সেন্ট মার্টিন দ্বীপ আমাদেরই

আরিফ চৌধুরী শুভ: বাংলাদেশে এ মুহূর্তে আলোচিত বিষয় বাংলাদেশের পর্যটকসমৃদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। এই আলোচনার জন্ম সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে মিয়ানমারের নিজেদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে। একদিকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য থেকে জোর করে বিতাড়নের উদ্দেশ্য, অন্যদিকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে নিজেদের দাবি করার মধ্যে মুদ্রাপিঠ সম্পর্ক স্পষ্ট। এটা অদূর ভবিষ্যতে দখলদারিত্বের একটি ইঙ্গিতমাত্র।
মিয়ানমারের শ্রম, অভিবাসন ও জনসংখ্যাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দেখিয়েছে দেশটি। এই দ্বীপটিকে যে তারা এখনও পরোক্ষভাবে নিজেদের মনে করে এবং পেতে চায় এর মাধ্যমে তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। যদিও বাংলাদেশের তীব্র প্রতিবাদের মুখে বিষয়টি ‘অনিচ্ছাকৃত’ ভুল বলে স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত লুইন উ। কিন্তু এতবড় একটি ভুলকে ‘অনিচ্ছাকৃত’ ভুল বলে উড়িয়ে দেওয়াটা বাংলাদেশের জন্য শুভকর হবে না। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ যখন বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণে অনেকটা সফল, ঠিক তখনই কেন এই ভুল করবে মিয়ানমার? বাংলাদেশের স্বাধীন ভূখণ্ডের একটি অংশকে মিয়ানমার দাবি করার পেছনে কোনো শক্তিশালী যুক্তি বা গভীর ষড়যন্ত্র নেই তো?
অথচ মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার নিষ্পত্তির সময় সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে ভিত্তি করেই বাংলাদেশ তার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত উত্থাপন করেছিল আন্তর্জাতিক আদালতে। সমুদ্রসীমার নিষ্পত্তির সময়ও আন্তর্জাতিক আদালতে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল সেন্ট মার্টিন বিতর্ক। ২০১২ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো আরেকবার এই বিতর্কের জন্ম দিল মিয়ানমার। এই বিতর্ক যে অদূর ভবিষ্যতে আবারও হবে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে?
২০১২ সালের ১৪ মার্চ জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল (আইটিএলওএস) বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমুদ্রসীমাবিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তির রায় প্রদান করেন। ১৫১ পৃষ্ঠাব্যাপী সেই রায়ে বাংলাদেশ নীতিগতভাবে জয়ী হলেও মিয়ানমার কি একেবারেই হেরে গেছে? আইটিএলওএস সেদিন যদি উভয় দেশের কন্টিনেন্টাল শেলফের (সিএস) সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করত, তাহলে আজ মিয়ানমার এই দাবি করতে পারত না।
সমুদ্রসীমাবিষয়ক আন্তর্জাতিক আইন টঘঈখঙঝ ওওও অনুযায়ী সমুদ্রতট থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে সিএসের সীমানা ধরে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ট্রাইব্যুনাল উদ্যোগ নেয়। সমুদ্রতটবর্তী পাশাপাশি দুটি দেশের ঞবৎৎরঃড়ৎরধষ ঝবধ বিষয়ে তখন বাংলাদেশের যুক্তি ছিল সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ সাগরসীমা নিয়ে ১৯৭৪ ও ২০০৮ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি সমঝোতা চুক্তি আছে, কিন্তু মিয়ানমারের আপত্তির মুখে সেটি দুর্বল হয়ে যায়। মিয়ানমার দাবি করে ওই চুক্তিগুলো ছিল জাহাজ চলাচলবিষয়ক, কিন্তু সীমানা নির্ধারণের চুক্তি নয়। মিয়ানমার জোরালো দাবি করে বলে, সেন্ট মার্টিন দেশটির স্থলসীমানার (নাফ নদ) ভেতরে পড়ে। তাই সমুদ্রবিরোধ নিষ্পত্তির সময় সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে আলাদাভাবে দেখার জন্য আইটিএলওএসকে অনুরোধ জানায় মিয়ানমার।
ট্রাইব্যুনাল মিয়ানমারের যুক্তিকে মেনে নিয়ে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ধরে বাংলাদেশকে সর্বাধিক ১২ নটিক্যাল মাইল (এক নটিক্যাল মাইল = ১.৮৫২ কিলোমিটার) রাষ্ট্রীয় সমুদ্রের অধিকারই প্রদান করেন, যার ফলে বাংলাদেশ তার সমুদ্রতটের দক্ষিণ সীমানা সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ থেকে মূল ভূখণ্ডে টেকনাফের দিকে সরে আসে।
আন্তর্জাতিক আইন টঘঈখঙঝ ওওও-এর ৭৬.১ ধারা অনুযায়ী, একটি দেশের সমুদ্রতীরবর্তী একচ্ছত্র অর্থনৈতিক এলাকা (ইইজেড) বলতে তার তটরেখা থেকে ওইসব এলাকাকে বোঝায়, যা ওই দেশের পলিপাতনের মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পলির মাধ্যমে এর সাগরতল গঠিত হয়েছে, যা দক্ষিণমুখী রাখাইন সমুদ্রের দিকে বহমান।
সমুদ্রসীমা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধের মূল বিষয় ছিল, সমুদ্রতট থেকে সমদূরত্ব নীতির মাধ্যমে (ইইজেড) এলাকা নির্ধারণে মিয়ানমারের দাবি। কিন্তু যদি এটি করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ থেকে আসা পলির স্তরের ওপর মিয়ানমারের অধিকার চলে যাবে। তাই বংলাদেশ উভয় দেশের ইইজেড নির্ধারণের জন্য সমদূরত্ব নীতির ঘোর বিরোধিতা করে, কিন্তু মিয়ানমার সমদূরত্ব নীতিতেই অনড় থাকে। ফলে বাংলাদেশের বিরোধিতার মুখেও ট্রাইব্যুনাল নাফ নদের মুখকে সমদূরত্ব রেখা ধরে বিচার করে।
ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পশ্চিমে মান্দারবাড়ী দ্বীপ থেকে পূর্বে কুতুবদিয়া দ্বীপ পর্যন্ত এবং উত্তরে কুতুবদিয়া থেকে দক্ষিণে টেকনাফ পর্যন্ত মোট দুটি তটরেখা প্রতিষ্ঠা করে। উভয় দেশের তটবর্তী ২০০ নটিক্যাল মাইল ইইজেড এলাকা ভাগ করে দেয়।
ফলে সমুদ্রসীমাবিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ে বাংলাদেশ সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম বরাবর তার ইইজেড এলাকা হারিয়েছে। সমদূরত্ব নীতি প্রয়োগ হওয়ায় বাংলাদেশ ২০০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে ১৫০ নটিক্যাল মাইল সিএসের বিস্তীর্ণ এলাকা হারিয়েছে। ফলে এসব এলাকায় বাংলাদেশের সব ধরনের অধিকার হাতছাড়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমুদ্রসীমা বিরোধের লড়াইয়ে বাংলাদেশ অনেক যুক্তি দেখিয়েছে, অনেক পরিশ্রম করেছেÑতার সবটা মিয়ানমার অস্বীকারও করেনি; কিন্তু ট্রাইব্যুনালের সমদূরত্ব নীতি গ্রহণ করার কারণে বাংলাদেশ তার সম্ভাব্য সিএস এলাকার মধ্যেই অনেক এলাকা হারিয়েছে, যা মিয়ানমারের অধীনে চলে গেছে। একইভাবে মিয়ানমারও তার সম্ভাব্য ইইজেড এলাকার মধ্যে অনেক এলাকা হারিয়েছে, যা বাংলাদেশ পেয়েছে; কিন্তু সেন্ট মার্টিন কোনোভাবেই হারায়নি এ রায়ে।
কিন্তু হঠাৎ করেই মিয়ানমার এমন দাবি করবে কেন? রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো চলমান একটি ইস্যু থেকে বিশ্বমিডিয়ার দৃষ্টি সরাতে মিয়ানমার ইচ্ছাকৃতভাবে এমন দুঃসাহস করেনি তো? রোহিঙ্গা ইস্যুটি বিশ্বে এখন অতিমানবিক এক ইস্যু। এই ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মিয়ানমারকে চাপে ফেলেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের তথ্যানুসারেও মিয়ামারকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এসব পদক্ষেপে বেকায়দায় থাকা মিয়ানমার মানচিত্র নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে কতটুকু সফল হতে পারবে?
বাংলাদেশ সরকারকে এই রহস্যের সঠিক সত্য উদ্ঘাটন করা উচিত অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। এমন উদ্ভট দাবির জন্যে শুধু দুঃখ প্রকাশ নয়, মিয়ানমারকে আনুষ্ঠানকিভাবে ক্ষমাও চাইতে বাধ্য করা উচিত বলে আমি মনে করি। নতুবা আজ সেন্ট মার্টিনকে যেমন দাবি করার সাহস পাচ্ছে মিয়ানমার, তেমনি কাল সিলেটকেও মেঘালয়ের অংশ দেখিয়ে ইন্ডিয়াও নিজেদের বলে দাবি করার সাহস দেখাতে পারে। সুতরাং আমাদের ভূখণ্ডের ব্যাপারে এখনই সতর্ক না হলে অদূর ভবিষ্যতে ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হতে পারে বাংলাদেশের।
ভূরাজনীতির বিষয় বলে অনেকের কাছে বিষয়টি একেবারেই অস্পষ্ট থাকা অস্বাভাবিক লাগতেই পারে, কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে এটি বাংলাদেশের জন্যে খুবই স্পর্শকাতর একটি বিষয়। এসব বিষয়ে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই কাউকে। মিয়ানমারের এমন অদ্ভুত দাবির যৌক্তিকতা আগেই বলে এসেছি, কিন্তু তার পরও অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে সেন্ট মার্টিন দ্বীপটি কি সত্যিই একদিন মিয়ানমার নিয়ে যেতে পারে? এই প্রশ্ন আসাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, যদি ভূরাজনীতি সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা না থাকে। তাই আগে জানতে হবে সেন্ট মার্টিন দ্বীপটি কীভাবে আমাদের হলো।
কবে প্রথম এই দ্বীপটিকে মানুষ শনাক্ত করেছিল তা কারোই জানা নাই। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, প্রায় ২৫০ বছর আগে আরব বণিকরাই প্রথম এই দ্বীপটি আবিষ্কার করে। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক বন্দর চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যাতায়াতের সময় এই দ্বীপটি তাদের চোখে পড়ে। তারা এই দ্বীপকে নিজেদের বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করত। এই দ্বীপে প্রচুর নারকেল গাছ ছিল বলে তারা এর নাম দেয় জিঞ্জিরা দ্বীপ। কালক্রমে চট্টগ্রাম ও তৎসংলগ্ন মানুষের কাছেও দ্বীপটি জিঞ্জিরা দ্বীপ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বাঙালিরা প্রথম বসতি স্থাপন করে এই দ্বীপে। তার পরে মিয়ানমার থেকে রাখাইন সম্প্রদায় বা আজকের রোহিঙ্গারা আরাকান থেকে এসে এই দ্বীপে বসতি করে। তারা প্রত্যেকেই ছিল মৎস্যজীবী। বাঙালি ও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে অধিবাসী ১৩টি পরিবারও বসতি স্থাপন করেছিল এই দ্বীপ। এভাবেই দ্বীপটি বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় পরিণত হয়। এই দ্বীপের বৃক্ষ হলো কেয়া ও ঝাউগাছ। নারকেল গাছ এই দ্বীপের প্রধান বৃক্ষ। বর্তমানে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে প্রায় দেড় লাখ নারকেল গাছও আছে।
ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯০০ সালে ভূমি জরিপের সময় এ দ্বীপটিকে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সে সময়টিতে বার্মা ব্রিটিশ শাসনের আওতায় থাকলেও সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে বার্মার অন্তর্ভুক্ত না করে ব্রিটিশ-ভারতেরই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তখন ব্রিটিশরা জিঞ্জিরা নামের পরিবর্তে খ্রিষ্টান সাধু মার্টিনের নামানুসারে সেন্ট মার্টিন দ্বীপটির নতুন নামাকরণ করে। তখন থেকেই নারকেলের জিঞ্জিরা দ্বীপটি সেন্ট মার্টিন নামেই পরিচিত।
ভূতত্ত্ববিদদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩৩ হাজার বছর আগে সে এলাকায় প্রাণের অস্তিত্ব ছিল। পাঁচ হাজার বছর আগেও টেকনাফের মূল ভূমির অংশ ছিল এই দ্বীপটি। কিন্তু প্রাকৃতিক কারণে ধীরে ধীরে এটি সমুদ্রের নিচে চলে যায়। এরপর প্রায় ৪৫০ বছর আগে বর্তমান সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ পাড়া জেগে ওঠে। এর ১০০ বছর পর উত্তর পাড়া এবং পরবর্তী ১০০ বছরের মধ্যে বাকি অংশ জেগে ওঠে।
বাংলাদেশ ও বিদেশের পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে নাফ নদীর মোহনায় এ দ্বীপটি অবস্থিত। বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প থেকে এ বছর প্রায় ৪০০ কোটিরও বেশি রাজস্ব এসেছে। অর্থনৈতিক জোন, পর্যটন এরিয়া ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার সম্ভাবনা এবং জিওগ্রাফিক্যাল বিভিন্ন দিক বিবেচনা করলেও সেন্ট মার্টিন একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ স্থান। তাই এই দ্বীপটির প্রতি ভূরাজনীতি করার আগে আমাদের যেমন সতর্ক থাকতে হবে, ঠিক তেমনি কোনো বিরোধ দেখা দিলে তার মোকাবিলা করতে হবে সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে।

শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়