প্রথম পাতা

সুইফট সরঞ্জাম আমদানিতে বিপাকে বাংলাদেশ ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ই-টিআইএন ও ভ্যাট নিবন্ধনের (বিআইএন) প্রয়োজন নেই। আবার ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়া কাস্টমস থেকে আমদানি করা পণ্য খালাসের নিয়ম নেই। এমন পরিস্থিতিতে অর্থ লেনদেনে বার্তা আদান-প্রদানকারী আন্তর্জাতিক পদ্ধতি সুইফটের সরঞ্জাম আমদানিতে বিপাকে পড়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সুইফট সিস্টেমের নতুন সংস্করণে ব্যবহৃত পণ্য ছাড় করাতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা সম্প্রতি এমন জটিলতার সম্মুখীন হন। সুইফট রি-বিল্ডিংয়ের কাজে আরও পণ্য আমদানি করতে হবে। সে ক্ষেত্রেও নতুন করে জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে চিঠি চালাচালি চলছে।
সম্প্রতি পণ্য খালাস নিয়ে জটিলতা দেখা দেওয়ায় ভবিষ্যতে যাতে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়, সে জন্য অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন নিতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধনের জন্য কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন বাধ্যতামূলক। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ ধরনের নিবন্ধন প্রয়োজন পড়ে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনেও টিআইএন নেওয়ার বিধান নেই। তাই টিআইএন ছাড়াই কীভাবে ভ্যাট নিবন্ধন নেওয়া যায়, সে বিষয়ে জানতে সম্প্রতি এনবিআরে চিঠি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মাসুম কামাল ভূঁইয়া এনবিআর চেয়ারম্যানকে এ চিঠি দেন।
সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে থাকা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি হয়। অর্থ স্থানান্তরের বার্তা আদান-প্রদানকারী আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সেবাদাতা সংস্থা সুইফট (সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টার ব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন) কোড ব্যবহার করেই এ অর্থ চুরি হয়। এরপর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট সিস্টেমের নিরাপত্তা বৃদ্ধি ও সুইফটের নতুন সংস্করণ ব্যবহার করার জন্য কিছু পণ্য আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়, সুইফটের নতুন সংস্করণে আবশ্যিকভাবে সন্নিবেশ করার জন্য সুইফট ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর ও ২০ ডিসেম্বর ইউপিএস এয়ারওয়ে’র মাধ্যমে টোকেন এবং সুইফট অ্যালায়েন্স কানেক্ট (বিপিএন বক্স) পাঠায়। এসব পণ্য ছাড় করাতে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভ্যাট নিবন্ধন সনদ চায় ঢাকা কাস্টমস হাউজ। কিন্তু ভ্যাট নিবন্ধন না থাকায় জটিলতায় পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংক। কয়েক দফা চেষ্টা করার পরও ছাড় করানো যায়নি। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা এনবিআরকে চিঠি দেয়। এছাড়া কর্মকর্তারা এনবিআরে সশরীরে হাজির হলে শর্ত সাপেক্ষে অনুমতি দেয়। কিন্তু ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়া ভবিষ্যতে ক্যাজুয়াল এন্ট্রির মাধ্যমে পণ্য ছাড় করানো যাবে বলে মৌখিকভাবে জানিয়ে দেয় কাস্টমস। বাংলাদেশ ব্যাংকের নামে ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন নম্বর (বিআইএন) গ্রহণের লিখিতভাবে পরামর্শ দেওয়া হয়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ২০১৬ সালে সুইফট হ্যাকিংয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট রি-বিল্ডিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর আওতায় শিগগিরই টোকেন, বিপিএন বক্সের মতো অন্যান্য আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি সুইফট কর্তৃক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রেরণের সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যান্য বিভাগও প্রায়ই কাস্টমস থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নামে আমদানি করা পণ্য ছাড়ে জটিলতার সম্মুখীন হয়ে থাকে। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন (ই-বিআইএন) নিতে চাই। কিন্তু অনলাইন ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন আবেদন সিস্টেম হতে দেখা যায় যে, আবেদনপত্র পূরণে টিআইএন বাধ্যতামূলক।
কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর ৭৫ ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংককে আয়কর, ব্যবসায়িক আয়ের ওপর কর, সুপার ট্যাক্স থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সেজন্য ব্যাংকটি কখনও টিআইএন নিবন্ধন নেয়নি। টিআইএন গ্রহণ করলে প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক টিআইএন গ্রহণ করে রিটার্ন দাখিল করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসএপি সফটওয়্যারে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে; যা অত্যন্ত জটিল, সময় ও ব্যয় সাপেক্ষ। সেজন্য টিআইএন গ্রহণ ছাড়া ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন নম্বর (বিআইএন) দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। এর মাধ্যমে সুফইট রি-বিল্ডিংয়ের জন্য ভবিষ্যতে সুইফট কর্তৃক প্রেরিত পণ্য দ্রুত ছাড়করণে সহায়তার অনুরোধ জানানো হয়।
চিঠির সত্যতা নিশ্চিত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মাসুম কামাল ভূঁইয়া শেয়ার বিজকে বলেন, ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন না থাকায় কিছু জিনিস আমদানির ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আমরা চিঠি দিয়েছি। দেখা যাক এনবিআর কী সিদ্ধান্ত নেয়।
এ বিষয়ে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, দূতাবাস, সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ যেসব প্রতিষ্ঠানের টিআইএন গ্রহণ বাধ্যতামূলক নয় তাদের টিআইএন ছাড়াও অনলাইনে বিআইএন রেজিস্ট্রেশন করা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআইএন রেজিস্ট্রেশনের জন্য টিআইএন লাগবে না। টিআইএন’র মতোই ম্যানুয়ালি পদ্ধতিতে এনবিআর একটি আইডি (পিন) তৈরি করে দেবে। ওই আইডিতে ইউজার আইডি, পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করে করতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ আইডি নম্বর দিয়ে অনলাইনে বিআইএন’র জন্য আবেদন করলে বাংলাদেশ ব্যাংক বিআইএন রেজিস্ট্রেশন পেয়ে যাবে।

সর্বশেষ..