বাণিজ্য সংবাদ

সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চল ঘিরে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, মিরসরাই ও ফেনীতে হচ্ছে দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক শিল্পাঞ্চল বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) উদ্যোগে পুরোদ্যমে চলছে অর্থনেতিক অঞ্চল নির্মাণের কাজ। পাশাপাশি শিল্প-বাণিজ্যের সক্ষমতা বাড়ানোর সহায়ক ক্ষেত্রগুলোর উন্নয়নে চলছে একাধিক প্রকল্প। এসব কার্যক্রমে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বড় বড় শিল্পগ্রুপসহ বিদেশি বিনিয়োগ আসছে। এতে অনেকগুলো শিল্প-কারখানা উৎপাদনে আসবে। ফলে গতি বাড়বে আমদানি ও রফতানির। এর জন্য প্রয়োজন হবে সীতাকুণ্ড এলাকায় নতুন নতুন পোর্ট, টার্মিনাল বা জেটির। আর এসব অবকাঠামো নির্মাণে আগ্রহী চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। যদিও কর্তৃপক্ষ বলছে এর জন্য সময় লাগবে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ সূত্র মতে, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই উপজেলা এবং ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার একর জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল ‘বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর’। সাম্প্রতিক সময়ে ১০টি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৪০০ একর জমি বরাদ্দের অনুমোদন পাওয়া গেছে। বিনিয়োগকারীরা এককালীন মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে জমির ইজারা নেবে। এতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৯৮ কোটি ১০ লাখ ৫৮ হাজার ডলার।
বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি, সামিট অ্যালায়েন্স লজিস্টিক পার্ল লিমিটেড (এসএএলপিএল), মাহিন ডিজাইন এটিকেট (বিডি) লিমিটেড, আরেফিন এন্টারপ্রাইজ, সানজি টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, হেলথ কেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ইওন মেটাল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেড ও বার্জার পেইন্টস (বিডি) লিমিটেড। এর মধ্যে বার্জার পেইন্টস (বিডি) লিমিটেডের জন্য ৩০ একর, এসএএলপিএলের জন্য ১০০ একর ও বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেডের জন্য ১০০ একর জমি বরাদ্দের অনুমোদন পাওয়া গেছে।
বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ কনটেইনার ম্যানুফ্যাকচারিং, কনটেইনার ডিপো স্থাপন, টেক্সটাইল, ওষুধ, স্টিল পার্ক, ভোজ্যতেল ও খাদ্য উৎপাদনের কারখানা প্রতিষ্ঠা করবে। কারখানাগুলোয় প্রাথমিকভাবে ১৬ হাজার ৯০৬ জনের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ শিল্পনগরে প্রায় এক হাজার ১৫০ একর জমির ওপর অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষকে (বেপজা) জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বিজিএমইএকে একটি পরিকল্পিত গার্মেন্ট পার্ক নির্মাণের জন্য ৫০০ একর জমি বরাদ্দের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে জাপানের নিপ্পন স্টিল ও সুজিত করপোরেশন, ভারতের এশিয়ান পেইন্টস, যুক্তরাজ্যের বার্জার পেইন্টস, চীনের জিনদুন গ্রুপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় এক হাজার ৭৫০ কোটি ডলার সমমূল্যের বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে।
কনটেইনার ডিপো পরিচালনাকারী একটি প্রতিষ্ঠানের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বর্তমানে দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল সীতাকুণ্ড। এ অঞ্চলের আছে ইস্পাত, সিমেন্ট, টেক্সটাইলসহ উৎপাদন খাতের বড়-ছোট মিলে তিন শতাধিক শিল্প-প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে বছরের পাঁচ-ছয় লাখ কনটেইনার পণ্য পরিবহন হয়ে থাকে। এছাড়া চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই উপজেলা এবং ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার একর জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক শিল্পাঞ্চল বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর। এ শিল্পাঞ্চল পুরোদ্যমে চালু হলে ১০-১২ লাখ টন কনটেইনারে পণ্য পরিবহন হতে পারে। এসব হিসেবে বলে বিদ্যমান চট্টগ্রাম বন্দরের সুবিধা দিয়ে বিপুল পরিমাণে কনটেইনার সমাল দেওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া সময় ও অর্থ অপচয়ের সম্ভাবনা তো আছে।
এ বিষয়ে জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল শেয়ার বিজকে বলেন, খুব দ্রুত সময়ে আমাদের নতুন সম্প্রসারিত ইস্পাত প্রকল্প বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে আসবে। আর এ প্রকল্পের প্রতি মাসে এক লাখ টন কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। এছাড়া আমাদের উৎপাদিত পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে নদীপথে পাঠানো গেলে সড়কপথের চেয়ে খরচ কমবে অর্ধেকেরও বেশি। সুতরাং সীতাকুণ্ডে একটি পোর্ট কিংবা টার্মিনালের খুব প্রয়োজনীয়তা আছে। এতে আমাদের সময় ও খরচ উভয় কমবে। এতে উৎপাদন খরচও কমবে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল জুলফিকার আজিজ বলেন, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বৈদেশিক বাণিজ্যেও সিংহভাব সামাল দিচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে, নতুন ধরনের পণ্য খালাসের সুবিধা প্রদান করতে, আর পণ্য ওঠানামার সময় কমিয়ে সেবার দক্ষতা বৃদ্ধিতে চট্টগ্রাম বন্দর আগের চেয়ে অনেক কর্মক্ষম এবং আগামীর বন্দর হতে যাচ্ছে আরও আকর্ষণীয়, আরও সমৃদ্ধ এবং আরও কার্যকর।
তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর ও আশেপাশের আমদানি-রফতানি সামাল দেওয়ার জন্য সীতাকুণ্ডে একটি নতুন পোর্টে নির্মাণের পরিকল্পনা আমাদের আছে। তবে সময় লাগবে। প্রয়োজন অনুসারে গড়ে উঠবে। এর আগে পাঁচ জেটি নির্মাণ করা হবে। যা শিল্পে সহায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।

সর্বশেষ..