সুফল মিলুক এখানেও

একটি গণতান্ত্রিক দেশে সময়মতো সাধারণ নির্বাচন হবে, সেটাই স্বাভাবিক। তাতে কোনো দল বিপুলভাবে জয়ী হতে পারে, তাও অবাক করার মতো বিষয় নয়। তা সত্ত্বেও মালয়েশিয়ায় গত ৯ মে যে নির্বাচন হয়ে গেল, তার ফল প্রকাশের পর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বগণমাধ্যম হয়েছিল ‘বিস্মিত’! সে ঢেউ বাংলাদেশেও না লেগে পারেনি। দেশটির নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর এখানকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষত ফেসবুক হয়ে ওঠে সরব। এক্ষেত্রে ফোকাস অবশ্য ছিল ৯২ বছর বয়সে মালয়েশিয়ার সাড়া জাগানো রাজনীতিক মাহাথির মোহাম্মদের বিজয়। তাকে আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকারও বলা হয়ে থাকে। বয়স নব্বই-ঊর্ধ্ব হলেও মালয়বাসী যে এখনও তাকে তীব্রভাবে শাসনক্ষমতায় দেখতে চায়Ñসাম্প্রতিক নির্বাচনের ফল তারই প্রমাণ। এর কারণ মোটেও ব্যাখ্যাতীত নয়; বরং মাহাথিরের শাসনামলেই মিলবে তার অত্যুঙ্গ জনপ্রিয়তার যুক্তি। তবে মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক নির্বাচনে একমাত্র প্রাপ্তি মাহাথিরের বিজয় নয়; তা হলে নেতৃস্থানীয় বিশ্বগণমাধ্যমে শিরোনাম হতো নাÑ‘বার্লিন দেয়াল ভাঙল কুয়ালালামপুরে’ কিংবা ‘শেক্সপিয়ারের নাটকের তুল্য নির্বাচন’। এখানে বরং দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কিছু ইস্যু ওতপ্রোতভাবে যুক্ত; যে কারণে মালয়েশিয়া তো বটেইÑতার শুভাকাক্সক্ষী অনেক দেশই এ নিয়ে উচ্ছ্বসিত। নির্বাচনে কোথাও আমলযোগ্য অনিয়ম হয়েছে, তেমনটি জানা নেই। সর্বোপরি মালয়েশিয়ার এমন নবযাত্রা সম্প্রতি স্বল্পোন্নত দেশের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসা বাংলাদেশের জন্যও সুখবর। এর প্রধান কারণ, দেশটি আমাদের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার; উভয় দেশের মধ্যে কারিগরি ও পারস্পরিক বিনিয়োগ সম্পর্ক বিদ্যমান এবং আমাদের জন্য অনুসরণীয় দেশের তালিকায় শুরুর দিকেই থাকবে মালয়েশিয়া। সেক্ষেত্রে খেয়াল করার বিষয়, গত কয়েক বছর ধরে আশানুরূপ নয় রেমিট্যান্স (প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ) অর্জনে আমাদের পারফরম্যান্স। তার কারণ ডলার কিংবা জ্বালানি তেলের দাম যতটা নাÑতার চেয়ে বেশি হলো বিদেশে শ্রমবাজারের সংকোচন। এক্ষেত্রে অনেকে কিছু অগ্রসর অর্থনীতিতে উদ্ভূত পরিস্থিতিকে দায়ী করে থাকেন। তবে আমাদের সবারই মনে থাকার কথা, ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দায়ও যথেষ্ট ভালো করেছিল আমাদের গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং ও জনশক্তি রফতানি খাত। বাস্তবতা হলো, একদিকে যেমন আমাদের জন্য উপযুক্ত নতুন শ্রমবাজার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে সংকুচিত হয়ে পড়ছে বিদ্যমানগুলো। এখানে মালয়েশিয়ার দৃষ্টান্ত মোটেই অপ্রাসঙ্গিক হবে না। এটি এশিয়ায় আমাদের বৃহত্তম শ্রমবাজার; যদিও নানা কারণে স্থানীয় শ্রমশক্তিকে আগের মতো আকর্ষণ করতে পারছে না দেশটি। সেজন্য আমাদের কিছু দায় যেমন রয়েছে; মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ নীতিও এজন্য কম দায়ী নয়। এমন পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের পর দেশটির নবযাত্রা আমাদের মনে আশার সঞ্চার করে বৈকি। এরই মধ্যে রাজস্ব ও করনীতিতে সংস্কারের ঘোষণা এসেছে নতুনভাবে দায়িত্ব গ্রহণকারী প্রধানমন্ত্রী মাহাথিরের পক্ষ থেকে। আমাদের প্রত্যাশা, বাণিজ্য ও উন্নয়নে সহযোগী এ দেশটি কর্তৃক গৃহীত সে নীতিগুলো যেন সুফল দেয় মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে ছুটে চলা বাংলাদেশকেও।