সুদহারের ছয়-নয়ে ছোট গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা

মাহবুবুল আলম: বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুদহার ওঠানামা করবে এটাই অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম। এতে সাধারণত লাগাম টানা হয় না। বাংলাদেশে কৃষিঋণে ৯ শতাংশ সুদহার নির্ধারণ করে দেওয়া ছাড়া বাকি সব খাতে সুদহার বাজারের চাহিদার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়ে থাকে। তবে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাজার চাহিদার বেশি সুদারোপ করলে সেক্ষেত্রে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার প্রশ্নে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক হস্তক্ষেপ করতে পারে। মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে সুদহার বেঁধে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিশ্বব্যাপী একই প্র্যাকটিস হলেও এবারে ভিন্ন উদাহরণ তৈরি করল বাংলাদেশ। বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জুনের শেষদিকে ব্যাংক মালিকরা সুদহার কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন। আমানতের সুদহার ছয় শতাংশ এবং ঋণের সুদহার ৯ শতাংশের বেশি নেওয়া হবে না এমন সিদ্ধান্ত ছিল তাদের। তবে সে নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে বেশিরভাগ ব্যাংকই নিজেদের মতো করে সুদ দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টি খুব একটা আমলে নিচ্ছে না; তবে কি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে আর্থিক খাত?
সুদহার নয়-ছয় ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারায় গেল ২ আগস্ট অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ব্যাংক মালিক ও এমডিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভাকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এবারই প্রথম আর্থিক খাতের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের বাইরে কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। প্রায় তিন ঘণ্টার ওই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। বৈঠক শেষে বের হয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, ৯ আগস্ট থেকে মালিকদের বেঁধে দেওয়া নতুন সুদহার বাস্তবায়ন হবে। যদি কেউ এরচেয়ে বেশি সুদ নেয় কিংবা দেয়, তাহলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
তবে মালিকদের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাস্তবায়ন করতে যাওয়া এই সুদহারে ফাঁক আছে। তারা বলছেন, নতুন সুদহার ক্রেডিট কার্ড ও কনজুমার লোনের (ভোক্তাঋণ) ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন হবে না। এ দুটি খাতে ব্যাংকগুলো চাহিদা অনুযায়ী তার মতো করে সুদহার বসাবে। অর্থাৎ নিম্ন-মধ্যবিত্ত, ছোট উদ্যোক্তা কিংবা আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মী যারা জানেন না, তাদের বেতন-ভাতা মাসের কত তারিখে পাবেন, তাদের সুদহার কমানোর সুবিধাবঞ্চিত করা হলো। এসব মানুষের ভরসা ছিল ক্রেডিট কার্ড ও কনজুমার লোন। এই ঋণ সুবিধা নিয়ে তারা ছোট ব্যবসা চালানো, সন্তানদের পড়ালেখার খরচ, এমনকি পরিবারের ভরণপোষণ থেকে শুরু করে বিয়ে কিংবা উচ্চশিক্ষার মতো স্বপ্ন পূরণ করে থাকেন। এ পর্যায়ের ৃঋণগ্রহীতারা নিয়মিত তাদের ক্রেডিট কার্ড কিংবা ভোক্তাঋণ পরিশোধ করে থাকেন। তাদের মধ্যে খেলাপের হার নগণ্য। অথচ তারাই সুদ কমানোর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। সুবিধা পাবেন ওই গোষ্ঠী, যারা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপি থাকার পরও ঋণ পুনর্গঠন (রিশিডিউলিং) কিংবা অবলোপন করে আবারও ঋণ নিয়ে থাকেন।
ঋণগ্রস্ততাকে অভিশাপ মনে করে ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা ঋণগ্রহীতারা তাদের ঋণ পরিশোধে সব সময় তৎপর থাকেন। অথচ ব্যাংকের কাছে তারা বাড়তি সুবিধা পাওয়া তো দূরে থাক, তাদেরই ভোগান্তি বেশি। ঋণ নিলে ব্যাংকগুলোর দেওয়া শর্তের জালে ইচ্ছেমতো সুদহার বসানোয় তারা নিয়মিত নাজেহাল হচ্ছেন। একজন ঋণগ্রহীতা হিসেবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সাড়ে ১০ শতাংশ সুদে চার লাখ ১০ হাজার টাকা ঋণ নিই। ঋণ হাতে পাওয়ার আগেই সার্ভিস চার্জের নামে কেটে রাখা হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা। প্রতি মাসে ইএমআই (সমহারে মাসিক কিস্তি) হিসেবে আট হাজার ৮৭২ করে কেটে নেওয়া হয়। পাঁচ মাস এভাবেই চলছিল। সম্প্রতি হঠাৎ বিনা নোটিসে ব্যাংকটির কাস্টমার কেয়ার থেকে এসএমএসে জানিয়ে দেওয়া হয় সুদ বাড়িয়ে সাড়ে ১২ শতাংশ করা হয়েছে এবং ইএমআই বাড়িয়ে ৯ হাজার ১৭৫ টাকা করে ২ জুলাই থেকে কার্যকরের কথা জানানো হয়। নতুন সুদহারের ফলে ঋণ পরিশোধ সময়সীমা পাঁচ বছরে বাড়তি ২০ হাজার টাকা কেটে নেবে ব্যাংকটি।
অথচ একই সময় ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) ঘোষণা অনুযায়ী পয়লা জুলাই থেকে ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ এবং আমানতের সুদহার ছয় শতাংশ বাস্তবায়নের কথা ছিল। সুদহার কমানো দূরে থাক, উল্টো বেড়ে গেল। বিষয়টি নিয়ে গ্রাহক হিসেবে ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা জানতে চাইলে সঠিক কোনো জবাব দিতে পারেনি। দিন ১৫ পর চিঠি দিয়ে সুদ কমানো নয়, বরং বাড়তি সুদ ও নতুন কিস্তির কথা জানানো হয়। সুদহার এক অঙ্কে চলে আসায় অনেক গ্রাহক আশাবাদী হয়েছিলেন; কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। জুনের শেষদিকে মালিকরা বসে যখন সুদহার কমানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখনই বলা উচিত ছিল ছোট গ্রাহকদের ক্ষেত্রে এটা বাস্তবায়ন করা যাবে না। গড়পড়তা একটা ঘোষণা দিয়ে মালিকরা বাজার যাচাই করেছেন। যখন দেখতে পেলেন এ ঘোষণায় ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তাঋণের চাহিদা বেড়ে গেছে, তখন তারা সরকারের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানালেন। কার্যত ছোট গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন ব্যাংক মালিকরা।
সুবিধা দেওয়া হয়েছে বড় গ্রাহকদের, যারা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েও খেলাপি হয়। বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহী করতে ঋণের সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, নির্বাচনের বছরে সাধারণত বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হওয়ায় ব্যক্তি বিনিয়োগ কমে যায়। তাহলে এ মুহূর্তে এই ঋণের সুবিধা দেওয়ার পেছনে উদ্দেশ্য কী? আমরা জানি, নির্বাচনের আগে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে যায়। তবে কী আবারও ঋণের নামে ব্যাংক থেকে টাকা বের করে নেওয়া হতে পারে? যদিও জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতি প্রকাশের অনুষ্ঠানে গভর্নর ফজলে কবির, আশ্বস্ত করেছেন, নির্বাচন সামনে রেখে টাকার অবাধ প্রবাহ থাকবে না। কড়া নজর রাখবে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এ বক্তব্যে কতটুকু আশ্বস্ত হওয়া যায়, যখন মালিকরা এক জোট হয়ে সরকারকে কার্যত চাপে ফেলে নিজেদের মতো করে সুদহার, সিআরআর (আমানতের বিপরীতে নগদ জমা) কিংবা ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) কমানো, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বেসরকারি ব্যাংকে রাখা আমানতের পরিমাণ ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে নেন।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংকঋণ ও আমানতের নয়-ছয় সুদহার বাস্তবায়ন করতে দিয়ে কার্যত আর্থিক খাতে এক ধরনের নয়-ছয় তথা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শুরু হবে। যেখানে ব্যাংকগুলো তারল্য বাড়াতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত নিয়ে আসতে উঠেপড়ে লেগেছে, সেখানে ছয় শতাংশ আমানতের সুদহার কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তা সময়ই বলে দেবে। ব্যাংকে সুদহার কমে যাওয়ায় এখন স্বাভাবিকভাবেই টাকা চলে যাবে সঞ্চয়পত্রে। এ খাতে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হওয়ায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি ইতোমধ্যেই কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে পুঁজিবাজারে আস্থা তৈরি না হওয়ায় সেখানেও সঞ্চয়কারীরা যেতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন। এই বাস্তবতায় নিম্ন-মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্তদের সঞ্চয়ের অর্থ ঘরে অলস পড়ে থাকা ছাড়া আর কোনো বিকল্প দেখছেন না বিশ্লেষকরা। এ ধরনের পরিস্থিতি আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য সহায়ক নয়। তাই পুরো বিষয়টি সরকারকে আবারও ভেবে দেখা প্রয়োজন বলে মনে হয়। শুধু তেলে মাথায় তেল না দিয়ে স্বল্প আয়ের মানুষের দিকে একটু নজর দেওয়া উচিত। এরাই সংখ্যায় বেশি, আর এদের ভোটেই গণতন্ত্র বিকশিত হয়ে থাকে।

গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]