সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তৎপরতা চলমান থাকুক

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অনেক অভিযোগ। সংস্থাটির সেবা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আয়োজিত গণশুনানিতে একাধিক সময়ে ক্ষোভ উগরে প্রতিকার চেয়েছে সেবাবঞ্চিত সাধারণ মানুষ। সমস্যা নিয়ে বছরের পর বছর রাজউকে ঘুরেছে তারা। এর মধ্যে রয়েছে প্লটের অর্থ জমা দিয়েও দখল না পাওয়া, ভূমি ছাড়পত্র, নকশা অনুমোদন অথবা নামজারিতে হয়রানির শিকার হওয়া। গণশুনানি ও দুদকের ঝটিকা অভিযানের পর অবশ্য কিছুদিন ‘সতর্ক’ থাকেন সংস্থাটির অসাধু কর্মকর্তারা।
অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে জনসাধারণের সরাসরি যোগাযোগ হয়ে থাকে, তাদের অধিকাংশই দুর্নীতিতে জড়িত। সংস্থাটির এস্টেট ও নকশা অনুমোদন শাখায় সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়। রাজউকে কতভাবে যে সেবাগ্রহীতারা হয়রানির শিকার, তার ইয়ত্তা নেই। এর মধ্যে রয়েছে অনিয়মের মাধ্যমে প্লট পরিবর্তন, প্লটের আয়তন বৃদ্ধি, একই ব্যক্তিকে একাধিক প্লট দেওয়া, প্লট বাতিল, অধিগ্রহণ করা প্রকল্পে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তকে প্লট না দিয়ে আত্মসাৎ, গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব করে দেওয়ার মতো ঘটনা। রাজউকে কী ধরনের দুর্নীতি চলছে, সেবা নিতে না আসা ব্যক্তিরাও তা জানেন। কারণ আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবসহ পরিচত অনেকেই ভুক্তভোগী। রাষ্ট্রীয় অন্যান্য সংস্থার মতো রাজউকও নাগরিক সনদে (সিটিজেন চার্টার) সেবাদানের বিষয়ে অনেক কিছু উল্লেখ করেছে; কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা নেতিবাচক।
গতকাল শেয়ার বিজে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অবশ্য ভুক্তভোগীদের মনে কিছুটা আশার সঞ্চার করবে। এটি রাজউক কর্মকর্তাদের অপকর্ম থেকে নিবৃত্ত করার কথা। প্লট বরাদ্দে অনিয়ম নিয়ে হটলাইনে (১০৬) অভিযোগ পেয়ে রোববার রাজউকের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে দুদক। এবং প্লট বরাদ্দে জালিয়াতির প্রমাণ পায় দুদক টিম।
একটি প্লট এক ব্যক্তির নামে বরাদ্দ দিয়ে বিশেষ কায়দায় তা আবার বাতিল করতেন সংস্থাটির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। এরপর আবার বিপুল অর্থের অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে আরেকজনকে প্লটটি বরাদ্দ দেওয়া হতো। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের পাঁচ কাঠার একটি প্লটের বরাদ্দ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে অভিযান চালায় দুদক। সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করেন এর কর্মকর্তারা। তাতে উঠে আসে, ২৮ অক্টোবর ২০০৩ গ্রাহক জুবিলী হকের অনুকূলে প্লটটির সাময়িক বরাদ্দপত্র জারি হয়। ৫ আগস্ট ২০১০ একই প্লট এফএম সাইফুল ইসলামের নামেও বরাদ্দ করা হয়।
দুদক কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করে রাজউক সদস্য (এস্টেট অ্যান্ড ল্যান্ড) বলেছেন, ‘এ প্লট বরাদ্দের বিষয়টি অতিসত্বর শেষ হবে।’ আমরা চাই, এমন ঘটনা আর ঘটবে না মর্মে নিশ্চয়তা দেবে রাজউক। বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটবে আর দুদক এসে পাকড়াও করলে সাময়িক সময়ের জন্য টনক নড়বে এটি কাম্য নয়। শোধরাতে হবে তাদের নিজেদের আর নিশ্চিত করতে হবে অভ্যন্তরীণ সুশাসন।
দুদক সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সরাসরি অভিযোগ শুনতে যেসব গণশুনানি করেছে, তাতে ৬৬ শতাংশ অভিযোগকারীই কোনো সমাধান পায়নি। এও লক্ষণীয়, যা দুর্নীতিবিরোধী গবেষণা সংস্থা টিআইবির জরিপে উঠে এসেছে। তবু গণশুনানি অব্যাহত রাখা উচিত বলেই আমরা মনে করি। দেশে দুর্নীতি যেভাবে জেঁকে বসেছে, তাতে রাতারাতি সেটা নির্মূল করা যাবে না। কিন্তু দুদক নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখলে হয়রানি ও দুর্নীতি কমে আসবে, সাধারণ মানুষের এমনটাই ধারণা। আমরা চাই, সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুদকের এ তৎপরতা চলমান থাকবে।