স্ট্রবেরির চাষাবাদ

শীতপ্রধান দেশগুলোর পাশাপাশি গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোয়ও জনপ্রিয় স্ট্রবেরি। ফলটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হলো

স্ট্রবেরি এক ধরনের ফ্র্যাগারিয়া-জাতীয় উদ্ভিদ। গাছটি দেখতে অনেকটা থানকুনি ও আলু গাছের মতো। এর পাতা বড় ও চওড়া হয়। এটি থানকুনি গাছের মতো রানারের মাধ্যমে চারা চারদিকে ছড়ায়। সারা বিশ্বে ফল হিসেবে চাষ করা হয় এটি।
স্ট্রবেরির পাকা ফল টকটকে লাল রঙের হয়। গন্ধ, বর্ণ ও স্বাদে অতুলনীয়। ফল, ফলের রস, জ্যাম, আইসক্রিম, মিল্ক শেকসহ আরও অনেক খাদ্য তৈরিতে ব্যবহƒত হয়। এছাড়া শিল্পায়িত খাদ্য তৈরিতে এর সুগন্ধি ব্যবহার করা হয়।
১৭৪০ সালে ফ্রান্সের ব্রিটানি অঞ্চলে সর্বপ্রথম চাষ করা হয়। এটি পরবর্তীকালে চিলি ও আর্জেন্টিনার পর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশেও এর চাষ হচ্ছে। বিশেষ করে রাজশাহী, যশোর, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, ময়মনসিংহ, সিরাজগঞ্জ প্রভৃতি জায়গায় ব্যবসায়িক ভিত্তিতে স্ট্রবেরি চাষ ও বাজারজাত হচ্ছে। যেসব এলাকায় শীত বেশি পড়ে, সেসব এলাকায় বারি স্ট্রবেরি-১ জাতের চাষ করা হচ্ছে। জমির পাশাপাশি টব, বাড়তি ছাদ বা বারান্দায় চাষ করা যায়।

মাটি ও জমি
ছায়ামুক্ত দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি, উঁচু ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধা রয়েছে এরূপ স্থান স্ট্রবেরি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। জমি ভালো করে পরিষ্কার করে ৩০ সেন্টিমিটার গভীর করে চাষ দিতে হবে। যেহেতু স্ট্রবেরি গাছের শিকড় মাটির ওপর দিকে থাকে, সেজন্য মাটি ঝুরঝুরা করে নির্ধারিত মাত্রায় সার মাটিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। যেসব জমিতে পানি জমে, সেখানে স্ট্রবেরি উৎপাদন করা যাবে না। মাটির ক্ষারতা ছয় দশমিকের মধ্যে থাকা ভালো। এটি চাষের আগে মাটির ক্ষারতা ও পুষ্টিমাত্রা পরীক্ষা করে সে অনুযায়ী চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া যাবে। ফলনের জন্য দিনের তাপমাত্রা ২০ থেকে ২৬ সেলসিয়াস থাকা ভালো। রাতের তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৬ সেলসিয়াস ভালো। দিনে কমপক্ষে আট ঘণ্টা সূর্যালোকের উপস্থিতি স্ট্রবেরী বৃদ্ধির জন্য ভালো।

রোপণ
স্ট্রবেরি চারা নভেম্বর মাস রোপণের জন্য সবচেয়ে ভালো সময়। তবে মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত রোপণ করা যায়। জমি তৈরির পর লাইনের দূরত্ব ৫০ সেন্টিমিটার ও প্রতি সারিতে ৩০ সেন্টিমিটার পরপর চারা লাগাতে হবে। এছাড়া প্রতি সারির মাঝখানে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

চারা তৈরি
স্ট্রবেরির চারা ভালো মানের নার্সারি থেকে সংগ্রহ করতে হবে। কারণ স্ট্রবেরির চারা এখনও তেমন সহজলভ্য নয়। এটি গুল্মজাতীয় গাছ, তাই গোড়া থেকে বেশ কিছু লম্বা লতা বেরিয়ে আসে। বেরিয়ে আসা লতার গিঁট মাটির সংস্পর্শে এসে শেকড় গজিয়ে চারায় পরিণত হয়। এই শিকড়যুক্ত গিঁট মাটিতে পুঁতে নতুন চারা তৈরি করা হয়। অর্ধেক মাটি, অর্ধেক গোবর সার মিশিয়ে পলিব্যাগে ভরে একটি করে শিকড়যুক্ত গিঁটসহ লতা পুঁতে দিতে হয়। একটি স্ট্রবেরি গাছ থেকে ১৮ থেকে ২০টি চারা উৎপাদন করা সম্ভব।

সার ও সেচ
স্ট্রবেরির জন্য প্রয়োজন জৈবসার। প্রতি একরে ৫০ থেকে ৬০ কেজি ইউরিয়া, ৭০ কেজি টিএসপি ও ৮০ কেজি এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। সার সমানভাগে ভাগ করে এক ভাগ ফুল আসার এক মাস আগে ও অন্য ভাগ ফুল ফোটার সময় দিতে হবে। ফল ধরা শুরু হলে দুই থেকে তিন দিন পর সেচ দিতে হবে। বৃষ্টি বা সেচের অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। স্ট্রবেরি জলাবদ্ধতা মোটেই সহ্য করতে পারে না।

রোগবালাই
পাতায় দাগ পড়া রোগ
এক ধরনের ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়। এতে ফলন ও ফলের গুণগত মান কমে যায়। এটি প্রতিকারের জন্য অনুমোদিত ছত্রাকনাশক সিকিউর বা রিডোমিল্ড গোল্ড প্রতি লিটার পানির সঙ্গে দুই গ্রাম মিশিয়ে সাত থেকে ১০ দিন পরপর দুই থেকে তিনবার স্প্রে করতে হবে।

ফল পচা রোগ
এ রোগের আক্রমণে ফলের গায়ে জলে ভেজা বাদামি বা কালো দাগের সৃষ্টি হয়। দাগ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এতে ফল খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এজন্য ফল পরিপক্ব হওয়ার আগে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক নোইন-৫০ ডব্লিউপি অথবা ব্যাভিস্টিন ডিএফ নামে ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানির সঙ্গে দুই গ্রাম মিশিয়ে সাত থেকে ১০ দিন পরপর দুই থেকে তিনবার স্প্রে করতে হবে।

পোকামাকড়

পোকামাকড়ের কামড়ে পাতা তামাটে বর্ণ ও পুরু হয়ে যায়। আস্তে আস্তে কুঁচকে যায়। গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। ফলে ফলন ক্ষমতা ও গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ জন্য ভারটিমেক নামের মাকড়নাশক প্রতি লিটার পানির সঙ্গে এক মিলিলিটার মিশিয়ে ১০ দিন পরপর দুই থেকে তিনবার স্প্রে করতে হবে। এছাড়া পাখি স্ট্রবেরির সবচেয়ে বড় শত্রু। ফল আসার পর সম্পূর্ণ পরিপক্ব হওয়ার আগেই পাখির উপদ্রব শুরু হয়। এ জন্য ফল আসার পর সম্পূর্ণ বেড় জাল দিয়ে ঢেকে দিতে হবে, যাতে পাখি ফল না খেতে পারে।
অন্যান্য যত্ন
সরাসরি মাটির সংস্পর্শে এলে স্ট্রবেরির ফল পচে নষ্ট হয়ে যায়। এ জন্য চারা রোপণের ২০ থেকে ২৫ দিন পর স্ট্রবেরির বেড খড় বা কালো পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে তিন মিলিলিটার ডার্সবান-২০ ইসি ও ২ গ্রাম ব্যাভিস্টিন ডিএফ মিশিয়ে ওই দ্রবণে খড় শোধন করে নিলে উইপোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। জমি সব সময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে। গাছ লাগানোর পর তার গোড়া থেকে প্রচুর রানার বা কচুর লতির মতো লতা বের হতে থাকে। এগুলো জমি ঢেকে ফেলে। এতে ফলন ভালো হয় না। এজন্য ১০ থেকে ১৫ দিন পরপর কেটে ফেলতে হবে।

ফল সংগ্রহ
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে পাকতে শুরু করে স্ট্রবেরি। হলদে বা লালচে রঙের হতে শুরু করলে বোঝা যাবে ফল পাকা শুরু হয়েছে। ফল পুরো পাকলে লাল হয়ে যায়। তবে স্ট্রবেরি ফল বিক্রির জন্য পুরো লাল হওয়ার দরকার নেই। সেক্ষেত্রে ফলগুলো শক্ত থাকা অবস্থায় গাছ থেকে তুলতে হবে।

গরমেও

শীতপ্রধান দেশের ফল স্ট্রবেরি। শীতপ্রধান দেশগুলোয় ভীষণ জনপ্রিয় এটি। ওইসব দেশেই মূলত এর চাষ বেশি হয়। তবে আমাদের দেশের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশেও এর ফলন হচ্ছে। অর্থাৎ যে কোনো আবহাওয়ায় খাপ খাইয়ে নিতে পারে স্ট্রবেরি।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে চাষ হচ্ছে স্ট্রবেরির। এটি চাষের জন্য জায়গা কোনো বিষয়ই নয়। কেননা বড় কোনো জায়গা থাকলেও ঘরের বারান্দা কিংবা বাড়ির ছাদে ছোট্ট পরিসরে স্ট্রবেরি চাষ করা সম্ভব।
ঘরের বারান্দার পাশাপাশি লন কিংবা ছাদেও চাষ করা সম্ভব। যেখানে রোদ ঠিকই পড়ে কিন্তু তাপের তেজটা কম সেখানটি বেছে নিন। স্ট্রবেরির গাছ লাগানোর জন্য মাঝারি অর্থাৎ ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি আকারের টব বেছে নেওয়া ভালো। এছাড়া মাঝারি আকারের বালতি কিংবা টিনের কৌটাও ব্যবহার করতে পারেন। এসব পাত্রের নিচে ছোট্ট করে একটি ফুটো করে দিতে হবে যেন অতিরিক্ত পানি ভালোভাবে নিষ্কাশিত হতে পারে। সাধারণত একটি টবে একটি স্ট্রবেরি চারা লাগানো হয়।
অক্টোবর থেকে জানুয়ারির প্রথমার্ধ পর্যন্ত স্ট্রবেরি চাষের উত্তম সময়। এ সময়ের পরেও স্ট্রবেরি চাষ করা যায়।

পুষ্টিগুণ

স্ট্রবেরিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে। এ উপাদানটি আমাদের শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। দেহে ভিটামিন সি’র ঘাটতি থাকলে দিনে এক কাপ স্ট্রবেরি খেতে পারেন

এর ফাইটোকেমিক্যালস আমাদের মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালন ভালো করে

হৃদপিণ্ড সুস্থ রাখে

এতে থাকা ভিটামিন ‘কে’ ও পটাশিয়াম হাড়ের সুরক্ষা করে

এর শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়তা করে

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে

স্ট্রবেরিতে প্রচুর পরিমাণে পানি ও আঁশ রয়েছে, ফলে কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর হয়

ডায়াবেটিস রোগেও উপকারী স্ট্রবেরি

স্ট্রবেরিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফলিক অ্যাসিড, যা গর্ভবতীদের জন্য উপকারী

অতিরিক্ত ওজন নিয়ে চিন্তায় আছেন? তাহলে প্রতিদিন স্ট্রবেরি খান। দেহে জমে থাকা অতিরিক্ত মেদ ঝরবে

স্ট্রবেরিতে থাকা পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম রক্তচাপ কমায়। তাই হাইপারটেনশন কম থাকে

ত্বকের বুড়িয়ে যাওয়া রোধ করে। চুলের যত্নে খেতে পারেন স্ট্রবেরি

দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে স্ট্রবেরি

দাঁত সাদা করে

উৎস: উইকিপিডিয়া, এগ্রোবাংলা ডটকম ও কৃষি তথ্য সার্ভিস