানের কাঁকরোল বিক্রি করেন ২৫ টাকা কেজি আর বরবটি বিক্রি করেন ১০ টাকায়। এ দামে তার প্রচুর লোকসান হয়েছে। একই গ্রামের চাষি হারুনুর রশিদ কুশি বিক্রি করেন তিন-চার টাকা কেজি। তিনি জানান, কাক্সিক্ষত দাম না পেয়ে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বারীনগর বাজারের ইজারাদার ফরিদুল ইসলাম ফরিদ জানান, ব্যাপারীরা প্রতি হাটে ৪০ ট্রাকেরও বেশি সবজি রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ে যান।
যশোর বড় বাজারের এইচএমএম রোডের কাঁচামালের আড়ত আরিফ ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী শাহাবুদ্দিন মাতব্বর জানান, কিছু ব্যাপারী বারীনগর বাজার থেকে সকালে সবজি কিনে তার আড়তে বিক্রি করতে আসেন। তিনি রোববার প্রতি কেজি কাঁকরোল পাইকারি বিক্রি করেন ৩০ টাকা, উচ্ছে ২২-২৫ টাকা, কচরমুখী ৩৫ টাকা, পটোল আট টাকা। অথচ সড়কের ওপারেই খুচরা বিক্রেতারা প্রতি কেজি কাঁকরোল বিক্রি করছেন ৬০ টাকা, উচ্ছে বিক্রি ৬০ টাকা, কচুমুখী ৫০ টাকা এবং পটোল বিক্রি করছেন ২০ টাকা।
রাস্তার এপার থেকে ওপারে খুচরা বাজারে সবজির দামের পার্থক্য তিন থেকে চারগুণ। এর পুরো মুনাফা লুটে নেওয়া হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের পকেট থেকে। এ বিষয়ে জেলা বাজার কর্মকর্তা সুজাত হোসেন খান জানান, পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে দামের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে তারা খুব শিগগির ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবেন।

সর্বশেষ..