সুখবর ও খারাপ খবরে যেমন গেল অর্থবছরটি

ড. আর এম দেবনাথ: মাত্র সপ্তাহখানেক হয়েছে পুরোনো অর্থবছর ২০১৭-১৮ শেষ হয়েছে। নতুন অর্থবছর ২০১৮-১৯ শুরু হয়েছে গত পয়লা জুলাই। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় পুরোনো বছরের একটা হিসাব দিয়েছেন। সেই হিসাব কার্যত ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ের, বাকি তিন মাসের হিসাব তিনি দিয়েছেন প্রাক্কলন হিসেবে। কারণ বাজেট পেশের সময় (জুন পর্যন্ত) এ-সংক্রান্ত তথ্য তার হাতে ছিল না। এরই মধ্যে অবশ্য প্রায় সব হিসাবই পাওয়া যাচ্ছে এবং তা প্রতিদিনই খবরের কাগজে ছাপা হচ্ছে। এ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রকৃত অবস্থা কী ছিল, তা অনুমান করা যাচ্ছে। কোন কোন বিষয় থেকে অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বোঝা যায়? এর মধ্যে অনেক কিছুই পড়ে। তবে মোটামুটি কয়েকটি বিষয় ধরে নিয়ে আলোচনা করা যায়। যেমন: আমদানি, রফতানি, রেমিট্যান্স, মূল্যস্ফীতি, আমানত ও ঋণের প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক ঋণ, রাজস্ব বৃদ্ধি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, বাণিজ্য ঘাটতি ও ব্যালান্স অব পেমেন্ট প্রভৃতি। এসব বাদে যে জিনিসটি মানুষকে আলোড়িত করে, তা হচ্ছে বাজার পরিস্থিতি ও চালের বাজার। যদি চালের বাজার দিয়েই শুরু করি, তাহলে দেখা যাবে বাজারটি সারা বছর, বিশেষ করে শেষের দিকে অস্থিতিশীল ছিল। প্রচুর বোরো উৎপাদন, পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত, উল্লেখ্যযোগ্য পরিমাণ আমদানি এবং খাদ্যশস্য আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা প্রভৃতি সত্ত্বেও চালের কারবারিরা মানুষকে এতটুকু স্বস্তি দেয়নি। চালের দাম বৃদ্ধির দিকে ছিল; এখনও তা-ই। এর সঙ্গেই জড়িত হচ্ছে মূল্যস্ফীতি (ইনফ্লেশন)। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে বলা হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক একে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। শত হোক, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার আইনি দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হারে। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা বেড়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ হারে। বাজারে কোনো জিনিসের দাম পড়ন্ত নয়। অথচ চালের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে পড়ন্ত। ভারত, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশে পড়ন্ত। অথচ আমাদের বাজার চড়া। গেল ঈদ উপলক্ষে ‘দেশপ্রেমিক’ ব্যবসায়ীরা যে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়েছেন, তার পর থেকে তারা আর পিছু হটেননি। মূল্যস্ফীতি ও চালের দাম দিয়ে সাধারণ মানুষ অর্থনীতির বিচার করে বলেই প্রথমে এ মন্তব্যটুকু করে নিলাম।
২০১৭-১৮ অর্থবছরের ‘পোস্টমর্টেম’ করতে গেলে দেখা যায় আমাদের আমদানি, রফতানি ও রেমিট্যান্স ব্যবসা এ বছরে ভালো ছিল। রেমিট্যান্স প্রায় তিন বছর পর এবারই বেশ একটু বেড়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পেয়েছে ১৭ শতাংশের বেশি। এ খবর আমাদের জন্য ভালো। এর ওপর নির্ভরশীল প্রায় এক কোটি গ্রামীণ পরিবার। আমাদের প্রায় এক কোটি কৃষকপুত্র-পুত্রী বিদেশে টাকা পাচার না করে নিয়মিত তাদের রোজগারের টাকা দেশে পাঠায়, যা দারিদ্র্য বিমোচন ও গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙাকরণে কাজে লাগে। এর মধ্যে ২০১৬-১৭, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স হ্রাস পাচ্ছিল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা ১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন (শত কোটি) ডলারে উন্নীত হয়েছে। রেমিট্যান্সের পাশাপাশি রফতানিও বেড়েছে। তবে টার্গেট অনুযায়ী কম বেড়েছে। কিন্তু গেল বছরের তুলনায় বেড়েছে। বাড়ার হার ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। অথচ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রফতানি বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল মাত্র এক দশমিক ৭৫ শতাংশ। এখন মোট রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার। বলা বাহুল্য, এর নায়ক যথারীতি ‘গার্মেন্টস’। কিন্তু কথা আছে। গার্মেন্টস রপ্তানির জন্য প্রচুর পণ্য আমদানি করতে হয়। দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমদানি বেড়েছে অসম্ভব হারে। এটা এখন আন্তর্জাতিক খবর। বিশ্বে ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি আমদানি ঋণপত্র খুলেছে বাংলাদেশ। আর সবচেয়ে বেশি রপ্তানি ঋণপত্র পেয়েছে চীন। বাংলাদেশের আমদানি ২০১৭ সালে বেড়েছে ১৬ শতাংশ। এ বছরে আমাদের মোট আমদানির পরিমাণ ছিল চার হাজার ৭৭৮ কোটি ডলার। বলা বাহুল্য, এর মধ্যে গার্মেন্টেসের জন্য আমদানিকৃত পণ্যের পরিমাণ বিশাল। এছাড়া রয়েছে নানা পণ্য। এমন অভিযোগও আছে, নির্বাচনের বছরে আমদানির নামে একশ্রেণির ব্যবসায়ী বিদেশে টাকা পাচার করছেন বেশি বেশি। এটা আমাদের অর্থনীতির বড় দুর্বল দিক। দেশের ধনীরা, বলা যায় এক শতাংশ লোক দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। দেশ যতই উন্নতি করছে, উন্নয়নের ফসল কিছুসংখ্যক লোক পাচ্ছে; তারা অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশে ছেলেমেয়েসহ চলে যাচ্ছে। এসব নিয়ে সারা বিশ্বই এখন চিন্তিত। উন্নয়ন হলো, অথচ ধনীরা দেশত্যাগ করল টাকাপয়সা নিয়ে; তাহলে এটা কিসের উন্নয়নÑএ প্রশ্ন আজ চীন, ভারত প্রভৃতি দেশেও। এখানেই লুকায়িত আমদানির মাধ্যমে অর্থ পাচারের ঘটনা। বেশি আমদানি ও কম রপ্তানির ফলে দুটো সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে। প্রথমত ডলারের দাম হইহই করে বেড়েছে। ডলারের চাহিদা বেশি, সরবরাহ কম। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরবরাহ করেও বাজার সামাল দিতে পারছে না। রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। আমদানির চাপে রির্জাভ স্থবির। আরেকটু ধাক্কা লাগলে সমস্যা হবে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি আবার মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তার লক্ষণ দেখেছি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ লক্ষণ আরও বেশি পাওয়া যাবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এদিকে বাণিজ্য ঘাটতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে; ব্যালান্স অব পেমেন্ট ঘাটতি অনেক বছর পর বাংলাদেশকে দেখতে হচ্ছে। এসব খারাপ খবর। সরকার বড় বড় ঋণপত্র খুলেছে অবকাঠামো তৈরির পণ্যসামগ্রীর জন্য। অবস্থা এমন যে, ওইসব ঋণপত্রের ওপর প্রযোজ্য ‘কমিশন’ পর্যন্ত সরকারি ব্যাংকগুলোকে দেওয়া হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক জানান দিচ্ছে। এদিকে দিনে দিনে আমাদের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। সরকার বলছে, এ মুহূর্তে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৩১ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১৪ শতাংশ। পাইপলাইনের ৩৫ বিলিয়ন ডলার ধীরে ধীরে ছাড়া পেলে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ হবে জিডিপির ৩০ শতাংশ। এছাড়া ব্যবসায়ীরা সমানে বিদেশ থেকে ডলারে ঋণ নিচ্ছে স্বল্পমেয়াদি। শুনেছি, তাও ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি এখনই। সব মিলিয়ে কী দাঁড়াবে, তার হিসাব আগামী দিনে করতে হবে। কোন দেশ কত ঋণ দিচ্ছে, কোন দেশ কত বিনিয়োগ করছে; তার হিসাবও দরকার হবে।
প্রধানমন্ত্রী তাই বলেছেন, আমাদের ঋণের দরকার নেই; দরকার বিনিয়োগের। এ কথাটি এখন থেকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। মালয়েশিয়ায় ঋণের পরিমাণের সাম্প্রতিক উদাহরণ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। এদিকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ঘটেছে আরেক কাণ্ড। আর সেটা সবারই জানা। কারণ এর জের এখনও চলছে। আমি বলছি ব্যাংক খাতের ঘটনার কথা। গেল অর্থবছরে ব্যাংক খাতে ঘটেছে ‘ডিপোজিট-লোন’ মিসম্যাচ। এর অর্থ কী? নিয়ম হচ্ছে, যত টাকা আমানত (ডিপোজিট) থাকবে, তার থেকে একটা অংশ হাতে রেখে বাকি টাকা ঋণ হিসেবে দেবে ব্যাংক। এর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধান আছে; এর ওপরে ঋণ দেওয়া যায় না। অথচ ২০১৭-১৮ অর্থবছরের পুরো সময় ধরে কিছুসংখ্যক ব্যাংক মাত্রাতিরিক্ত হারে ঋণ দিয়েছে। একে বলে ‘অ্যাগ্রেসিভ লেন্ডিং’। দিয়ে তারা ফেঁসে যায়। আমানত নেই, অথচ ঋণ দিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক খাতে আমানত বৃদ্ধি পাচ্ছে মোটামুটি ১০-১২ শতাংশ হারে। অথচ কোনো কোনো ব্যাংক ঋণ বাড়াচ্ছে ১৭, ১৮ এমনকি ১৯ শতাংশ হারে। কী বিপজ্জনক কথা! শেষ পর্যন্ত এ আগ্রাসী ব্যাংকিং পুরো ব্যাংক খাতকে বিপদে ফেলে। ‘লালবাতি’ জ্বালানোর মতো অবস্থা হয় একটি ব্যাংকে। সরকার দিশা না পেয়ে একের পর এক ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেয়, যা আবার দেশে বিরূপ সমালোচনার জš§ দেয়। এরই মধ্যে কথা তোলা হয়, লেন্ডিং রেইট ‘এক ডিজিট’-এ নামাতে হবে। এই নিয়ে লেগেছে আরেক ‘গণ্ডগোল’। কেউ তা মেনেছে, কেউ মানেনি। পয়লা জুলাই থেকে তা কার্যকর হওয়ার কথা। ফাঁকে ব্যাংকমালিকরা করেছেন কীÑআমানতের ওপর সুদের হার কমিয়ে দিয়েছেন। ত্রৈমাসিক আমানতের ওপর সুদের হার এখন সবাই দেবে ছয় শতাংশ। প্রতিযোগিতার বারোটা বাজিয়ে সংঘবদ্ধভাবে ব্যাংকাররা এটা করেছেন। আর তার রেফারি বাংলাদেশ ব্যাংক, যেটি সর্বদা প্রতিযোগিতার কথা বলে। দৃশ্যত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলতে আর কিছু থাকছে না। এটা ব্যাংকিং ডিভিশন-অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটা লেজুড়ে পরিণত হয়েছে, যার পরিণতি হবে মারাত্মক। এসবই ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ঘটনা। এসব ঘটনার বড় শিকার হয়েছে সঞ্চয়কারীরা। এরা সাধারণ মানুষ, অবসরপ্রাপ্ত লোকজন, বেওয়া-বিধবা, সাধারণ চাকরিজীবী, রেমিট্যান্স প্রাপক, মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণির লোক। এক হুকুমে তাদের সুদ-আয় কমে হয়েছে ১১-১২ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ। অথচ বাজারের অবস্থা কী? আমি মনে করি, বর্তমান অবস্থা সঞ্চয়ের বাজারকে ভীষণভাবে নষ্ট করবে। আর যদি কেউ কেউ বাঁচার আশায় তাদের টাকা নিয়ে শেয়ারবাজারে যায়, তাহলে এর পরিণতি কী হবে; তা বলা বড়ই মুশকিল। এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তার টার্গেট পূরণ করতে পারেনি বলে জানানো হয়েছে। মূল টার্গেটের পরিবর্তন হয় একবার। পরিবর্তিত টার্গেটও অর্জিত হয়নি। বেশ বড় অঙ্ক। এর অর্থ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশামতো হয়নি। হবেই বা কী করে? টার্গেট চাপিয়ে দিলে এমনই হবে। রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা কি নিজের ঘর থেকে রাজস্ব জোগাড় করে সরকারকে দেবে? অর্থনীতির একটা ক্ষমতা আছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি, মানুষের আয় প্রভৃতি মোতাবেকই রাজস্ব আসবে। এর বাইরে কোত্থেকে আসবে? অথচ এসব অবাস্তব জিনিসই বরাবর হয়ে আসছে। তবে এর মধ্যে একটা ভালো খবর দেখলাম বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) সম্পর্কে। এটি বাস্তবায়নের হার বেড়েছে। মুশকিল হচ্ছে, এর গুণগত মান কীÑএ সম্পর্কে প্রশ্ন থেকেই যায়। দশ মাসে খরচ হয় ৪০ শতাংশ, ৫০ শতাংশ। আর বাকি দুই মাসে ৫০ শতাংশ! এর অর্থ বোঝা দায়। দায় বলেই খরচের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে ভালো-মন্দ মিলিয়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছর চলে গেছে।

অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক