হোম প্রচ্ছদ সোনালি পোলট্রির নগরী জয়পুরহাট

সোনালি পোলট্রির নগরী জয়পুরহাট


Warning: date() expects parameter 2 to be long, string given in /home/sharebiz/public_html/wp-content/themes/Newsmag/includes/wp_booster/td_module_single_base.php on line 290

উত্তরের বিভিন্ন জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবর্তিত হচ্ছে বিভিন্ন খাত ঘিরে। এসব খাত একদিকে অবদান রাখছে জেলাগুলোর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখছে। উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডভিত্তিক এসব খাত নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের তৃতীয় পর্ব

নাজমুল হুসাইন: যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাবে জয়পুরহাটে উল্লেখযোগ্য  কোনো শিল্প বিকশিত হয়নি। শিল্পায়নের চাকা যেটুকু ঘুরে এখানে, তা শুধু সরকারি সুগার মিলে। তাও রুগ্ণ অবস্থায় চলছে দীর্ঘদিন। ১৯৬৮ সালে প্রথম জামালগঞ্জে কয়লা এবং জয়পুরহাটে সদর উপজেলায় চুনাপাথরের খনি মিললেও তা স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখেনি। সব মিলে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত কৃষি ও প্রাণিসম্পদের মিশ্র অর্থনৈতিক উপার্জনই ছিল জেলাটির অর্থনীতির মূল ভরসা।

দীর্ঘ সময় পর পোলট্রি শিল্প স্বপ্ন দেখায় সেই জয়পুরহাটকে। এ জেলায় অবস্থিত দেশের বৃহত্তম হাঁস-মুরগির খামার ১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও নব্বইয়ের দশকে এসে স্থানীয়দের ভাগ্য পরিবর্তন করতে শুরু করে। বিশেষ করে সেখানে ফাউমি জাতের মুরগির সঙ্গে আরআইআর মোরগের মিলনের মাধ্যমে ‘সোনালি’ নামের নতুন জাত উৎপাদনের পরে তা ওই এলাকায় বেশ জনপ্রিয় হতে থাকে।

সোনালি জাতের মুরগি দেখতে দেশি মুরগির মতো হওয়ায় এর চাহিদা ও দাম  পেতে থাকেন স্থানীয় খামারীরা। শুরু হয় নতুন বিপ্লব। এতে ধীরে ধীরে ওই মুরগি পালনে ঝোঁকে সারা জেলার মানুষ। আর উন্নত এ সোনালি জাতের উৎপাদন বেড়ে যেতে থাকে বহুগুণ। সোনালি পোলট্রিতে সমৃৃদ্ধ হতে থাকে জয়পুরহাটের অর্থনীতি।

এতেই জয়পুরহাট এখন দেশের পোলট্রি জোন হিসেবে চিহ্নিত। বছরে প্রায় তিন কোটি ৮১ লাখ মুরগি উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে জেলাটির। আর এখানে সামগ্রিক পোলট্রি খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ছাড়িয়েছে হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে জেলায় পোলট্রিনির্ভর প্রচুর শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। এছাড়া দেশের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার পোলট্রি মুরগির বাজার জেলাটির দখলে।

সংশ্লিষ্টরা আরও বলছে, জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এখন পোলট্রি শিল্পের সঙ্গে জড়িত। জয়পুরহাটে বর্তমানে চার হাজার বড় হাঁস-মুরগির খামার গড়ে উঠেছে। এছাড়া ছোট ও মাঝারি মিলে বসতবাড়িতে পোলট্রি ফার্মের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। এতে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ সোনালি জাতের মুরগি এসব খামারে উৎপাদিত।

জেলার প্রাণিসম্পদ অফিস বলছে, মুরগির খামারের পাশাপাশি পোলট্রি সংশ্লিষ্ট প্রচুর প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এখানে। বর্তমানে জেলায় ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর জন্য ৩৯টি হ্যাচারি চালু রয়েছে। পাশাপাশি আরও ১৫টি নতুন হ্যাচারি চালু হওয়ার পথে। বর্তমানে এসব হ্যাচারি থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৭০ লাখ মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবদুস সালাম শেয়ার বিজকে বলেন, দেশের গাজীপুরের পরেই পোলট্রি শিল্পের সব থেকে বড় কারবার এখানে। সারা দেশে বিক্রীত সোনালি জাতের মুরগির ৮০ শতাংশই সরবরাহ হচ্ছে আমাদের খামার থেকে। সম্ভাবনাময় এ শিল্পের দ্রুত উত্থানে উৎসাহিত হয়ে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে নতুন নতুন পোলট্রি ফার্ম। ফলে জেলার প্রধান অর্থনীতি এখন পোলট্রিনির্ভর।

জামালগঞ্জের সরকারি হাঁস-মুরগির খামার সূত্রে জানা গেছে, ফাউমি জাতের মুরগির সঙ্গে আরআইআর মোরগের মিলনের মাধ্যমে সোনালি জাতের মুরগি প্রথম জয়পুরহাটের উৎপাদন করা হয়। ফলে এ জাতটি এখানকার স্থানীয় জাত। সোনালি জাতের উৎপাদন করায় এ জেলায় মুরগির উৎপাদন বেড়ে গেছে বহুগুণ। সরকারিভাবে আরও সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া হলে জয়পুরহাটে মুরগির ব্যবসায় একটি মাইলফলক তৈরি করবে।

সরেজমিন জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি বাড়িতেই একটি-দুটি ফার্ম গড়ে উঠেছে। এছাড়া প্রতিটি এলাকায় এক থেকে পাঁচ-সাত তলা বিশিষ্ট খামার রয়েছে। যেখানে এক হাজার থেকে ২০ হাজার পর্যন্ত মুরগি পালন হচ্ছে মাংস ও ডিমের জন্য। এছাড়া জয়পুরহাটের বিসিক এলাকায় প্রচুর পোলট্রি হ্যাচারি, ফিড মিল গড়ে উঠেছে। বিসিকের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই পোলট্রি সংশ্লিষ্ট।

বাচ্চা উৎপাদনসহ জেলাটি এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে পোলট্রির খাবার উৎপাদনেও। এ পর্যন্ত জেলায় ১১টি ফিড মিল গড়ে উঠেছে। এসব ফিড মিলগুলোর উৎপাদনক্ষমতা দৈনিক সর্বোচ্চ ৯০ টন পর্যন্ত। সব মিলে মাসে প্রায় ১২ হাজার টন পোলট্রি খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে এ জেলায়। দেশের বড় কয়েকটি ব্যবসায়িক গ্রুপ এসব প্রতিষ্ঠান তৈরিতে বিনিয়োগ করছে। ফলে পদ্মা ফিড, সালেহা ফিড, স্বর্ণা-কিষান, রাফিদ, বিজলী ও পল্লী ফিডের মতো ব্র্যান্ডগুলো এখন জয়পুরহাটের নিজস্ব পোলট্রি খাদ্য।

জেলার উদীয়মান এ শিল্পে লক্ষাধিক মানুষের কর্মস্থল হয়েছে। সারা জেলাজুড়ে বাচ্চা, ডিম, ফিড এবং পোলট্রির ওষুধের কয়েক হাজার দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ শিল্পকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির কয়েকশ প্রতিনিধি জেলাটিতে সরবরাহ কাজে জড়িত রয়েছে। পোলট্রি শিল্পের ওষুধ খাতে সর্ববৃহৎ বাজার এখন জয়পুরহাট। ফলে ওষুধ প্রস্তুতকারকদের নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ এখানে। ইতোমধ্যে সৌদি বাংলা এগ্রোভেট এখানে একটি প্রিমিক্স উৎপাদনের কারখানা চালু করেছে।

জানতে চাইলে জয়পুরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জিয়াউল হক বলেন, পোলট্রি এ জেলার অর্থনীতির প্রাণ। জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এখন দুই-তৃতীয়াংশই এ খাতের ওপর নির্ভর করছে। দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপ পোলট্রি খাতে বিনিয়োগ করছেন জয়পুরহাটে।  পোলট্রি সংশ্লিষ্ট প্রচুর প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যা অন্য কোনো খাতে নেই।