প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

সোয়া ছয় বছরে মেট্রোরেলের অগ্রগতি সাড়ে ২৩ শতাংশ

ইসমাইল আলী: রাজধানীর যানজট হ্রাসে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণকাজ চলছে। ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় সরকার। আট প্যাকেজে ভাগ করে প্রকল্পটির জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শুধু একটি প্যাকেজের কাজ শেষ হয়েছে। বাকিগুলোর অগ্রগতি অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এতে সোয়া ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র সাড়ে ২৩ শতাংশ।
সূত্রমতে, মেট্রোরেল নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার জন্য সংশোধিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে সরকার। এক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ে উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশের নির্মাণকাজ ২০১৯ সালের মধ্যে শেষ করার কথা রয়েছে। তবে মার্চ পর্যন্ত এ অংশের অগ্রগতি ৩৭ শতাংশ। আর ২০২০ সালের মধ্যে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশ চালুর কথা রয়েছে। যদিও ওই অংশের অগ্রগতি মাত্র চার শতাংশ। ফলে নির্ধারিত সময়ে কোনো অংশের নির্মাণকাজই শেষ হচ্ছে না। মেট্রোরেল প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল প্রকল্পের ১নং প্যাকেজের আওতায় রয়েছে উত্তরায় ডিপোর ভূমি উন্নয়ন। ২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বরে এ প্যাকেজের চুক্তি সই হয়। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে এ প্যাকেজের কাজ সম্পন্ন হয়। আর ২নং প্যাকেজের আওতায় ডিপোর নির্মাণকাজ চলছে। ২০১৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর এ প্যাকেজের চুক্তি সই হয়। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এ অংশের অগ্রগতি ২৪ দশমিক ৭১ শতাংশ। যদিও আগামী জুনের মধ্যে এ অংশের নির্মাণকাজ শেষ করার কথা রয়েছে।
প্রকল্পটির ৩ ও ৪নং প্যাকেজের মধ্যে উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট (উড়ালপথ) ও ৯টি স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০১৭ সালের ১ আগস্ট এ প্যাকেজের কাজ শুরু হয়। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এ প্যাকেজের অগ্রগতি ৩৭ শতাংশ। এ দুই প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে থাইল্যান্ডভিত্তিক ইটাল-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। এ অংশটি ২০১৯ সালের মধ্যে উদ্বোধনের কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা শেষ হচ্ছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পটির সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, প্যাকেজ দুটির আওতায় চেক বোরিং, টেস্ট পাইল ও মূল পাইল সম্পন্ন হয়েছে। ৭৬৬টি পাইল ক্যাপের মধ্যে ৫৮২টি সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া ৩৯৩টি পিয়ার হেডের মধ্যে ২৬৪টি, ১০৮টি আই-গার্ডারের মধ্যে ৮১টি, চার হাজার ৫৭৭টি প্রিকাস্ট সেগম্যান্ট কাস্টিংয়ের মধ্যে দুই হাজার ২৮৬টি সম্পন্ন হয়েছে। আর ভায়াডাক্ট দৃশ্যমান হয়েছে তিন কিলোমিটার। কবে নাগাদ পুরো কাজ শেষ হবে তা নিশ্চিত নন প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে মেট্রোরেলের ৫নং প্যাকেজের আওতায় আগারগাঁও থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত প্রায় তিন দশমিক ১৯৫ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট এবং বিজয় সরণি, ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকায় তিনটি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এ অংশের কাজ যৌথভাবে করছে জাপানের টেকেন করপোরেশন, অ্যাবে নিক্কো ও বাংলাদেশের আবদুল মোনেম লিমিটেড।
গত বছর ১ আগস্ট শুরু করা এ প্যাকেজের অগ্রগতি মাত্র চার শতাংশ। এ প্যাকেজের প্রকল্প এলাকার পরিষেবা সংযোগ লাইন স্থানান্তর ও চেক বোরিং সম্পন্ন হয়েছে। ২১০টি ট্রায়াল পিটের মধ্যে ৭৭টি, ৪৫২টি বোরড্ পাইলের মধ্যে ২৬টি ও ১০৮টি পাইল ফাউন্ডেশনের মধ্যে আটটি সম্পন্ন হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে এ অংশের কাজ শেষ হচ্ছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
মেট্রোরেলের ৬নং প্যাকেজের আওতায় কারওয়ান বাজার থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রায় চার দশমিক ৯২ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট নির্মাণ করা হবে। এছাড়া শাহবাগ, টিএসসি, প্রেস ক্লাব ও মতিঝিলে চারটি মেট্রো স্টেশনও নির্মাণ করা হবে। এ অংশের কাজ যৌথভাবে করছে জাপানের সুমিতোমা মিতসুই কনস্ট্রাকশন কোম্পানি ও ইটাল-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি।
২০১৮ সালের আগস্টে শুরু করা প্যাকেজটির অগ্রগতি চার শতাংশ। এ প্যাকেজের প্রকল্প এলাকার পরিষেবা সংযোগ লাইন স্থানান্তর ও চেক বোরিং সম্পন্ন হয়েছে। ১৬০টি ট্রায়াল পিটের মধ্যে ৬৫টি, ৬৫২টি বোরড্ পাইলের মধ্যে ৭০টি ও ১৩৮টি পাইল ফাউন্ডেশনের মধ্যে ১৭টি সম্পন্ন হয়েছে গত মার্চ পর্যন্ত। ২০২০ সালের মধ্যে এ অংশের কাজও শেষ হচ্ছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ৭নং প্যাকেজের আওতায় মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোয় ওঠানামার জন্য চলন্ত সিঁড়ি ও লিফট, প্রায় ২০ কিলোমিটার রেলওয়ে ট্র্যাক, স্বয়ংক্রিয় ভাড়া আদায় ব্যবস্থাপনা, ১৩২ কেভি বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন ও ট্রেনে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেম, প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর প্রভৃতি স্থাপন করা হবে। এর কাজ করছে জাপানের মারুবিনি করপোরেশন ও ভারতের এলঅ্যান্ডটি (লারসন অ্যান্ড তুবরো)।
২০১৮ সালের ১১ জুলাই প্যাকেজটির কাজ শুরু হয়েছে। গত মার্চ পর্যন্ত এ অংশের অগ্রগতি সাত শতাংশ। প্যাকেজের আওতায় থাকা বিভিন্ন যন্ত্রাংশ বিভিন্ন দেশে তৈরি হচ্ছে। তবে কবে নাগাদ তা দেশে এসে পৌঁছাবেÑতা নিশ্চিত নয়। দেশে আসার পর এসব অংশ স্থাপন শুরু করা হবে।
এদিকে ৮নং প্যাকেজের আওতায় মেট্রোরেলের জন্য রোলিং স্টক (ইঞ্জিন-কোচ) ও ডিপো ইকুইপমেন্ট সরবরাহ করছে জাপানের কাওয়াসাকি-মিতসুবিনিশি কনসোর্টিয়াম। এর মধ্যে ২৪ সেট ট্রেন ও ডিপো ইকুইপমেন্ট ছাড়াও ট্রেন সিমুলেটর, খুচরা যন্ত্রাংশ ও সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০১৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর এ প্যাকেজের বাস্তব কাজ শুরু হয়। গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত এ অংশের অগগ্রতি ১৩ শতাংশ।
জানতে চাইলে মেট্রোরেল প্রকল্পের পরিচালক মো. আফতাবউদ্দিন তালুকদার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, মেট্রোরেলের বিভিন্ন অংশের ঠিকাদার নিয়োগে দরপত্র মূল্যায়নেই অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়। এর মধ্যে একটি প্যাকেজের দরপত্র মূল্যায়নে সময় লাগানো হয় ৩৩ মাস। অথচ এ সময়ে প্যাকেজটির নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। এজন্য মূলত মেট্রোরেলের সাবেক প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টরা দায়ী। যদিও এ বিষয়ে তাদের শোকজ করা হয়নি।
উল্লেখ্য, মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা দিচ্ছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। বাকি পাঁচ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা সরকারের তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে।

সর্বশেষ..



/* ]]> */