সেলামির মজা

রহমত রহমান: ২০ রমজানের পর থেকে ক্ষণ-গণনা শুরু করতাম। ভাইবোন আর বাড়ির সমবয়সী খেলার সাথীদের নিয়ে খেলার ছলে চলতো আলোচনাÑকার কাছ থেকে কত ও কিভাবে ঈদ সেলামি আদায় করব।
ছোট্ট আর কচি মনের সতেজ ভাবনা শেয়ার করতাম। রাত হলে মা, বড় ভাই আর দাদা ভাইকে জিজ্ঞাসা করতাম, ঈদে কে কে আমাদের বাড়িতে আসবেন? দিন যেন ফুরোয় না! অনেক সময় রাতে ঘুমের মধ্যেও স্বপ্ন দেখতাম, সবাই সবাইকে সালাম দিচ্ছি, সবাই শুধু কড়কড়ে টাকা দিচ্ছে।
মায়ের কাছে বায়না ধরতাম, ঈদে নানুর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার। কারণ দাদু বাড়ির চেয়ে নানু বাড়িতে সেলামি বেশি পাওয়া যায়। মায়েরা চার বোন। ঈদের দিন না হলেও ঈদের পর খালা, খালু, খালাতো বোন, ভাই সবাই আসবে। নতুন টাকা পাবো, পকেট ভর্তি করব। সবার থেকে বেশি পাবো নানু আর দুই মামার কাছ থেকে। নানু আর দুই মামা সবচেয়ে বেশি আদর করতেন আমাকে।
দাদু বাড়ির সবচেয়ে বেশি টাকা পেতাম দাদির কাছ থেকে। তিনি বলতেন, তোর জšে§র পর তোর দাদা মারা গেছেন, ঈদের মাত্র দুদিন বাকি থাকতেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন দাদা। সে জন্য দাদি বলতেন, তোকে দেখার খুব শখ ছিল দাদার। দাদি সবার সামনে একবার, সবার পেছনে আরও একবার দাদার হয়ে সেলামি দিতেন। তিন চাচা, চাচি, দুই ফুফু সবাই সেলামি দিতেন। তবে দুই ফুফুকে বেশি পছন্দ করতাম না, বলে তারা কম টাকা দিতেন।
বড় ভাইয়ের বন্ধুরা আসলে টাকা দিতেন। দুই ভাইয়ের যেন শক্র ছিলাম তখনকার দিনগুলোয়। নিজেরা তো দিতোই না। উল্টো বলতেন, সেলামির নামে শিশুদের টাকা দেওয়া ভালো নয়, বখে যাবে। ভাবলেই হাসি পায় এখন, এসব নিয়ে ওদের মাঝে মধ্যে এখন খোটা দিই।
শুধু হিসাব আর হিসাব, কার থেকে কত টাকা পাব। এ টাকা দিয়ে কি করব? কোন টাকা কোথায় রাখব? দিন যেন আর শেষই হতে চায় না। ঈদ সেলামি পাওয়ার এমন আড্ডা, ভাবনা, আর ফন্দি-ফিকির চলতো চাঁদ রাত পর্যন্ত।
রমজান শেষ, আগামীকাল ঈদ। মসজিদের মাইকে মোয়াজ্জিনের এমন আওয়াজ শোনার পর চাঁদ রাতে আর ঘুম হতো না। সারা রাত দুই চোখের পাতা এক করতে পারতাম না। কখন সকাল হবে, কখন ঘুম থেকে উঠব, কখন ঈদগায়ের মাঠে যাব। এ ভাবনা ঘুরপাক খেতো মনে।
ভোর হলে গোসল করার দেরি আর ঈদ গায়ে যাওয়ার দেরি। বাবা, বড় ভাই, চাচা সবার কাছে দৌড়াতাম তাদের জায়নামাজ বহন করতে। জায়নামাজ বহন তো উছিলা। এ কাজের জন্য পয়সা বেশি দেবে। এ নিয়ে চলতো আমরা ছোটদের মধ্যে প্রতিযোগিতা। নামাজ শেষ হতে দেরি শুধু, সালাম দেওয়ার ধুম পড়ে যেত। পাঞ্জাবির দুই পকেট ভরে শুধু টাকা আর পয়সা নিতাম। বলা ভালো, আমাদের সময়ে টাকার মান ছিল বেশি। আমাদের অঞ্চলে ছোটদের ঈদ সেলামি হিসেবে সে সময় দেওয়া হতো ১০ পয়সা, ২৫ পয়সা ও ৫০ পয়সা। বড়জোর এক, দুই টাকা। বেশিরভাগ সময় বড়রা ঈদের আগেই কড়কড়ে নোট সংগ্রহ করে রাখতো। ২৫ পয়সা, ৫০ পয়সা ছিল বেশি। কড়কড়ে এক টাকা, দুই টাকা, পাঁচ টাকা আর ২০ টাকা নোট। বেশিরভাগই দিতেন ৫০ পয়সা অথবা এক টাকা। এক টাকায় বড় বাটার বান পাওয়া যেত। আর ২৫ পয়সায় দুই থেকে তিনটা লজেন্স। পকেট ভর্তি করে বাড়ি ফিরতাম।
ঈদ মাঠ শেষ করে বাজারের আনাচে-কানাচে খুঁজে বেড়াতাম আত্মীয়-স্বজনদের। দেখা মাত্রই পা ধরে সালাম। সালাম দেওয়ার পর সেকি আদর, দোকান থেকে কিছু কিনে দেওয়া। সে আদর আজও খুঁজি। তবে আদরের মাঝেই তাকিয়ে থাকতাম, কখন টাকা দেবে। এটা লোভ নয় ছোটবেলার এক ধরনের আনন্দ, মজা। বাড়ি গিয়ে মা, বড় বোন, চাচি আর ভাবিদের থেকে সেলামি না নিয়ে ছাড় নেই। ছোট্ট আর মায়াবি চেহারার কারণে সবার আদরটা যেন একটু বেশি পেতাম। সঙ্গে সেলামি। ঈদের দিন বোনের শ্বশুরবাড়ি না হয় নানু বাড়ি চলে যেতাম। নানু বাড়ি গিয়ে এমন ভান করতাম যে কেউ সেলামি দেয়নি। কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলতাম, একেবারে অল্প দিয়েছে। বোন আর ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে কেউ আসলে তো কথাই নেই। সেলামি দিতেই হবে। সেলামির টাকা জমা রাখতাম সবচেয়ে বিশ্বস্ত আর আদরের মেঝ আপুর কাছে। ছোট বলে গুনে মেলাতে পারতাম না, কত টাকা পেয়েছি। আপু গুনে দিতেন। ঈদের দিন বাড়ির সমবয়সী সবার সঙ্গে বসে হিসাব করতাম, কে কত টাকা পেয়েছে। নিজেরটা কম হলে কেঁদে বুক বাসাতাম। মা সব সময় আমার জন্য আঁচলে কিছু পয়সা বা টাকা বেঁধে রাখতো। যদি দেখেন কান্না করছি, সবার অগোচরে হাতে গুজে দিতেন।
ঈদ সেলামির টাকা দিয়ে কি করব আগেই ঠিক করে রাখতাম। ঘরের বাঁশ ছিদ্র করে ব্যাংক বানিয়ে পয়সাগুলো রেখে দিতাম। আর টাকাগুলো কখনও মায়ের কাছে, কখনও বোনের কাছে রাখতাম। প্রতিদিনই তাদের বলতাম টাকা ঠিক মতো আছে কি-না? নেশার মধ্যে একটাই ছিল, আইসক্রিম খাওয়া। আইসক্রিমওয়ালা আসলে সামান্য কিছু দিয়ে আইসক্রিম কিনে খেতাম। স্কুলে নিয়ে যেতাম। সামান্য পয়সা বা এক টাকা হলেও অনেক যতœ করে রাখতাম। কারণ সেলামির টাকা। আর প্রতিদিনই হিসাব নিতাম, কত টাকা আছে। জিজ্ঞাসা করতাম, টাকা শেষ হচ্ছে কেন? ঈদের আমেজ হয়তো সাত, ১০ দিন পর চলে যেত। কিন্তু ঈদ সেলামির আমেজ যেন ছোট্ট মন থেকে যেতে চাইতো না।
আজও তাই ছোট্টবেলার ঈদ সেলামির সে আমেজ খুঁজতে স্মৃতি হাতড়ে বেড়াই।