সুস্থ নগর সংস্কৃতির প্রসার ঘটুক

ইতালিয়ান কফি চেইনশপ বারিস্তা লাভাজ্জার বাংলাদেশ অংশের কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে যে খবর এসেছে গতকালের শেয়ার বিজে, তা এর ভক্তদের মনকে ব্যথিত না করে পারে না। স্থানীয় এমজিএইচ গ্রুপ পরিচালিত তাদের আউটলেটগুলো এখানে চালু হয়েছিল প্রায় এক দশক আগে। তারপর থেকে অনেক কফিপিপাসুর মন কেড়েছে তাদের পরিবেশিত পণ্য। আউটলেটগুলোর পরিবেশও ছিল পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুবান্ধব নিয়ে বসার মতো। ফলে বারিস্তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শুনে কেবল স্বতন্ত্র ব্র্যান্ডের চা-কফির ফ্লেভার হারানোর শোক নয়, ছোট-বড় স্মৃতি হারানোর বেদনায়ও ভুগবেন অনেকে। প্রথমোক্তটি যদি ভোলাও যায়, পরেরটি হবে অপূরণীয়। আমাদের প্রতিবেদক জানিয়েছেন, মূলত দুটি কারণে ব্যবসা গুটাচ্ছে বারিস্তা লাভাজ্জা। এক. এখন থেকে আর যৌথ কার্যক্রম পরিচালনা করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইতালিভিত্তিক লাভাজ্জা ও ভারতভিত্তিক বারিস্তা। দুই. ভেঙে যাওয়া দুই অংশের সঙ্গে নতুন করে কোনো চুক্তি হয়নি স্থানীয় গ্রুপটির। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে বলে অনুমান করা অবশ্য অপরিপক্ব হবে। স্থানীয়ভাবে ব্যবসারত বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা হ্রাসের কোনো লক্ষণ নয় এটি। তবে বারিস্তা লাভাজ্জার অভিজ্ঞতা বিদেশি ও স্থানীয় কফি শপগুলোর জন্য শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত রেখে যাচ্ছে নিঃসন্দেহে। সংশ্লিষ্টরা সেগুলো কাজে লাগাবেনÑএটাই প্রত্যাশা। আমরা চাইবো, বারিস্তা লাভাজ্জাকে হারানোর দুঃখ ভক্তদের মনে রেখাপাত না করুক; তা বরং ভুলিয়ে দিক চা-কফিশপের মতো নগর সংস্কৃতির সুলভ প্রসার।

বারিস্তা লাভাজ্জার সমমান কিংবা কারও কারও মতে, এর চেয়েও উঁচুদরের কফিশপ যেমন স্টারবাকস, গ্লোরিয়া জিন্স প্রভৃতি রয়েছে দেশে। স্পষ্টতই এদের টার্গেট কাস্টমার উচ্চবিত্তরা। বারিস্তা শুরুতে ওই গ্রুপকে ঘিরে অগ্রসর হলেও পরবর্তীতে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তরাই এদের মূল গ্রাহকে পরিণত হন। খেয়াল করা দরকার, উচ্চবিত্ত শ্রেণিকে টার্গেটে রেখে ব্যবসার ক্ষেত্রে যেমন লাভজনক দিক রয়েছে, তেমনি এর সবচেয়ে নাজুক দিক হলো তাদের মধ্যে পণ্যের ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ থাকে সীমিত। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী ভারতের উদাহরণ প্রণিধানযোগ্য। সেখানে বিশ্বখ্যাত কয়েকটি চেইনশপ ওই মনোভাব নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনায় নামলেও শেষ পর্যন্ত বাজারের চাপে তাদের টার্গেট বদলাতে হয়। বিষয়টি বাংলাদেশে পরিচালিত স্টারবাকস, গ্লোরিয়া জিন্সরা ভেবে দেখতে পারে। উড্ডীয়মান অবস্থায় ভারত যে হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছিল, সে তুলনায় আমাদের পারফরম্যান্স নেহায়েত খারাপ নয়। তদুপরি এখানকার সমাজে নগর সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের হার দ্রুত; একে কেবল ভোগবাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করাও কঠিন। হট্টগোল বাদ দিয়ে সুস্থির পরিবেশে চা-কফি পান করতে করতে আড্ডা দেওয়াটা ঠিক পরিপূর্ণভাবে ভোগবাদের কাঠামো মানে না। অবশ্য আমরা চাইবোÑএ হাওয়া বদলের সর্বোচ্চ সুযোগ নিক স্থানীয় উদ্যোগগুলো। তেমন কোনো প্রতিষ্ঠান আদৌ তৈরি হয়নিÑসে কথা বলা যাবে না। তবে এক্ষেত্রে একটি ধাঁধা রয়ে গেছে, অবিলম্বে যার সমাধান আবশ্যক। সেটি হলোÑস্থানীয় কফি কাম ফাস্টফুডশপে পরিবেশিত পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে ক্রেতার অভিযোগ। আবার বিক্রেতার যুক্তিÑপ্রথমত তাদের ফ্লোরভাড়া বেশি গুনতে হয়; ফলে পণ্যের দাম না বাড়িয়ে উপায় কী! দ্বিতীয়ত, ‘সমমানে’র কফি অমুক দোকানে ক্রেতারা এত টাকা বেশি দিয়ে খাচ্ছেন; একই পণ্য এখানে তার চেয়ে কম দামে খেতে অসুবিধা কোথায়! বাস্তবতা অস্বীকার করছি না আমরা। এর মীমাংসাও তাদের কাছে সবাই আশা করবেন নিশ্চয়ই।