সেবাকে রফতানি দেখিয়ে ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে জিই হেলথকেয়ার

বিদেশি প্রতিষ্ঠান উইপ্রো হেলথকেয়ারের দোহাই

রহমত রহমান: বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সরঞ্জামের বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদান করে, বিক্রয়োত্তর সেবা বা সার্ভিসিং চার্জ নেয় বৈদেশিক মুদ্রায়, আর বৈদেশিক মুদ্রায় নেওয়া চার্জকে রফতানি দেখিয়ে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে জিই হেলথকেয়ার বাংলাদেশ লিমিটেড নামে একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান। এভাবে প্রতিষ্ঠানটি বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে।
সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি উদ্ঘাটন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ভ্যাট পরিশোধে দাবিনামা জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, জিই হেলথকেয়ার বাংলাদেশ লিমিটেড মূলত একটি বাংলাদেশি স্বনামধন্য এবং সবচেয়ে বড় মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট সার্ভিস বা মেরামতকারী প্রতিষ্ঠান। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে এটি সারা দেশে সার্ভিসিং সেবা প্রদান করে আসছে। এটি এনবিআরের আওতাধীন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকার (দক্ষিণ) ভ্যাট নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠান। ভারতের স্বনামধন্য ও সবচেয়ে বড় হাসপাতাল সরঞ্জাম উৎপাদক ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান উইপ্রো জিই হেলথকেয়ার প্রাইভেট লিমিটেড। উইপ্রো বাংলাদেশে তাদের হাসপাতাল সরঞ্জাম আমদানিকারক ও হাসপাতাল মালিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের পণ্য সরাসরি রফতানি করে। বিক্রির শর্তানুযায়ী উইপ্রো এসব সরঞ্জামের ওয়ারেন্টি সেবা প্রদান করে। এসব ওয়ারেন্টি সেবা দেওয়ার জন্য উইপ্রো বাংলাদেশের জিই হেলথকেয়ারের সঙ্গে চুক্তি করে। ওয়ারেন্টি চাহিদা অনুযায়ী জিই হেলথকেয়ার সে সেবা প্রদান করে আসছে। চুক্তি অনুযায়ী, জিই হেলথকেয়ারকে উইপ্রো এসব সরঞ্জামের স্পেয়ার পার্টসের ১০ শতাংশ হারে সার্ভিসিং চার্জসহ সার্ভিসিং সেবামূল্য প্রদান করে থাকে। উইপ্রো বিদেশি কোম্পানি হলেও জিই হেলথকেয়ার দেশের ভেতরে মেরামত বা সার্ভিসিং সেবা দিয়ে থাকে।
সূত্র জানায়, প্রায় ২০ বছর ধরে জিই হেলথকেয়ার চুক্তি অনুযায়ী এ সেবা দিয়ে আসছে। সেবা বা সার্ভিসিংয়ের ক্ষেত্রে যেসব যন্ত্রাংশ প্রয়োজন হয়, তা জিই হেলথকেয়ার আমদানি করে থাকে। এনবিআর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগ পায়Ñরফতানিকারক প্রতিষ্ঠান না হয়েও রফতানি দেখিয়ে ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির কাছে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্য চাওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি উইপ্রোর হয়ে ওয়ারেন্টির বিক্রয়োত্তর সার্ভিসিং প্রদান করে, যার ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য। উইপ্রো বাংলাদেশি জিই হেলথকেয়ারকে সার্ভিসিং সেবার মূল্য বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করে। জিই এ বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে সেবাকে রফতানি হিসেবে দেখিয়ে সার্ভিসিং বা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ভ্যাট প্রদান করে না।
প্রতিষ্ঠানটির কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, জিই হেলথকেয়ার মিথ্যা তথ্য দিয়ে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৮১ কোটি টাকার ওয়ারেন্টিযুক্ত হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সরঞ্জাম সার্ভিসিং বা মেরামত সেবা প্রদান করেছে। এর ওপর ১০ শতাংশ হারে ওয়ারেন্টি সার্ভিস চার্জ প্রায় সাড়ে আট কোটি টাকা। সে অনুযায়ী মোট প্রায় ৮৯ কোটি টাকার সেবা প্রদান করেছে। এর ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা। দুই শতাংশ হারে সুদ প্রায় ছয় কোটি টাকাসহ মোট ভ্যাটের পরিমাণ প্রায় ১৯ কোটি ছয় লাখ টাকা, যা প্রতিষ্ঠানটি পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে।
সূত্র আরও জানায়, ফাঁকি দেওয়া ভ্যাট পরিশোধে চলতি বছরের ৯ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটিকে প্রাথমিক দাবিনামা-সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়। নোটিসের জবাবে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, উইপ্রো বৈদেশিক মুদ্রায় সার্ভিস চার্জ পরিশোধ করে। তারা বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে সেবা দিচ্ছে। সে কারণে এ সেবাকে তারা রফতানি হিসেবে দেখিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়।
ভ্যাট কমিশনারেট বলছে, চুক্তি অনুযায়ী বিক্রয়োত্তর গ্যারান্টির সার্ভিস প্রদান করা হয়েছে। এ সার্ভিসে ভ্যাট প্রযোজ্য। উইপ্রো এদেশে এসে এ সেবা প্রদান করলেও ভ্যাট দিতে হবে। উইপ্রো তাদের ব্যয় কমানোর জন্য চুক্তি অনুযায়ী স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে। সুতরাং এ সেবা রফতানি হচ্ছে না। জিই হেলথকেয়ারের যুক্তি নাকোচ করে ভ্যাট পরিশোধে ২৮ জুন চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করে। এ ভ্যাট পরিশোধ না করলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নোটিসে উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে ভ্যাট দক্ষিণ কমিশনারেটের একজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, চুক্তি অনুযায়ী সার্ভিসিং ও মেরামত সেবা যেকোনো প্রতিষ্ঠান দিতে পারে। সার্ভিসিং হলেই ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। জিই হেলথকেয়ার উইপ্রো থেকে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে সেবা দেয়। বৈদেশিক মুদ্রার সেবাকে রফতানি হিসেবে দেখিয়ে বছরের পর বছর ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে। আমরা প্রতিষ্ঠানটির এমন অভিনব কৌশলে ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছি। ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান একই কৌশলে ফাঁকি দিচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জিই হেলথকেয়ার বাংলাদেশ লিমিটেডের সিইও মো. আশফাকুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, এনবিআর ফাঁকি দাবি করতেই পারে। এনবিআর তার মতো বলবে, কোম্পানি নিজের মতো বলবে। বিষয়টি আইনগত। আমি বিষয়টি পুরোপুরি জানি না বলে বলা ঠিক হবে না, জানার পর বিষয়টি আইনগত হলে বলা উচিত।