সেমিনারে বক্তারা: পরিবারতান্ত্রিক কোম্পানিতে উপেক্ষিত করপোরেট সুশাসন

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে বেশিরভাগ কোম্পানির বোর্ড পরিবারতান্ত্রিক, যার কারণে একই ধরনের সিদ্ধান্ত আসে বোর্ড থেকে। সেখানে করপোরেট গভর্ন্যান্স প্রাধান্য পায় না। তাতে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত, ব্যবসা সম্প্রসারণসহ প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না ম্যানেজমেন্ট।

গতকাল শনিবার রাজধানীর কাকরাইলে আইডিইবি ভবনে ‘বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট এক্সপোতে ‘তালিকাভুক্ত কোম্পানির সুশাসন: বর্তমান অবস্থা ও করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। এর আয়োজক অনলাইন বিজনেস নিউজপোর্টাল অর্থসূচক ডটকম। সেমিনারে সেশন চেয়ার ছিলেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ এফসিএ এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইসিএবির সাবেক সভাপতি মাহমুদুল হাসান খসরু এফসিএ। প্রধান অতিথি ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

মূল প্রবন্ধে মাহমুদুল হাসান খসরু বলেন, অনেক সময় দেখা যায় কোম্পানিগুলো মানুষের টাকা নিয়ে বোনাস লভ্যাংশ দেয়। এটা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে আত্মীয় ও নিজেদের লোক বসানো হচ্ছে। তাতে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। এতে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বোর্ড ইচ্ছা করুক আর না করুক,  কোনো গভর্নেন্স কাজ করে না।

সেমিনারে আইসিএবির সাবেক সভাপতি ও শাইনপুকুর সিরামিকের সিইও হুমায়ুন কবীর বলেন, পুঁজিবাজারের জন্য আমরা যদি কার্যকর করপোরেট গভর্নেন্স চাই, তবে অন্যান্য দেশের প্র্যাকটিস বিবেচনায় নিতে হবে। আর এটা কোম্পানিগুলোতে বাস্তবায়ন করতে হবে। সেটা যদি না হয়, তবে কোনো লাভ নেই।

তিনি বলেন, বেশিরভাগ কোম্পানির পারিবারিক ব্যবসা হওয়ার কারণে মালিকানা ও ম্যানেজমেন্ট আলাদা হচ্ছে না। এটা কোম্পানির সুশাসনে বড় বাধার সৃষ্টি করছে। মনে রাখতে হবে, পেটে ক্ষুধা থাকলে কোনো করপোরেট গভর্নেন্সে কাজ হয় না।

তবে করপোরেট গভর্নেন্স শক্তিশালী করার জন্য বিনিয়োগকারীদেরও বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন বক্তারা। তাদের মতে, স্বতন্ত্র পরিচালকদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দেওয়া হলে করপোরেট সুশাসন সম্ভব নয়। এজন্য তিনি একটি নমিনেশন কমিটি গঠনের দাবি জানান; যারা বোর্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াবে।

অডিটরদের অডিট রিপোর্ট, স্বতন্ত্র পরিচালকের শক্ত ভূমিকা এবং পরিবারতন্ত্র হতে বের হয়ে আসতে পারলে কোম্পানিগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়বে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, কোম্পানির ম্যানেজমেন্টকে পরিচালকদের অবৈধ চাপ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। তাদের কাজের স্বাধীনতা থাকতে হবে। কোম্পানিতে করপোরেট গভর্নেন্স শক্তিশালী করে স্বাধীনভাবে স্বতন্ত্র পরিচালকদের কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

বিএসইসি কমিশনার স্বপন কুমার বালা বলেন, নতুন করপোরেট আইনে পরিবর্তন আসছে। কোম্পানির সুশাসন সংক্রান্ত বিষয়ে যে গ্যাপ রয়েছে, তা অনেকাংশ দূর হয়ে যাবে। কোম্পানির সুশাসন আরও সুদৃঢ় হবে।

স্বপন কুমার বালা বলেন, নতুন করপোরেট গভর্নেন্স আইনে অনেকগুলো বিষয় থাকছে। কোম্পানি ও তার ম্যানেজমেন্ট আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে যাতে কেউ কোনো সমস্যা করতে না পারে, নতুন আইনে সে বিষয়গুলো প্রাধান্য পাচ্ছে।

তিনি বলেন, কোম্পানির স্বতন্ত্র পরিচালক নির্বাচনের ক্ষেত্রে নানা পদ্ধতিতে আত্মীয়-স্বজনের যোগসাজশে অনেক কোম্পানি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। নতুন করপোরেট আইনে সে সুযোগ থাকবে না।

ভালো মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি আনার ক্ষেত্রে তিনি বলেন, আমরা মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে ইতোমধ্যে তাগিদ দিয়েছি ভালো মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি আনার ক্ষেত্রে। তারা ভালো আইপিও ইস্যু নিয়ে আসুক। রেগুলেটর আইপিও আনবেÑএমন চর্চা পৃথিবীর কোথাও নেই।

তিনি মার্জার নিয়ে বলেন, দুটি কোম্পানির মার্জার হওয়ার বিষয়টি এখন বেশ পরিচিতি পাচ্ছে। কোম্পানিগুলো হাইকোর্টে অনুমতি নিয়েই আবেদন করছে। তবে সেখানে অনেক সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। এসব সমস্যারও সমাধান হবে।

অনুষ্ঠানে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সদস্য সুলতান-উল-আবেদিন মোল্লা বলেন, সুশাসন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দরকার। কোম্পানিগুলোতে সুশাসন থাকলে সবাই উপকৃত হন। তিনি দেশের বিমা শিল্পের নানা দিক তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানে ডিবিএ’র সিনিয়র সহ-সভাপতি মোশতাক আহমেদ সাদেক বলেন, এখন বিনিয়োগকারীরা অডিটরদের অডিট রিপোর্টের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। এটা সম্ভব হলে পুঁজিবাজারের অবস্থা এমন হতো না।

তালিকাভুক্ত কোম্পানির রেগুলেটর হবে একমাত্র বিএসইসি। অনেক রেগুলেটরের সিদ্ধান্ত মানতে গিয়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাই ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এক্ষেত্রে সব রেগুলেটরের মধ্যে সমন্বয় থাকা উচিত বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।