স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলেই প্রবৃদ্ধির সুফল পাবে হতদরিদ্ররা

জিডিপি, মাথাপিছু আয় ও রিজার্ভ প্রভৃতির প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দেশ এগিয়ে গেলে এর আর্থ-সামাজিক অবস্থায় প্রভাব পড়বে। কিন্তু সাধারণ মানুষ সুফল না পেলে এত সব প্রবৃদ্ধি কেবল সংখ্যা হিসেবে গণ্য হবে। প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষ যে সঠিকভাবে পাচ্ছে না, তা অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যেও উঠে এসেছে। সরকারের এ নীতিনির্ধারকের মুখে উচ্চারিত হয়েছে, দেশে এক কোটির বেশি মানুষ হতদরিদ্র। তবে তিনি আশাবাদী, প্রতি বছর দুই শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারলে দেশে হতদরিদ্র থাকবে না। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ইনফ্রাসস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেড-বিআইএফএফএল আয়োজিত ‘বিআইএফএফএল গ্রিন অ্যান্ড পিপিপি কনভেনশন অ্যান্ড এক্সপো ২০১৮’ প্রদর্শনীর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন।
আর্থিক সামর্থ্যরে অভাবে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মতো আবশ্যকীয় ব্যয় নির্বাহে সমর্থ হয় না অনেকে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকে এ দারিদ্র্যের প্রকৃতিকে দুটি দিক থেকে মাপা হয়। দৈনিক মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণ ও আয় দিয়ে এ দুটি সূচক তৈরি হয়। খাদ্য গ্রহণের সূচকে যারা প্রতিদিন ২ হাজার ১২২ কিলোক্যালরির কম খাবার গ্রহণ করে, তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে। আর ১ হাজার ৮০৫ কিলোক্যালরির কম গ্রহণকারীরা চরম দারিদ্র্যের শিকার। মাথাপিছু আয়ের হিসাবে বিশ্বব্যাংক প্রদত্ত দারিদ্র্যের সীমা হলো দৈনিক ২ ডলার। অর্থাৎ যারা দৈনিক ২ ডলারও আয় করতে পারে না, তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে। আর যাদের আয় দৈনিক ১ ডলার ২৫ সেন্টেরও কম, তারা চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করে। কোন সূচকের ভিত্তিতে অর্থমন্ত্রী হতদরিদ্রের সংখ্যা বলেছেন, তা অবশ্য তিনি বলেননি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য কি না, তাও বলেননি। তবে তথ্যটি বিবিএস পরিবেশিত হলে এটিকে নির্ভরযোগ্য মনে করবেন না বিশেষজ্ঞরা।
যা হোক, অর্থমন্ত্রী এমন সময় ‘এক কোটি লোক হতদরিদ্র’ বলে মন্তব্য করলেন, যখন দেশ উন্নয়নশীল দেশের তকমা লাভের অপেক্ষায়। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এমডিজি অর্জন করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এসডিজি অর্জন করতে যাচ্ছে। এখন এক কোটি লোককে হতদরিদ্র রেখে কীভাবে আমরা উন্নয়নশীল দেশের পর্যায়ে পৌঁছাব, কীভাবে এসডিজি অর্জিত হবে, কীভাবেই বা বিভিন্ন রূপকল্প বাস্তবায়িত হবে, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। যে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষ পায় না, সেটি তো আদৌ কোনো উন্নয়ন নয়। সে ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল’ দাবির যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। একটি বড় জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের বাইরে রেখে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয় বলেই আমরা মনে করি। এ বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হলে বাংলাদেশ আরও পিছিয়ে যেত বলেই ধারণা।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুফলভোগী করতে তাদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি জোরদার করলেই হবে না; এক্ষেত্রে থাকতে হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। এর আওতায় রাষ্ট্র কর্তৃক দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে দেওয়া আর্থিক বা অন্য কোনো সহায়তা প্রদানে অনিয়ম-দুর্নীতি থাকলে তালিকাভুক্তরা সুফল পাবে না। আর্থিক কিংবা খাদ্য সহায়তা ছাড়াও তাদের কাজের ব্যবস্থা করতে হবে।
দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্রে (পিআরএসপি) ১৮টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চিহ্নিত। এগুলোর উল্লেখযোগ্য হলো বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও দুস্থ মহিলা ভাতা, দৈহিক অক্ষমতাসম্পন্ন দুস্থ ভাতা, দরিদ্র মায়েদের ভাতা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, অনাথ আশ্রম কর্মসূচি, জ্বালানি তেলে ভর্তুকি, প্রাথমিক স্কুলের ছাত্রদের ভাতা, ছাত্রীভাতা, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ভাতা, পোশাকশিল্প শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা তহবিল প্রভৃতি।
দারিদ্র্যের কারণে মানুষ মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে না। যথাযথ সুযোগ-সুবিধার অভাবে মানবসম্পদে পরিণত হতেও পারে না। তাদের জীবনযাত্রার মানও হয় নি¤œমুখী। এ কারণে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে সমাজে অস্থিরতাও দেখা দেয়।
সমস্যার সমাধানে অদক্ষ জনশক্তিকে দক্ষ করে তুলতে হবে। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য উপযুক্ত কারিগরি শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের নেওয়া কর্মসূচিকে অপ্রতুল বলা চলে না। তবে সুশাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার, নজরদারি না থাকায় তা থেকে প্রত্যাশিত ফল আসছে না। আইনের শাসন, সুবিচার, সুশাসন নিশ্চিতকরণে কার্যকর রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে দারিদ্র্য বিমোচন অবশ্যই সম্ভব।