স্পাইরাল আইল্যান্ড প্লাস্টিক বোতলের দ্বীপ

নিন্দিত প্লাস্টিক যে নন্দিত হতে পারে, তা বোধহয় জানা ছিল রিচার্ট সোয়ার! নইলে কী আর পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই বস্তু দিয়ে দ্বীপ বানাতেন? এর পেছনে ব্যয় করতেন অনেক বসন্ত?
ইংল্যান্ডের নাগরিক রিচার্ট সোয়া। কার্পেন্টার, চিত্রশিল্পী, গায়ক, গীতিকার প্রভৃতি পরিচয় রয়েছে তার। দেশটির আবহাওয়া তার কাছে বৈরী মনে হতো। এ কারণে মেক্সিকোতে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৯৭ সালে মেক্সিকোয় চলে আসেন। দেশটির সমুদ্র উপকূলে তৈরি করেন একটি ভাসমান দ্বীপ। এর পুরোটাই নির্মাণ করা হয়েছে প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে।
প্রথমে বড় একটি জালে বোতলগুলো একত্রিত করেন রিচার্ট। বোতলগুলো বান্ডিল করে ভাসমান দ্বীপটির ভিত্তি তৈরি করেন। এর ওপর মাটি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপকরণ বসান। ধীরে ধীরে তা মাটির একটি দ্বীপে পরিণত হয়। পরে এখানে একটি বাড়ি নির্মাণ করেন। তুলে দেন সীমানা প্রাচীর। নান্দনিক হয়ে ওঠে তার দ্বীপবাস।
এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, রবিনসন ক্রুসোর মতো নির্জন দ্বীপে থাকার ইচ্ছে ছিল তার। তবে সেই দ্বীপের মালিক হওয়ার আকাক্সক্ষাই ছিল প্রবল। দ্বীপটি হতে হবে অভিনব। তাই সৌরশক্তি সঞ্চয়ের জন্য এখানে সোলার প্যালেন বসিয়েছিলেন। সৌরশক্তি ব্যবহার করে রান্না করে সবাইকে পরিবেশসচেতন করে তোলা ছিল তার উদ্দেশ্য।
সে উদ্যোগকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া হয়নি। তাই পাততাড়ি গুটিয়ে পাড়ি জমান পুয়ের্ত অ্যাভেনচুরাসে। এখানে সেই একই কীর্তি। এবার প্রায় আড়াই লাখ প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে নতুন দ্বীপ তৈরি করেন তিনি। এ দ্বীপটি পরে ঝড়ের কবলে। নির্মাণের প্রায় বছরখানেকের পরে এক সামুদ্রিক ঝড়ে এটি লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।
এরপর কৌশলে পরিবর্তন আনেন রিচার্ট। এবার বৈজ্ঞানিক উপায়ে দ্বীপটিকে নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিছুটা পেঁচানো বোতল সংগ্রহ করার পর নষ্ট না হয় এরকম জালে আড়াই লাখ বোতল বেঁধে ভাসিয়ে দিলেন পানির ওপর। হয়ে গেল তার নতুন দ্বীপ। আবহাওয়া যেন অনুকূলে থাকে, তাই গাছপালাও লাগালেন। সেই দ্বীপে একটি দোতলা বাড়ি আর সৌরশক্তি ব্যবহার করে রান্নার ব্যবস্থা রাখেন তিনি। পরে এমিলি হ্যারিকেনের কবলে পড়ে দ্বীপটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আবার নতুন উদ্যমে ক্যানকুনের আইলা মুজেরেসের কাছে জয়ক্সিতে নতুন একটি দ্বীপ নির্মাণ করেন। এর নাম রাখেন ‘স্পাইরাল আইল্যান্ড’। এতে এক লাখ বোতল ব্যবহার করেন তিনি। কেউ কেউ বলে থাকেন, প্রায় দেড় লাখ বোতল ব্যবহার করা হয়েছে এতে। দ্বীপে বোতলের ওপর মাটি ফেলে চাষের উপযোগী করেন। কাঠ ও শুকনো পাতা দিয়ে তৈরি করেন ছোট একটি কুটির। এখানে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করেন। এখানে রয়েছে ছোট জলাশয়, জলপ্রপাত ও নদী। দ্বীপের গঠনও বেশ মজবুত। ঝড়বাদলে তেমন সমস্যা হয় না।
২০০৮ সাল থেকে দ্বীপটি জনসাধারণের জন্য উš§ুক্ত। সংগত কারণে পরিণত হয়েছে পর্যটন স্পটে। এ দ্বীপের খবর চাউর হয়ে যায় বিশ্বের অনেক প্রান্তে। জোডি বাওলিন নামের একজন আমেরিকান সুপার মডেল জানতে পারেন বোতল দ্বীপের নাম। তার মনেও ধরে যায় রিচার্টের সৃষ্টিকর্ম। ফেসবুকের পরিচিতি পেরিয়ে জোডি দ্বীপটি দেখতে আসেন। রিচার্টের সঙ্গে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। রিচার্ট দুবার বিয়ে করেন। তার চারটি সন্তান ও ছয়টি নাতি-নাতনি রয়েছে।
রিচার্ট সোয়ার দেখাদেখি পানামার বোকাস দেল তোরো রাজ্যের দ্বীপ ইসলা কোলোনে প্লাস্টিক বোতলের একটি প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছে। এটি নির্মাণ করেছেন একজন কানাডিয়ান। প্রায় ৪০ হাজার পুরোনো বোতল দিয়ে প্রাসাদটি তৈরি করেন তিনি। তবে এখানে নানা চিত্রকর্মের মাধ্যমে প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিকটি তুলে ধরা হয়েছে। প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষকে অবগত করতে এমন প্রাসাদ নির্মাণ করেন তিনি।

রতন কুমার দাস