প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

স্বরূপে ফিরছে না পুঁজিবাজার

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: পতনের ধারা অব্যাহত রয়েছে দেশের পুঁজিবাজারে। চলমান এই পতন ঠেকাতে তথা বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও একটা পর একটা উদ্যোগ ভেস্তে যাচ্ছে। কোনো উদ্যোগেই কাজ হচ্ছে না। ফলে পতনের কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিমত, মূলত বিনিয়োগকারীদের মনোগত কারণে বাজারের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।
চলতি বছরের শুরু থেকেই পুঁজিবাজার নিন্মমুখী অবস্থায় রয়েছে। মাঝেমধ্যে দু-এক দিন বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও তা স্থায়ী হয়নি। ফলে বাজারে স্থিতিশীলতাও আসেনি। পতনের লাগাম টানতে নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ার বিক্রির চাপ কমানোর পদক্ষেপ, দুর্বল কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ঠেকানোর উদ্যোগ, ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়ানো অর্থাৎ তালিকাবর্হিভূত কোম্পানিতে বিনিয়োগ সীমার বাইরে রাখা, বিনিয়োগের জন্য ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) তহবিল প্রদান প্লেসমেন্ট নৈরাজ্য বন্ধসহ নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো।
সম্প্রতি স্টক এক্সচেঞ্জ, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আইপিও আবেদন গ্রহণ ও প্লেসমেন্ট বন্ধের ঘোষণা দেয় বিএসইসি। একই সঙ্গে আইপিও প্রক্রিয়ায় তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালক ও প্লেসমেন্টধারীদের শেয়ারের লক ইন (বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা) সীমা বাড়ানো হয়। পাশাপাশি আইপিও, প্লেসমেন্ট, আইপিও-পরবর্তী বোনাস শেয়ার এবং উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের এককভাবে দুই শতাংশ ও সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণসংক্রান্ত বিদ্যমান নোটিফিকেশনের সংশোধনী আনতে গঠন করা হয় দুটি কমিটি।
একইভাবে সরকারের নির্দেশে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য আইসিবিকে ৮৫৬ কোটি টাকার তহবিল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
পাশাপাশি বাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য তালিকাবহির্ভূত কোম্পানিগুলোর শেয়ার বিনিয়োগসীমার মধ্যে না ধরার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এক্সপোজারে সংশোধনী আনা এবং আইসিবিতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একক গ্রাহকের ঋণসীমার শর্ত শিথিলের আশ্বাস দেওয়া হয়।
এদিকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা কাজে আসেনি। বেশিরভাগ শেয়ার বিনিয়োগের উপযোগী থাকার পরও থামেনি পতন। বিষয়টি নিয়ে কথা বললে বাজারসংশ্লিষ্টরা বলেন, সাম্প্রতিক পতনটা একেবারেই মনোগত। বাজারের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা ঠিক করতে পারছেন না সাধারণ বিনিয়োগকারীরা, যে কারণে তারা দোলাচলে রয়েছেন। অনেকে কম দরে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন, যে কারণে পতনের বেগ আরও বাড়ছে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘পুঁজিবাজারে এখন যেভাবে পতন চলছে, এর যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। মূলত বিনিয়োগকারীদের মনস্তাত্ত্বিক কারণেই পতন চলছে।’ এ অবস্থায় কী করা উচিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের উচিত শেয়ার বিক্রি না করে ধরে রাখা। তাদের আবেগি না হয়ে বাস্তববাদী হওয়া উচিত।’
জানতে চাইলে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘এই পতন আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। বাজারে এখন অধিকাংশ শেয়ারই বিনিয়োগযোগ্য। এ অবস্থায় বাজার নিন্মমুখী হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘আমার মতে এটা মনোগত কারণ। ভয় পেয়ে যখন বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি শুরু করেন, সে প্রভাব অন্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বাজারে দ্রুত পতন নেমে আসে।’ বিনিয়োগকারীদের ভয়ের কিছু রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন যে অবস্থা রয়েছে, সেখান থেকে বাজার পড়বে বলে মনে করি না।’
যদিও বিষয়টিতে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন অনেকেই। তাদের মতে, বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় নেই। তারা ইচ্ছা করেই বাজারে দরপতন ঘটাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি মার্চেন্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘বাজার একটি চক্রের হাতে জিম্মি রয়েছে। তারাই কৃত্রিমভাবে বাজারের দৃশ্যপট পরিবর্তন করছেন, যার প্রভাবে প্রতারিত হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।’

সর্বশেষ..