সিলেট থেকে বান্দরবান

হুট করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো বান্দরবান যাব। সন্ধ্যায় পরিকল্পনা করে রাতেই সিলেট থেকে চট্টগ্রামমুখী ট্রেনের টিকিট কাটলাম। পরদিন সকাল সোয়া ১০টায় সিলেট রেলস্টেশন থেকে বান্দরবানের উদ্দেশে আমাদের যাত্রা শুরু। সঙ্গী আরিয়ান ও আকাশ।

সারা দিন ট্রেন ভ্রমণের পর সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম পৌঁছলাম। সারা দিন ধকল গেছে। আকাশ চলে গেল তার বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া বন্ধুর বাসায়। আমি আর আরিয়ান স্থানীয় একটি হোটেলে উঠলাম। রেলস্টেশনের আশেপাশে নানা দরের হোটেল রয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ নিলাম ১২০০ টাকায়। রাতের খাবার খেয়ে সেদিনের মতো শুয়ে পড়ি।

পরদিন ভোর পৌনে ৬টায় আমরা তিনজন রেলস্টেশনের পার্শ্ববর্তী নিউমার্কেট থেকে ২ নম্বর বাসে চড়ে বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল চলে যাই। ভাড়া জনপ্রতি আট টাকা। বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালে গিয়ে বান্দরবানের উদ্দেশে বাসের তিনটি টিকিট কিনি। এ রুটের পূরবী ও পূর্বাণী ভালো মানের দুটি বাস। বান্দরবান যেতে এসব পরিবহনের বাসই যথেষ্ট। ভাড়া ১১০ টাকা।

যাত্রাপথে আঁকাবাঁকা রাস্তা দেখে কিছুটা ভয় পেয়েছিলাম। কারণ তিনজনেরই প্রথম বান্দরবান ভ্রমণ এটি। রাস্তাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হলেও পরিষ্কার, যা আমাদের মুগ্ধ করেছে। তেমন কোনো যানজট না থাকায় আমরা আড়াই ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম বান্দরবানে।

বান্দরবান পৌঁছে প্রথমেই সকালের নাস্তা সেরে নিই। এরপর ঘুরে বেড়ানোর পালা। আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল স্বর্ণমন্দির। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় চড়ে পৌঁছে গেলাম স্বর্ণমন্দিরে। পাঠকের জেনে রাখা ভালো, এই মন্দিরের প্রকৃত নাম বুদ্ধধাতু জাদি। লোকমুখে হয়েছে স্বর্ণমন্দির। এটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উল্লেখযোগ্য উপাসনালয়। মিয়ানমার, চীন ও থাইল্যান্ডের বৌদ্ধমন্দিরগুলোর আদলে তৈরি উপাসনালয়টি বান্দরবান শহর থেকে চার কিলোমিটার উত্তরে বালাঘাটের পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত। অনেকগুলো সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে হয়। জুতা নিচে রেখে খালি পায়ে স্বর্ণমন্দিরে প্রবেশ করতে হয়।

স্বর্ণমন্দিরে প্রবেশের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে। ধূমপান, উচ্চশব্দে কথা বলা ও ভিডিও ধারণ এখানে সম্পূর্ণ নিষেধ। জাদির রেলিং, দেয়াল ও বুদ্ধের আসনে বসা যাবে না। বুদ্ধমূর্তির অনুকরণে ছবি তোলা ও স্পর্শ করা নিষেধ। এছাড়া অনুষ্ঠান চলাকালে কেউ প্রবেশ করতে পারে না। আমরা সব নিয়ম-কানুন মেনে উপাসনালয়টি পর্যবেক্ষণ করেছি। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও চোখে পড়ার মতো। মন্দিরের আশেপাশে সব সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করেন। সোনালি রঙের মন্দিরটিতে প্রবেশের জন্য জনপ্রতি ৩০ টাকা করে কুপন নিতে হয়। ঘণ্টা দুয়েক অবস্থান করে আমরা ফিরে এলাম বান্দরবান শহরে।

হোটেল হিলভিউ আগ থেকেই বুকিং করা ছিল। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। পরবর্তী গন্তব্য ছিল নীলাচল। শহর থেকে সিএনজি অটোরিকশা ও চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ করে নীলাচল আসা-যাওয়া করা যায়। আমরা মানুষ কম হওয়ায় ৪০০ টাকা দিয়ে সিএনজি অটো রিজার্ভ করে নীলাচলে যাই। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা। সমতল ভূমি থেকে পাহাড়ের দিকে সিএনজি অটো যখন উঠছিল, তখন সবাই ভয় পেয়েছিলাম। এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি কাজ করেছে তখন। নীলাচল বাংলাদেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। এর পর্যটন কমপ্লেক্সটি বান্দরবান থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে টাইগারপাড়ার পাহাড়চূড়ায়। নীলাচলকে ‘বাংলার দার্জিলিং’ও বলা হয়ে থাকে। নোটিস বোর্ড থেকে জানা যায়, ২০০৬ সালের ১ জানুয়ারি প্রকল্পটি উদ্বোধন করা হয়। প্রকল্পটিতে রয়েছে ‘শুভ্রনীলা’, ‘ঝুলন্ত নীলা’, ‘নীহারিকা’ ও ‘ভ্যালেন্টাইন পয়েন্ট।’ এখানে রয়েছে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় বিশ্রামাগার। পাহাড়ের ঢালে সাজানো হয়েছে জায়গাগুলো। ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে সামনের পাহাড়ের দৃশ্যও ভিন্নরকম। একটি থেকে আরেকটি একেবারেই আলাদা, স্বতন্ত্র।

নীলাচল থেকে বান্দরবান শহর একনজরে দেখা যায়। মেঘমুক্ত আকাশে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের অপূর্ব দৃশ্য এখান থেকে উপভোগ করা যায়। এখানকার বাড়তি আকর্ষণ হলো নীল রঙের রিসোর্ট নাম ‘নীলাচল স্কেপ রিসোর্ট’। সাধারণ পর্যটকরা এ জায়গায় সূর্যাস্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়াতে পারেন। আমাদের লক্ষ্যই ছিল এ দুটি স্পট। সময়স্বল্পতার কারণে আর বেশি জায়গায় যেতে পারিনি। সম্প্রীতির বান্দরবানের ডায়েরি স্মৃতির পাতায় আমাদের কাছে অমলিন হয়ে থাকবে।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সরাসরি বান্দরবান যেতে বেছে নিতে পারেন ডলফিন, এস আলম, সৌদিয়া, বিআরটিসি, সেন্ট মার্টিন ব্লু, ইউনিক, শ্যামলী পরিবহনের যে কোনো একটি বাস। এসব পরিবহনের ভাড়া জনপ্রতি ৮৫০ থেকে ৯০০ (এসি) টাকা। নন-এসির ভাড়া ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে টাইগারপাড়া।

 

আজহার উদ্দিন শিমুল