সৌরবিদ্যুতের দাম নিয়ে অস্বস্তিতে সরকার: ইউনিটপ্রতি দাম পড়ছে ১৭-১৮ টাকা

# ইউনিটপ্রতি দাম পড়েছে ১৭-১৮ টাকা # ভারতে দাম সর্বোচ্চ সাড়ে পাঁচ রূপী

 

ইসমাইল আলী: ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবেও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দিচ্ছে সরকার। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতে বেশ কিছু সোলার পার্ক কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। তবে এসব কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় ধরা হয়েছে ইউনিটপ্রতি ১৭-১৮ টাকা। যদিও বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় সাড়ে পাঁচ টাকা। এছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বিভিন্ন সোলার পার্কে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে সর্বোচ্চ সাড়ে পাঁচ রুপি বা ছয় টাকা ৮৪ পয়সা।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) স্টাডি অন এনার্জি সিকিউরিটি শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে সহায়তা করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রাইসওয়াটারহাউসকুপারস (পিডব্লিউসি)। এডিবির কারিগরি সহায়তার আওতায় এর চূড়ান্ত খসড়া প্রতিবেদন জমা দিয়েছে সংস্থাটি।

এতে বলা হয়েছে, কুড়িগ্রামের ধরলা সেতুর পূর্ব প্রান্তে নির্মাণ করা হচ্ছে ২০ মেগাওয়াট সোলার পার্ক। ইটার্ন-সিসিসিই-হ্যারোন কনসোর্টিয়ামের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় পড়ছে ১৭ টাকা। একই ব্যয় পড়ছে টেকনাফে নির্মাণাধীন ২০০ মেগাওয়াট সোলার পার্কেও। সিঙ্গাপুরের সান এডিশন এনার্জি হোল্ডিং প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

ময়মনসিংহের ৩২ মেগাওয়াট সোলার পার্ক যৌথভাবে নির্মাণ করছে সান এডিসন-পাওয়ার পয়েন্ট-হাওর বাংলা-কোরিয়া গ্রিন এনার্জি। এতেও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় পড়ছে ১৭ টাকা। আবার জামালপুরের তিন মেগাওয়াট সোলার পার্কে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় পড়ছে ১৮ টাকা। এটি নির্মাণ করছে ইনগ্রিন-সরিষাবাড়ী সোলার পাওয়ার।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভারতের কর্নাটকে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াটের সোলার পার্ক স্থান করা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে ৫ রুপি। ঝাড়খণ্ডে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াটের সোলার পার্কে ব্যয় হচ্ছে পাঁচ দশমিক ৩৬ রুপি। এছাড়া মধ্যপ্রদেশে চার দশমিক ৪৬ রুপি, উত্তরপ্রদেশে চার দশমিক ৭৮ ও রাজস্থানে চার দশমিক ৩৫ রুপি ব্যয় হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে। তবে দেশটিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় চার দশমিক ৮০ রুপি বা ছয় টাকার কিছু কম।

এদিকে পাকিস্তানেও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাংলাদেশের চেয়ে কম। এর মধ্যে নর্দার্ন পাকিস্তানে সোলার পার্কে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় পড়ছে ১১ দশমিক ৫৩ সেন্ট বা ৯ টাকা ২২ পয়সা। আর সাউদার্ন পাকিস্তান সোলার পার্কে ব্যয় হচ্ছে ১০ দশমিক ৮৯ সেন্ট বা আট টাকা ৭১ পয়সা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় সাড়ে পাঁচ টাকা। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোয় ব্যয় হয় ইউনিটপ্রতি দুই থেকে আড়াই টাকা। এরপর রয়েছে কয়লা ও ফার্নেস অয়েল। এ দুই জ্বালানিতে উৎপাদন ব্যয় পড়ছে ৮-৯ টাকা। আর ডিজেলে ব্যয় পড়ছে ২০ টাকার মতো। শুধু ডিজেলের কারণেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি পড়ছে। এজন্য আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে ২০২১ সালে এক হাজার ৪০৩ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ২৩ শতাংশ সরকারি জমিতে ও সরকারি মালিকানায়, ২৭ শতাংশ সরকারি জমিতে তবে বেসরকারি মালিকানায় এবং ৫০ শতাংশ বেসরকারি জমিতে ও বেসরকারি মালিকানায় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এক্ষেত্রে ২০১৬ সালে ২৫৩ মেগাওয়াট, ২০১৭ সালে ১৯০, ২০১৮ সালে ২০০, ২০১৯ সালে ১৮০, ২০২০ সালে ১৯০ ও ২০২১ সালে ১৯৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। অথচ এ খাতে ব্যয় হচ্ছে ১৭-১৮ টাকা। ফলে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ মূল্য বেড়ে যাবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে ইডকলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নির্বাহী এম ফাওজুল কবির খান বলেন, সৌরবিদ্যুৎই আমাদের ভবিষ্যৎ। তবে বাংলাদেশে জমিস্বল্পতা থাকায় চেষ্টা করতে হবে সৌর প্যানেল যে জমিতে বসানো হচ্ছে, সে জমি পতিত ফেলে না রেখে বিকল্প ব্যবহারের উপায় উদ্ভাবন। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানো যাবে। এছাড়া সারা বিশ্বে সৌরবিদ্যুতের প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হচ্ছে; ফলে সৌর প্যানেলগুলোর দক্ষতাও বাড়ছে। এতে অল্প জায়গায় বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে। এতেও ব্যয় আগামীতে কমানো যাবে।

বাণিজ্যিকভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্ভাব্য ব্যয় বিশ্লেষণও করা হয়েছে এডিবির প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, বিদ্যুৎ প্রকল্পের ঋণ-ইকুইটি অনুপাত হবে ৮০:২০। আর ব্যাংক সুদের হার ধরা হয়েছে ছয় শতাংশ। এছাড়া রিটার্ন অন ইকুইটি ধরা হয়েছে ১৫ শতাংশ। এতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি ব্যয় হবে ১৩ টাকা ১৭ পয়সা।

বাস্তবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে এর কাছাকাছি ব্যয় পড়ছে টেকনাফের ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে। জৌলুস পাওয়ার লিমিটেডের বাস্তবায়নাধীন কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ কেনায় ব্যয় হবে ১৪ টাকা।

ভারত-পাকিস্তানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কম হওয়ার কিছু কারণও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, দেশ দুটিতে উচ্চক্ষমতার সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে। পতিত জমির ব্যবহার ও জমি ইজারা দেওয়ার বিধানও রাখা হয়। এছাড়া কর অব্যাহতি ও ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, নিজ দেশে বিভিন্ন সোলার ইকুইপমেন্ট তৈরিÑএসব কারণে ভারত ও পাকিস্তানে ব্যয় কম হচ্ছে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস নিঃস্বরণে বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য। তবুও বর্তমান সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাত সরকারের সার্বিক সহযোগিতা পাবে।