সৃজনশীল রচনামূলক প্রশ্নে হোক পাবলিক পরীক্ষা

শরীফুর রহমান আদিল : গত এক-দুই বছর ধরে গুণগত শিক্ষা ও প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে না পেরে শিক্ষাবিদরা এমসিকিউ তুলে দেওয়ার জোর প্রস্তাব দেন। বিষয়টিকে এত বেশি গুরুত্ব না দিলেও গত চার বছরের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ও এমসিকিউতে অধিক নাম্বার পেয়ে কেবল ফাঁসের হার বাড়ায় খোদ শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে এমসিকিউ বাদ দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালের পরীক্ষা থেকে এমসিকিউ ৪০ নম্বর থকে ১০ নাম্বার বাদ দিয়ে ৩০ নাম্বারের করা হয় কিন্তু এরপরও প্রশ্নপত্র ফাঁস ও গুণগত শিক্ষা অর্জন না হওয়ায় শিক্ষামন্ত্রী এমসিকিউ তুলে দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন। এরপর রাষ্ট্রপতি ও  প্রধানমন্ত্রী এমসিকিউ তুলে দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর এ উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। বিশেষ করে সরকারের এ উদ্যোগ গুণগত শিক্ষা অর্জনে অনেকাংশই সহায়তা করবে।  প্রসঙ্গত, ২০০৮-এ সর্বপ্রথম বাংলাদেশে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হয়ে ২০১০ সালে বাংলা ও ধর্ম বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়ার মাধ্যমে এটির প্রবর্তন হয়। সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হলেও এটি নিয়ে সমালোচনার ঝড় শুরু হয় সর্বত্রই। প্রথমে এ সমালোচনাকে কানে না নিলেও পরে শিক্ষক- শিক্ষার্থীর অবস্থা ও এর কার্যকারিতা নিয়ে তেমন সুফল নিয়ে না আসায় খোদ বাংলাদেশে সৃজনশীল প্রবর্তনকারীরাও এর সমালোচনা করেন। তবে এটি স্পষ্ট যে, সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়ার পর শিক্ষার সংখ্যাগত উন্নয়ন হয়েছে ব্যাপক। ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল ও জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যার দিকে নজর দিলেই তা স্পষ্ট হয়। শিক্ষার সংখ্যার উন্নয়ন আর ‘আই অ্যাম জিপিএ ফাইভ’ ছাড়া শিক্ষার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কোনোটিই পূরণ হয়েছে বলে মনে হয় না। যাহোক, এমসিকিউ তুলে দিয়ে প্রশ্ন ব্যাংক পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার কথা শিক্ষামন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি বলেছেন; তবে সেটির প্রকৃতি কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এবার ভেবেচিন্তে যে কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করা উত্তম হবে। কেননা, কোনো কোনো শিক্ষাবিদ কেবল বিদেশে গিয়ে দেখে আসা কোনো পদ্ধতিকে নিজের দেশে চাপিয়ে দেওয়ার জোর প্রচেষ্টা চালান, অতীতেও এসব দেখা গেছে কিন্তু তারা বাংলাদেশের বাস্তবতা ও পরিবেশ দেখে সিদ্ধান্ত নেন না। আমাদের দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি ও শিক্ষার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে যে কোনো উদ্যোগ নেওয়া উচিত।  স্বাধীনতার পর থেকে গঠিত হওয়া পাঁচটি শিক্ষা কমিশনের কোনোটিই নির্ধারিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারেনি। কমিশনগুলো হলোÑড. কুদরত-ই-খুদা কমিশন (১৯৭২), অন্তর্বর্তী শিক্ষা কমিশন (১৯৭৯), মফিজ উদ্দীন শিক্ষা কমিশন (১৯৮৮), জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি (১৯৯৭) এবং জাতীয় শিক্ষানীতি (২০১০)।  কিন্তু এসব কমিশন শিক্ষার যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছেন তা কি আসলে অর্জিত হয়েছে? ২৪ অক্টোবর, ১৯৭২ সালে ড. কুদরত-ই-খুদা কমিশনটি গঠন করেছিলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যে শিক্ষানীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল সুনাগরিক সৃষ্টি, প্রগতিশীল সমাজ, সমাজ সংস্কার করার যোগ্যতা অর্জন, সৃজনশীল, দক্ষ মানবসম্পদ, বিজ্ঞানমনস্ক প্রগতিশীল সমাজ ও আদর্শবাদী জাতি গঠন করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক ও মূল্যবোধ তৈরি করতে সক্ষম হওয়া। কিন্তু বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতি শিক্ষার্থীদের মনে নৈতিক মূল্যবোধ কিংবা যুক্তিবাদিতা কোনোটাই অর্জন করতে পারছে না। ফলে সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটছে নৈতিক অবক্ষয়ের কাজ আর জ্যামিতিক হারেই বাড়ছে সামাজিক ব্যাধিগুলো।  মানসম্মত শিক্ষার অভাবে বাড়ছে বেকারত্বের হার! একটা সময় শিক্ষিত ব্যক্তি বলতে বুঝানো হতো সভ্য, নম্র, ভদ্র, নৈতিক ও বিচারমূলক চিন্তাসমৃদ্ধ যে কোনো ব্যক্তিকে কিন্তু বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার ফলে আমরা এর উল্টো চিত্র দেখতে পাই! শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে কিন্তু সমাজ থেকে কোনোভাবেই দমানো যাচ্ছে না অসভ্যতাকে, কমানো যাচ্ছে না অনৈতিকতাকে, দূর করা সম্ভব হচ্ছে না দুর্নীতিকে বরং সমাজের সর্বত্রই অনৈতিকতার নিত্যনতুন কৌশল, বর্বরতার আধুনিক সংস্করণ, ক্ষমতা ও কব্জির জোরে সুশাসনকে ভূলুণ্ঠিতকরণ প্রভৃতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই প্রশ্ন জাগে কেন এসব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে? শিক্ষিত হলে তো এসব দিন দিন হ্রাস পাওয়ার কথা! ক্রমবর্ধমান শিক্ষিতের রেখা উপরের দিকে উঠলেও কেন এসব অপরাধ দিন দিন হু হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে!

আবার জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ সালের শিক্ষার যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা কেবল সৃজনশীল পদ্ধতির মাধ্যমে অর্জিত হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কেননা, এ পদ্ধতির মাধ্যমে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে নৈতিকতা, ন্যায়বোধ অর্জিত হচ্ছে না। এছাড়া মুক্তবুদ্ধির চর্চা, মুখস্থবিদ্যাকে বাদ দিয়ে নিজস্ব চিন্তাশক্তিকে বিকশিত করা প্রভৃতি লক্ষ্যগুলো কেবল এ পদ্ধতির মাধ্যমে অর্জন সম্ভব নয়। একইসঙ্গে জ্ঞানভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে আইসিটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিলেও আইসিটির অপব্যবহার রোধে সেক্ষেত্রে নৈতিকতাকে সেভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি!  অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মনে মূল্যবোধ, মানবতাবোধ প্রভৃতি তৈরি করতে পারেÑসেরকম কোনো বিষয় এইচএসসি পর্যায়ে সংযুক্ত করা হয়নি। তবে শিক্ষার এসব লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণে কিছু পদক্ষেপ নিলে শিক্ষার গুণগত অর্জন অনিবার্য। বর্তমানে যে শিক্ষা পদ্ধতি চালু রয়েছে তার সঙ্গে অথবা যে প্রশ্ন ব্যাংকের কথা শোনা যাচ্ছে তার সঙ্গে নি¤েœাক্ত পদক্ষেপগুলো নিলে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য দুটোই পূরণ হওয়া সম্ভব।

১. আইসিটি দুই বছরে পড়ানো হলেও পত্র মাত্র একটি আর নাম্বারও ১০০! যেখানে অন্যান্য সব বিষয় ২০০ নাম্বারের দুটি করে পত্র দুই বছরে শেষ করে। এক্ষেত্রে আইসিটির সঙ্গে নৈতিকতা বিষয়টি সংযুক্ত করা যেতে পারে। অতিরিক্ত শিক্ষক না নিয়োগ দিয়ে যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের শিক্ষকদের দিয়ে এ বিষয়টি পড়ানো যাবে।

২. এমসিকিউ ৩০ নাম্বারের পরিবর্তে সেখানে সাম্প্রতিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আলোচিত  বিষয়াবলি ( রচনামূলক) সংযুক্ত করা যেতে পারে। ইংরেজির ক্ষেত্রে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে বলা, ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে নতুন কী কী কোম্পানি এসেছে তাদের মার্কেটিং পলিসি মূল্যায়ন করে প্রতিবেদন দেওয়া যেতে পারে। যুক্তিবিদ্যা কিংবা সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত যে কোনো সমস্যার সমাধানে যৌক্তিক সমাধান করতে বলা যেতে পারে। পরীক্ষার ১৫ দিনের মধ্যে ঘটে যাওয়া পুরো বছরের যে কোনো আলোচিত ইস্যু প্রশ্নপত্রে দেওয়া যেতে পারে।  তবে এক বছরের প্রশ্ন অন্য বছর দেওয়া যাবে না, কেবল পরীক্ষার  হালের বছর সংঘটিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি প্রশ্নপত্রে থাকবে।

তবে কোনো কোনো শিক্ষাবিদ এমসিকিউ পদ্ধতির পরিবর্তে এক কথায়  উত্তর সংবলিত প্রশ্নোত্তর দেওয়ার জোর দাবি তুলছেন কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখতে হবে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে তার মধ্যে শিক্ষকদের একটি অংশও জড়িত। কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের শিক্ষকরা প্রশ্নপত্র ফাঁস করলেও ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রে তারা পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের এমসিকিউ প্রশ্নোত্তর বলে দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক ফল ও নিজেদের এমপিও বাঁচাতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে চলছে আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষকরা এক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের এমসিকিউ প্রশ্নোত্তরগুলো পরীক্ষার হলে বলে দেওয়ার প্রবণতা স্পষ্টই দৃশ্যমান হয়েছে। যদিও প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো সম্ভবও হয় তবে শিক্ষকদের এ অনৈতিক প্রবণতা কীভাবে দূর করা যাবে? তাই এমসিকিউর পরিবর্তে এক কথায় উত্তর সংবলিত প্রশ্নোত্তর কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। গত বছর এসএসসি ও এইচএসসিতে কুমিল্লা বোর্ডের ফলাফলে ধস নামায় কর্তৃপক্ষ এর কারণ অনুসন্ধানে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক, অভিভাবক, গণমাধ্যমকর্মী মতবিনিময় সভা থেকে যে অভিযোগটা সবাই করেছেন তা হলো কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ক্লাস, পড়া বাদ দিয়ে অধিক সময় ধরে মোবাইল ও নেটে সময় দিচ্ছে। আর  এ নেশা থেকে অভিভাবকরা কিছুতেই তাদের সন্তানদের নিবারণ করতে পারছেন না। পরীক্ষার সময় শর্ট সাজেশন্স, এমসিকিউ কিংবা প্রশ্নপত্র ফাঁস করে গাইডের সহায়তা নিয়ে পাস করে বের হচ্ছে। যদি উপরোক্ত সৃজনশীল ও সাম্প্রতিক বিষয়াবলির রচনামূলক প্রশ্নোত্তরে ৪০ নাম্বার সংযোজন করা হয় তবে স্কুল কিংবা কলেজ পালানোর প্রবণতা শিক্ষার্থীদের মন থেকে উদাও হবে; একইসঙ্গে শিক্ষার্থীরা কেবল সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে পড়ে না থেকে দেশ-বিদেশের ঘটে যাওয়া বিভিন্ন বিষয়াবলি জানতেও তাদের সময় ব্যয় করতে হবে। সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের মধ্যে যুক্তিবাদিতা, সৃজনশীলতা ফিরে আসবে এবং গাইড বইয়ের প্রতি অনীহা জšে§ ক্লাসের প্রতি মনোযোগী হয়ে ক্লাসে ফিরে যেতে হবে। তবেই গুণগত শিক্ষা অর্জিত হবে। গত দুই সপ্তাহ ধরে এমসিকিউর পরিবর্তে সাম্প্রতিক বিষয়াবলি (রচনামূূলক)  শিরোনামে পরিচালিত গবেষণায়

বিভিন্ন মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষাবিদদের এ বিষয়ে মতামত নিতে গেলে সবাই একে গ্রহণযোগ্য বলে মত দিয়ে এ পদ্ধতির ভূয়সী প্রশংসা করেন।

৩. চতুর্থ তথা অতিরিক্ত বিষয়ে উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক করত হবে।

৪. নিজ নিজ শিক্ষার্থীর ধর্মকে আবশ্যিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তবে উগ্রবাদ ছড়াতে পারে কিংবা সাম্প্রদায়িকতা বিনষ্ট করে এ ধররেন অধ্যায় বাদ দেওয়া যেতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রকার সামাজিক ব্যাধি ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে আইনের চেয়ে ধর্ম অনেক শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। আর এ কারণে সমাজবিজ্ঞানীরা ধর্মকে আফিমের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

 

কলেজ শিক্ষক, ফেনী

[email protected]