স্প্রেডসংক্রান্ত নির্দেশনা পরিপালন নিশ্চিত করুন

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে জানা গেছে, স্প্রেডসংক্রান্ত নির্দেশনা পরিপালন করছে না দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বেশ কয়েকটি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান। এর মধ্য দিয়ে ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশ পরিপালন না হওয়ার বিষয়টি যেমন স্পষ্ট হয়, তেমনি প্রমাণ হয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্তৃত্বের দুর্বলতা। যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ, তারা এ তালিকায় রয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে। জানামতে, দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রত্যেক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশ পরিপালনে বাধ্য। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে, স্প্রেডসংক্রান্ত নির্দেশনা পরিপালনে বাংলাদেশ ব্যাংক তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্য করতে পারছে না কেন? দীর্ঘ সময় পরিপালনের বাইরে থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা নেই। আমাদের ধারণা, এটা করা না হলে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কাক্সিক্ষত হারে মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে এমন ধারা অব্যাহত রাখবে। এজন্য যেসব প্রতিষ্ঠান নির্দেশনা অনুযায়ী এখনও স্প্রেড পাঁচ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনেনি, তাদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ প্রত্যাশিত।

ব্যাংকগুলো স্প্রেডসংক্রান্ত নির্দেশনা পরিপালন না করায় আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতা উভয়ের স্বার্থই ক্ষুণœ হচ্ছে। এতে আমানতকারীরা পাচ্ছেন কম মুনাফা আর ঋণগ্রহীতাদের দিতে হচ্ছে অপেক্ষাকৃত বেশি সুদ। বস্তুত প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন মনোভাবের প্রধান কারণ হলো বেশি হারে পরিচালন মুনাফা অর্জনের চেষ্টা। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় সংবিধিবদ্ধ সঞ্চিতি রাখতেই ব্যাংকগুলোর ব্যয় হচ্ছে ওই মুনাফার বড় অংশ। আর এটি পুষিয়ে নিতেই প্রতিষ্ঠানগুলো যে স্প্রেডসংক্রান্ত নির্দেশনা পরিপালন করছে না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতিষ্ঠানগুলোকে এও মনে রাখতে হবে, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় তাদের যে ব্যবসায়িক ক্ষতি হচ্ছে, এর দায় আমানতকারীর ওপর কোনোভাবেই চাপানো উচিত নয়। আর ঋণের সুদহার কমানো না হলে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের পক্ষে ‘ভালো গ্রাহক’ পাওয়াও কঠিন হবে; যে কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসাও হতে পারে ক্ষতিগ্রস্ত।

সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ যথার্থই বলেছেন, আমানতকারীকে সুদ কম দেওয়ার ধারা অব্যাহত থাকলে এক সময় তারা ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নিয়ে অন্য জায়গায় বিনিয়োগ করবেন। আমানত কমে গেলে ব্যাংক খাতে ঋণের সুদহার আরও বাড়বে। তাতে এর প্রতি ঋণগ্রহীতাদের আকৃষ্ট করা হয়ে পড়বে বেশ কঠিন। বিভিন্ন সঞ্চয়পত্রে সুদহার এখনও ব্যাংক খাতের মুনাফার প্রায় দ্বিগুণ। এ অবস্থায় স্বভাবতই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে বেশি ঝুঁকবে মানুষ। পুঁজিবাজারমুখীও হতে পারেন অনেকে। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা বেরিয়ে সঞ্চয়ের অন্যান্য ক্ষেত্রে চলে গেলে আর্থিক খাতে তা তৈরি করতে পারে ভারসাম্যহীনতা। আমরা চাইবো, প্রয়োজনের স্বার্থেই এসব দিক বিবেচনায় রাখবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। স্প্রেডসংক্রান্ত নির্দেশনা পরিপালন ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে আলোচনায়ও বসতে পারে সংস্থাটি।

এটাও ঠিক, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যাংক তার নিজস্ব নীতিমালার আলোকে আমানত ও ঋণের সুদহার নির্ধারণ করতে পারে। তবে এমন যুক্তি দেখিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা পরিপালনের বাইরে থাকার সুযোগ নেই। কেননা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ স্বার্থের বিষয়ে যতটা সচেতন, গ্রাহকের ব্যাপারে ততটা নয়। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব হলো গ্রাহক স্বার্থ রক্ষা করা। এজন্য আমরা চাইবো, অন্যগুলোর মতোই স্প্রেডসংক্রান্ত নির্দেশনা পরিপালন নিশ্চিতের ব্যাপারে কঠোর মনোভাব দেখাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এটি পরিপালনকে ‘ক্যামেলস রেটিং’য়ের অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কিছুদিন আগে। তারপরও কোনো প্রতিষ্ঠান যদি এ নির্দেশনা পরিপালনে ইতিবাচক মনোভাব না দেখায়, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিকল্প উপায় খুঁজতে হবে। আমরা চাইবো, উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে তাও ভাবতে শুরু করবেন নীতিনির্ধারকরা।