‘সুশাসননির্ভর ব্যাংকিং সামগ্রিক সুফল এনে দিতে পারে’

একেএম শহীদুল হক ‘ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। দুটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও একটি প্রথম সারির আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার কারণে তিনি ব্যাংকিং এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান অঙ্গনে একজন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। ২০১৬ সালে তিনি ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডে যোগদান করেন। সম্প্রতি শেয়ার বিজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্যাংক ও আর্থিক খাত নিয়ে বিভিন্ন খোলামেলা মতামত দেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তানিয়া আফরোজ

শেয়ার বিজ : ব্যাংকিং খাতে আপনার অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

একেএম শহীদুল হক: আমি ১৯৭৭ সালে রূপালী ব্যাংকে অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করি। সুদীর্ঘ প্রায় ৪০ বছরে ব্যাংকিং খাতের যে উৎকর্ষ ও পরিবর্তন, তা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। ম্যানুয়াল লেজারনির্ভর ব্যাংকিং থেকে শুরু করে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ে সবই নিজের হাতে করতে হয়েছে আমার চাকরিজীবনে। রূপালী ব্যাংকের পর ন্যাশনাল ব্যাংকে আট বছর কাজ করেছি। প্রাইম ব্যাংকের গোড়াপত্তন থেকে শুরু করে কাঠামোগত উন্নয়নে কাজ করেছি। তারপর মার্কেন্টাইল ব্যাংকে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করি। এ সময়টাতে আমার ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ বিকাশ লাভের সুযোগ পায়। ২০০৯ সালের শেষে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব লাভ করি। অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাংকটি একটি প্রথম সারির ব্যাংকে পরিণত হয়। ২০১৩ সালে নতুন প্রতিষ্ঠিত মিডল্যান্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করি। ব্যাংকটির ভিত্তি স্থাপন হয় আমার হাত ধরেই। একটি ব্যাংকের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা আমার কাছে ছিল খুবই এক্সাইটিং এবং চ্যালেঞ্জিং। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সূচনালগ্নেও আমি কাজ করেছি, কিন্তু মিডল্যান্ড ব্যাংক সম্পূর্ণ আমার নিজের হাতে গড়া। চেষ্টা করেছি সবরকম নিয়মনীতি পরিপালন করে ব্যাংকটিকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে।

ব্যাংক খাতের দীর্ঘ এ অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে আমার মূল্যায়ন হচ্ছে- বিশ্বের ব্যাংকিং খাত দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সুশাসন ও নৈতিকতানির্ভর ব্যাংকিং এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটা সময় ছিল শুধু ব্যবসা করতে পারলেই পারফরম্যান্স প্রকাশ পেতো। এখন এ দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন এসেছে। ব্যবসা করতে হবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নৈতিকতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। অসুস্থ প্রতিযোগিতা কখনোই ভালো ফলাফল নিয়ে আসে না। বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুশাসন ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়াটাই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

আমার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো এবং কার্যক্রমে নৈতিকতা বজায় রেখেছে এবং স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তারাই পরে সফলতার উচ্চ শিখরে উঠেছে।  একজন ব্যাংকারের ব্যক্তিগত সফলতার কথা যদি বলি, তাহলে বলবো যে, সততা, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও পরিশ্রম করার মানসিকতার মাধ্যমে পেশাদারিত্ব অর্জন করতে পারলে সফলতা আসবেই।

আমি যখন দেশের বাইরে ট্রেনিং অথবা সেমিনারে গিয়েছি, তখন সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টা লক্ষ্য করেছি, তা হলো- সে  দেশের ব্যাংকিং কালচার। যেসব দেশে ব্যাংকাররা কোনো অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামে না, বরং তারা টিকে আছে ডাইভারসিফাইড প্রডাক্ট ও সুপিরিয়র সার্ভিসের মাধ্যমে। সেখানকার ব্যাংকাররা উদ্ভাবনী ও সুদক্ষ হওয়ার সুবাদে ব্যাংকিং খাতে একটি মেধার লড়াই প্রত্যক্ষ করা যায়। এ লড়াই থেকে ব্যাংকিং খাতে নিত্য নতুন প্রডাক্ট ও আইডিয়া জেনারেট হয়। আমাদের ব্যাংকিং খাতকে এ বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। পরিবর্তনকে মাথায় রেখে সুশাসন নির্ভর ব্যাংকিং সিস্টেমই শুধু সামগ্রিক সুফল এনে দিতে পারে। সর্বোপরি আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় ইন্টারন্যাশনাল বেস্ট প্র্যাকটিসগুলো চালু করতে হবে।

 শেয়ার বিজ : ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডকে আরও এগিয়ে নিতে ব্যাংকের অভিজ্ঞতা কতটা সহায়ক হচ্ছে?

একেএম শহীদুল হক: দুই খাতের মধ্যে মিল-অমিল দুটোই আছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একই ধরনের গ্রাহক নিয়ে কাজ করে। দুই ক্ষেত্রেই গ্রাহকরা আমানত জমা করেন এবং ঋণ গ্রহণ করেন। তবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের বৈশিষ্ট্যগত ও আচরণগত কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড একটি শরিয়াহনির্ভর প্রতিষ্ঠান হওয়ায় গ্রাহকদের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য একটু বেশি। এখানে সাধারণত শরিয়াহনির্ভর গ্রাহকরাই বেশি আসেন। ব্যাংকগুলো বৃহৎ পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা করে। গ্রাহকরা সাধারণত প্রথমে ব্যাংকে যায়। পরে বাড়তি ঋণ বা অন্য কোনো কারণে ব্যাংক যদি অপারগ হয়, তখন তারা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আসেন। এ ছাড়া ব্যাংকের ব্রাঞ্চ নেটওয়ার্ক তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সেদিক থেকেও পিছিয়ে আছে। খুব অল্প পরিমাণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সরাসরি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা করে। তবে এ সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে।

দীর্ঘদিন ব্যাংকে কাজ করার কারণে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে আমার একটা পরিচিতি আছে, তা এখানে অনেকটাই কাজে লাগছে। করপোরেট গ্রাহকরা ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডকে এখন গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছেন। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির কাঠামো ও কৌশলগত পুনর্গঠনে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। অনেকাংশে সফলও হয়েছি। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার নির্দেশিত নিয়ম ও বিধি অনুযায়ী বিভিন্ন বিভাগ গঠনে উদ্যোগী হই। বলতে পারেন যে, নতুনভাবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ঋণ ব্যবস্থাপনা, ঋণ পুনরুদ্ধার (রিকোভারি) ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিপালনের মাধ্যমে ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডকে একটি প্রথম সারির আর্থিক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করার কার্যক্রম হাতে নিয়েছি।

অন্যদিকে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পেশাগত ও গুণগত মানোন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। তাদের প্রযুক্তিগত ও দক্ষতানির্ভর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো- তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ গ্রাহকসেবার মান নিশ্চিত করা। আমি আশাবাদী যে, অল্প সময়ের মধ্যে ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড একটি প্রথম সারির আর্থিক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে।

শেয়ার বিজ : দেশের চাকরির বাজারে আর্থিক খাত এখনও ততটা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেনি বাণিজ্য বিভাগের সেরা শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ ব্যাংকিং খাত ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক খাতের উন্নয়নে সেরাদের আকর্ষণ করাটা কতটা জরুরি? খাতে কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে কি যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে?

একেএম শহীদুল হক: একটি প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে এর মানবসম্পদ। বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বব্যাপী এখন মানবসম্পদ পরিচালনা ও উন্নয়নে অত্যন্ত জোরালো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। দক্ষ মানবসম্পদ যেমন একটি প্রতিষ্ঠানের মূলধন তেমনি অদক্ষ মানবসম্পদ প্রতিষ্ঠানের জন্য ঝুঁকি স্বরূপ। একজন কর্মীর একটি ছোট ভুল অনেক সময় পুরো প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে। তাই কর্মীদের গুণগত মানোন্নয়ন ও সুষ্ঠু প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কর্মী নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় এ বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে।

প্রথমত: যোগ্য কর্মীদের নিয়োগ দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত: তাদের নীতিগত ও আদর্শগত মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। একজন যোগ্য কর্মী আদর্শবিচ্যুত হলে সেটি একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রাণসংহারী, অন্যদিকে নীতিশীল ও আদর্শিক ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

ব্যাংকিং খাত সবসময়ই আকর্ষণীয় ছিল, এর জব সিকিউরিটি ও বেতনের কারণে। বর্তমানে এ অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। যোগ্য ও মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পছন্দের তালিকায় রাখছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব শিক্ষার্থীর প্রথম পছন্দ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। প্রথম সারির আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে ব্যাংকের মতোই আকর্ষণীয় শিক্ষার্থীদের কাছে।  ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ইতোমধ্যে মেধাবী ও দক্ষকর্মী নিয়োগ শুরু করেছে। এর ধারাবাহিকতায় আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়নে কাজ করছি। আমরা ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি ও প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে আকর্ষণীয় বেতনে কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছি। অভ্যন্তরীণ মানবসম্পদকে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য অভ্যন্তরীণ ও আউট-সোর্সড এক্সপার্ট লেভেল ট্রেইনার দ্বারা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। যাতে তাদের ভেতর নেতৃত্বদানের দক্ষতা তৈরি হয়। আমরা আমাদের নিয়োগ প্রক্রিয়াটিকে স্বচ্ছ ও অধিক কার্যকর করার জন্য ব্যাংকের নিয়োগ প্রক্রিয়ার  আদলেই আইবিএ অথবা বিআইবিএমকে দায়িত্ব দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছি।

তবে সেরাদের নিয়োগ দেওয়াটা যতটা জরুরি, তার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের যোগ্য করে গড়ে তোলা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নীতি, চরিত্র ও আদর্শগত বিচ্যুতির কোনো সুযোগ নেই। ব্যাংকারদের প্রশিক্ষণের জন্য বিআইবিএম একটি অসাধারণ প্লাটফর্ম। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের একটি প্লাটফর্ম তৈরি করে দেওয়াটা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। এ খাতে এটি একটি সীমাবদ্ধতা। এ ছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংকের মতো বড় পরিসরে চিন্তা করতে হবে।

আমি দেখেছি যে, অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠানেই অনেক শিক্ষিত, যোগ্য ও দক্ষ পরিচালক রয়েছেন, ব্যাংকিং ব্যবসায় তাদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অপরিসীম আমি অনেক ব্যাংকেও প্রত্যক্ষ করিনি। নিজ নিজ ব্যবসার ক্ষেত্রেও তারা অত্যন্ত সফল। আমি আশা করি যে তারা তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সঠিক নেতৃত্ব প্রদানের মাধ্যমে প্রফেশনাসলদের কাজে লাগিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারবে।

শেয়ার বিজ: ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের কি নির্দিষ্ট কোনোভিশনরয়েছে?

একেএম শহীদুল হক: একটি প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা নির্ভর করে তার মিশন ও ভিশনের ওপর। ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের একটি ব্যবসায়িক ভিশন আছে। আর তা হলো- আমরা নিজেদের শীর্ষ তিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একটি হিসেবে দেখতে চাই। এর পরিপ্রেক্ষিতে, আমরা গত বছর প্রাতিষ্ঠানিক রিফর্ম করেছি। শ্রেণিকৃত ঋণ আট শতাংশ থেকে চার শতাংশে নামিয়ে এনেছি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে ক্রেডিট লাইন নেওয়া আরম্ভ করেছি। প্রযুক্তিগত উন্নয়নে জোর দিচ্ছি এবং সেন্ট্রাল এমআইএস চালু করার কাজ হাতে নিয়েছি। এর ফলে গ্রাহক সেবা ও রেগুলেটরি রিকোয়ারমেন্টগুলোর সহজ উন্নয়ন ঘটবে আশা করি। এ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে আমি আমার পরিচালক মহোদয়ের সহযোগিতা ও সহায়তা পেয়েছি। এভাবে সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করলে লক্ষ্যে পৌঁছাতে ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের খুব বেশি সময় লাগবে না।

শেয়ার বিজ : বর্তমানে  কোন ধরনের ঋণ সেবায় আপনার প্রতিষ্ঠান বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে?

একেএম শহীদুল হক: ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড শিল্পায়নে অর্থায়ন করে থাকে সব  থেকে বেশি। এসএমই খাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থায়ন করা হয়েছে। রিটেইল সেবার মধ্যে বাড়ি বা ফ্ল্যাট ও গাড়িতে অর্থায়ন করা হয়। তবে যেভাবেই অর্থায়ন করা হোক না কেন, আমরা চেষ্টা করি আমাদের পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্টটি যেন ঠিকভাবে হয়। নির্দিষ্ট কোনো খাতে বিপর্যয় হলে যেন অন্য খাত থেকে তা পুষিয়ে নেওয়া যায় এবং প্রতিষ্ঠান যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এক্ষেত্রেও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

শেয়ার বিজ : ২০১৬ সালে ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের আর্থিক সফলতা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি সাফল্যের কারণ কী?

একেএম শহীদুল হক: ২০১৬ সালের সাফল্যের পেছনে দুটো বিষয় খুব বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। প্রথমটি: দলগত প্রয়াস ও দ্বিতীয়টি: সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। দলগত প্রচেষ্টা ছিল সর্বোচ্চ গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করা, শ্রেণিকৃত ঋণকে সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে নিয়ে আসা এবং ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা প্রত্যেকটি ডিপার্টমেন্ট ও ব্রাঞ্চ অফিসে। অন্যদিকে, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্ভব হয়েছে পরিচালকদের কার্যকরী দিক নির্দেশনা ও অভ্যন্তরীণ আন্তঃবিভাগীয় সহযোগিতার ফলস্বরূপ। সুষ্ঠু দিক নির্দেশনা থাকায় একটি কার্যকরি লিডারশিপ নির্ভর ব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানটিকে সফলতার দিকে ধাবিত করেছে। একটি প্রতিষ্ঠান যখন সামগ্রিকভাবে সাফল্যের দিকে ধাবমান হয়, গ্রাহকরা তখন স্বাভাবিকভাবেই আমানত ও বিনিয়োগের উৎসাহ পান। এক্ষেত্রে, প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটি মানুষের আত্মত্যাগ প্রশংসার দাবি রাখে।

শেয়ার বিজ : আমরা জানি, কয়েক বছর ধরে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ অনেক বেড়েছে আর্থিক খাতও এর বাইরে নেই আপনার মতে, থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?

একেএম শহীদুল হক: বর্তমানে ব্যাংকিং খাত অপেক্ষা আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম। খেলাপি সংস্কৃতি প্রতিহত করতে আমরা অনেক কথাই বলি-ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, করপোরেট সুশাসন ইত্যাদি। কিন্তু আমার মতে, আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে খুব মৌলিক একটা মূল্যবোধের অভাবেই এ সংস্কৃতি চালু হয়েছে-দেশপ্রেমের অভাব। যারা  ঋণখেলাপি হচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি অর্থশালী ব্যক্তি। এদের খেলাপি ঋণের ভার বহন করতে হয় সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে। নিজের দেশের মানুষের প্রতি দায়বোধের অভাব ভয়ানক একটি সামাজিক ব্যাধি। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে এখন সামাজিক আন্দেলন গড়ে তোলার সময় এসেছে। সেদিন ফেসবুকে একটি পোস্ট দেখে আনন্দ পেলাম। ঋণখেলাপিদের হজে যাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার দাবি তুলেছে পোস্টটিতে। যদিও এটি একটি ছোট উদাহরণ মাত্র, কিন্তু এটি ঠিক ঠিক অর্থ খাতের এ সমস্যাকে সামাজিক আন্দোলনে রূপদানের সময় এসেছে। সর্বোপরি মানুষের দেশপ্রেমকে জাগ্রত করতে হবে। আমি মনে করি যে, একজন দেশপ্রেমিক মানুষ কখনও ঋণখেলাপি হতে পারে না।

 শেয়ার বিজ: ধন্যবাদ

একেএম শহীদুল হক: আপনাকেও ধন্যবাদ