সুবিধা জোগানের সঙ্গে অর্থের সদ্ব্যবহারও নিশ্চিত হোক

আমাদের দেশে ছোট পরিবার দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ছেলে বা মেয়ে স্বাবলম্বী হলেই পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছেন। সামাজিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এর ফলস্বরূপ বৃদ্ধ হয়ে গেলে বাবা-মা অসহায় হয়ে পড়ছেন। এদিকে তাদের অনেকের উপার্জনের পথ না থাকায় বড় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। অনেকে নিজ পরিবার-পরিজন ছেড়ে বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতেও বাধ্য হচ্ছেন; রোগ-শোকে ভোগান্তিতে পড়ছেন। এ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনেক সাবেক সরকারি কর্মচারীও রয়েছেন। অবসরের পরপরই যারা পেনশন সুবিধার পুরোটা তুলে ফেলেছেন, তাদের অনেকেরই এখন উপার্জন না থাকায় শেষ বয়সে কষ্টে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। তবে এ জনগোষ্ঠীর দুর্দশা লাঘবে এগিয়ে এসেছে সরকার। যারা অবসরের পর পেনশনের পুরো টাকা তুলে নিয়েছেন, তারাও এখন থেকে মাসিক পেনশন সুবিধা পাবেন। তবে সরকারি কর্মচারীদের অব্যাহতভাবে সুবিধা বৃদ্ধির পরও জনগণ কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।
গত সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বলা হয়, মাসিক পেনশনের সঙ্গে প্রতিবছর পাঁচ শতাংশ ইনক্রিমেন্টও দেওয়া হবে। ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। এত দিন তারা মাসিক পেনশন সুবিধা না পেলেও অবশ্য দুটি উৎসব ভাতা, নববর্ষ ভাতা ও মাসিক চিকিৎসা ভাতা পাচ্ছিলেন। যেসব সরকারি কর্মচারী পেনশনের পুরো টাকা তুলে নিয়েছেন, অবসর থেকে ১৫ বছর পার হলে তারা আবার মাসিক পেনশন পাবেন এখন। তাদের আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই সরকার সিদ্ধান্তটি নিয়েছে। এজন্য ১৩৯ কোটি টাকা ব্যয় হবে বছরে। তাদের শেষ বয়সে ভালোভাবে জীবন যাপন করতে এ সিদ্ধান্ত ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশাবাদী।
সাম্প্রতিক সময়ে নিয়মিত সরকারি কর্মচারীদের জন্য অবশ্য কয়েক দফা সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। চাকরি স্থায়ী হওয়া সব কর্মচারী বাড়ি তৈরি বা ফ্ল্যাট কেনার জন্য ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারছেন। এজন্য তাদের মাত্র পাঁচ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। বাকি সুদ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে জোগানো হচ্ছে। এজন্য সরকারকে বছরে ভর্তুুকি দিতে হবে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। এছাড়া উপসচিব থেকে তারও উচ্চ পদের সরকারি কর্মচারীদের গাড়ি কেনায় এককালীন ৩০ লাখ টাকা করে ঋণ দিয়ে আসছে সরকার। এজন্য তাদের কোনো সুদ দিতে হচ্ছে না; বরং গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি খরচ ও চালকের বেতন বাবদ তাদের আরও ৫০ হাজার টাকা দিচ্ছে সরকার। এর আগে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। অর্থাৎ সম্ভাব্য সব সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের কিছু অতিরিক্ত সুবিধাও জোগানো হচ্ছে।
সরকারি কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধির কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ব্যয় হচ্ছে। এভাবে অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে জনগণকে প্রদত্ত সেবার মান আরও বাড়ার কথা ছিল। হতাশার বিষয় হলো, জনপ্রশাসন খাতে জনগণের অর্থ এভাবে ব্যয় হলেও কাক্সিক্ষত মানের সেবা তারা পাচ্ছেন না। বরং অনেক সরকারি দফতর ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়মে জর্জরিত। সেবা লাভের পরিবর্তে সেখানে গিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মানুষকে। এর অবসান হওয়া জরুরি। জনগণের অর্থ ব্যয়ে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা জরুরি। অনেকে বলছেন, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকারি কর্মচারীদের সুযোগ বাড়িয়েছে সরকার। সেটি ঘটলে তা কাম্য নয়। জনগণের অর্থ তাদের কল্যাণার্থেই ব্যয় করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারি কর্মচারীরা আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন বলে আমরা আশা করি। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ সদ্ব্যবহারে সরকারকেও আরও সতর্ক হতে হবে।