স্টক বিভক্তি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম

মিজানুর রহমান শেলী: মাঝে মাঝেই আমাদের নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। জানতে চাওয়া হয় কেন বার্কশায়ার তার স্টক ভাঙে না। আর আমরা ভাবি, এ প্রশ্নের পেছনের কারণ কী হতে পারে? কেন তারা আমাদের কাছে এটা জানতে চায়, আমরা স্টক ভাংলে তাদের কী সুবিধা… প্রভৃতি। এ উত্থাপিত প্রশ্নের পেছনে আমাদের ধারণা হলো, স্টক ভাঙা মানেই প্রো-শেয়ারহোল্ডার কার্যক্রমকে জায়গা করে দেওয়া। এ অনুমানটি অবশ্য খুব বেশি চিন্তাপ্রসূত নয়; তবে ব্যবহারিক। কেননা, এ রকম চিত্র আমরা সব সময়ই দেখে থাকি। যাহোক, এ প্রশ্নে সহজ ও সোজাসাপ্টা জবাব হলো আমরা এ প্রস্তাবে সম্মতি দিতে পারি না। এখন প্রশ্ন করতে পারেন, কেন আপনারা সম্মতি দেবেন না? আমাদের বলুন।
হ্যাঁ, এ কথাটি আমি এর আগেও বলেছি, আমাদের অনেকগুলো উদ্দেশ্যের মধ্যে একটি হলো বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে তার স্টককে একটি ন্যায্য দরে যৌক্তিক উপায়ে বিক্রি করুক। আর এ ন্যায্যতা নিশ্চয়ই এর ইনট্রিনসিক ভ্যালুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। কিন্তু এখানে মনে রাখা জরুরি যে, এটা ‘যৌক্তিকভাবে সম্পর্কিত’, কোনোভাবেই তা ‘সাদৃশ্যপূর্ণ’ নয়। যদি বেশ ভালো মানের কোম্পানিগুলো সাধারণভাবে তার স্টক বাজারে নিজস্ব ভ্যালু থেকে একটি বড় ডিসকাউন্টে বিক্রি করতে থাকে, তবে বার্কশায়ার বেশি দর পাবে বলে আশা করা যেতে পারে একইভাবে। মনে রাখতে হবে, একটি স্টকের যৌক্তিক দর মানেই সেই স্টকের রয়েছে যৌক্তিক শেয়ারহোল্ডার। কার্যত শেয়ারহোল্ডারদের ন্যায্য চিন্তা আর চিন্তার গভীরতার ওপরই স্টকের ভাগ্য বহুলাংশে নির্ভর করে থাকে। আর এ দু’পক্ষই চলতি ও প্রত্যাশিত।
যদি কোনো কোম্পানির স্টকের হোল্ডার এবং/অথবা প্রত্যাশিত ক্রেতা এর প্রতি আকৃষ্ট হন, তবে তিনি বা তারা অযৌক্তিক বা আবেগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রতিই খুব বেশি প্রবণতা দেখিয়ে থাকেন। কিছুটা লোভনীয় কিন্তু যৎসামান্য স্টক দর পর্যায়ক্রমে সামনে আসাতে থাকে। খেদোন্মত্ত আর হতাশ ব্যক্তিত্ব কেবল খেদোন্মত্ত-হতাশ মূল্য উৎপাদন করে থাকে। আর এ পরিস্থিতিটা নিশ্চয়ই কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়। এটি একটি মাতাল দশা। এই মাতাল দশা আমাদের অন্য কোম্পানির স্টক কিনতে যেমন সাহায্য করে, তেমনি বিক্রি করতেও সহায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু আমরা মনে করি, এর সবকিছুই কেবল আপনাদের স্বার্থেই যায়। আর আমরা কেবল বাজারের এসব দুর্বিপাক দশাকে মিটমাটের চেষ্টা করে থাকি। এতে আমাদের স্বার্থ হলো বার্কশায়ারের স্বার্থ। বাজারে মাতাল দশা বার্কশায়ারের জন্য শুভকর নয়। ন্যায্য ও অযৌক্তিক দশাই কেবল বার্কশায়ারের জন্য মঙ্গল কিছু বয়ে আনতে পারে।
আবার কেবল উচ্চ গুণমানসম্পন্ন শেয়ারহোল্ডার অর্জন করা মানেই ঘোড়ার লাগাম বাগিয়ে নেওয়া নয়। এখানে মিস্টারস এস্টরের কথা বলা যাক: তিনি ৪০০টি তার নিজের জন্য লুফে নিতে পারতেন; কিন্তু যে কেউই তো যে কোনো স্টক খরিদ করতে পারেন। শেয়ারহোল্ডার ক্লাবে প্রবেশকারী কোনো সদস্য তার বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, আবেগের ভারসাম্য, নৈতিক সহিষ্ণুতা বা পোশাক-আশাকের হালচালের কারণে চিহ্নিত হতে পারেন না। তাই শেয়ারহোল্ডার এজেন্সিগুলো আশাহত দায়দায়িত্ব গ্রহণকারী কোনো সংস্থা বলে মনে হতে পারে। তাদের চোখে-মুখে কোনো আশার আলো ফুটবে না, কেবলই হতাশায় তারা আচ্ছন্ন হয়ে থাকবেন।
যাহোক, আমরা বিশ্বাস করি, যদি আমরা বিরামহীনভাবে ব্যবসা ও মালিকানা দর্শন নিয়ে কাজ করতে থাকি, যোগাযোগ স্থাপন করি, তবে বৃহৎ পরিসরে উচ্চ গুণমানসম্পন্ন মালিকানাস্বত্ব সবার দৃষ্টি কাড়বে এবং তা খুব ভালোভাবে নিয়ন্ত্রিত হতে থাকবে। তবে এ মালিকানা দর্শনের সঙ্গে কোনো দ্বান্দ্বিক বার্তা থাকতে পারবে না। তাতে বিপরীত হতে পারে। যাহোক, যদি এই সাংঘর্ষিক বার্তাকে ঠেকাতে পারি, তবে স্বনির্বাচন প্রক্রিয়া এ ব্যবস্থাকে অনুসরণ করতে থাকবে। আর সেটাই হতে দেওয়া উচিত, হতে থাকুক। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি স্বনির্বাচন একটি বিশাল স্বতন্ত্র কোলাহল বয়ে আনবে। এ কোলাহল একটি গানের উৎসবের কাছে জড়ো হবে, যে গানের উৎসব কোনো অপেরা বা সিনেমা হলে হবে বলে আগে থেকেই প্রচার করা হয়েছে। তবে হ্যাঁ, কোনো ব্যক্তি যদি এ রকম কোনো অপেরাই রক কনসার্টের আয়োজন করার প্রচার মাইকে কোলাহলটিকে আসতে বলে, তবে নিশ্চয়ই সে কোলাহল সেখানে পৌঁছাবে না। এমনকি কোনো একজনও একটি টিকিট কিনবে কিনা, তা এ দুটি অপশনের ওপর নির্ভর করবে।
যেহেতু আমাদের নীতি ও যোগাযোগ হলো আমাদের বিজ্ঞাপন, তাই আমরা বিনিয়োগকারীদের সব সময় আকৃষ্ট করতে থাকি। এই বিনিয়োগকারীরা বিজ্ঞাপন দেখেই আমাদের পরিচালনা কাঠামোকে বিচার করতে পারবে। এমনকি নিশ্চয়ই তারা আমাদের পরিচালনা প্রণালি ও কাঠামো দেখে সন্তুষ্ট হবে এবং আমাদের কাছে আসবে। এমনকি তারা আমাদের আচার-আচরণ ও আশা-আকাক্সক্ষাও পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাবে। আর তখন আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব ওইসব বিনিয়োগকারী হতে মুখ ফিরিয়ে নিতে, যারা এসবের প্রতি আকৃষ্ট হবে না। কেননা, আমরা তখন বুঝতে পারব কারা বিচক্ষণ, কারা পরিচালনা কাঠামো ও প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে বিনিয়োগে আসতে চায়; তারা নিশ্চয়ই বিচক্ষণ বিনিয়োগকারী। আমরা ঠিক তাদেরই চাই, যারা নিজেদের ব্যবসার মালিক বলে মনে করেন। একজন বিনিয়োগকারীর যদি ব্যবসার মালিকানাবোধ না থাকে, তবে তাকে দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অভিযাত্রায় নামা সম্ভব হয় না এ বিষয়টি আমি এর আগেও বিশদভাবে আলোচনা করেছি। বস্তুত এসব বিনিয়োগকারীই একটি কোম্পানিতে বিনিয়োগের সময় একজন মালিকের মতো ব্যবসার উত্থান-পতনের সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকতে পারেন। এমনকি বিনিয়োগের প্রাথমিক লক্ষ্যে তারা দীর্ঘ মেয়াদে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়ে যাত্রা করেন। আবার একই সঙ্গে আমরা তাদের আমাদের সঙ্গে বিনিয়োগকারী হিসেবে পেতে চাই, যারা নিয়মিত তাদের চোখজোড়া ব্যবসার ফলের ওপর রাখতে থাকেন। আর যেসব বিনিয়োগকারী তাদের চোখজোড়া বাজারদরের ওপর রাখেন, আমরা তাদের আমাদের ব্যবসায় অংশীদার হিসেবে নিতে চাই না। তারা আমাদের সতীর্থ বিনিয়োগকারী হতে পারেন না।
হ্যাঁ, এটা সত্য যে, এ গুণ-বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বিনিয়োগকারী সচরাচর খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা সংখ্যায়ও বিরল। কিন্তু আমাদের সফলতার মানদণ্ড হলো আমরা ঠিক এই ভালোমানের বিনিয়োগকারী খুঁজে পাচ্ছি কি-না। বিনিয়োগকারীদের নিয়ে এমন ব্যতিক্রমী সংগ্রহ আমাদের আছে কিনা এসব প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলব, আমরা সফল। আমাদের ঠিক এ রকমই একটি বিশাল সংগ্রহশালা রয়েছে।
আমি খুব ভালো করেই বিশ্বাস করি, আমাদের শেয়ারের ৯০ শতাংশের বেশি, সম্ভবত তা ৯৫ শতাংশ শেয়ার এমন দীর্ঘমেয়াদি বিচক্ষণ উচ্চগুণসম্পন্ন বিনিয়োগকারীর হাতে রয়েছে। আর এরাই হলেন বস্তুত বার্কশায়ারের শেয়ারহোল্ডার। বার্কশায়ারে বিনিয়োগকারীদের মান ঠিক এ পর্র্যায়েই। হ্যাঁ, এরাই ছিলেন আজ থেকে আরও পাঁচ বছর আগে বার্কশায়ার কিংবা ব্লু-চিপের শেয়ারহোল্ডার। আর আমি ধারণা করি, আমাদের শেয়ারের ৯৫ শতাংশের বেশি বিনিয়োগকারীরা ধরে আছেন এ জন্য যে, তারা পরবর্তীকালে একেকটি শেয়ারকে দ্বিগুণের চেয়েও আরও বড় করে নেবেন। এর জন্য দীর্ঘ মেয়াদ তাদের কাছে কোনো সংকট নয়।

এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহ্যাম
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ