স্বাগত মাহে রমজান

সিয়াম সাধনার মাস রমজান সমাগত। এ মাসে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করবেন ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা। আমরা আশা করি, সারা বিশ্বে মুসলমানদের এ সাধনা নির্বিঘ্ন হবে; আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে তারা লাভ করবেন মহান সৃষ্টিকর্তার বিশেষ অনুগ্রহ। বস্তুত অন্যান্য মাসের তুলনায় বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে রমজান হাজির হয় ভিন্নভাবে। মাসটিতে ধর্মীয় কর্মকাণ্ড যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি বেড়ে ওঠে ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এটি চলতে থাকে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ইফতার ঘিরে বিশেষ কিছু খাদ্যপণ্যের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে ওঠে এ মাসে। জাকাত, ফিতরা, সদকা, ওমরাহ আর ইতিকাফ ঘিরেও যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হয়, তাতে সমৃদ্ধির বার্তা থাকে। এজন্য ধর্মীয় তো বটেই, আর্থ-সামাজিক বিবেচনায়ও মাসটিকে দেখা হয় গুরুত্বসহকারে। সিয়াম সাধনার পাশাপাশি ধর্মীয় অনুভূতি আর বিশ্বাস থেকে পরিচালনা করা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো মানুষ যেন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে পারে, সে লক্ষ্যেও এখন তাই নিতে হবে যথাযথ পদক্ষেপ।
এ মাসে বাড়তি মুনাফা হাসিলে বিশেষ কিছু নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর অভিযোগ পাওয়া যায় একশ্রেণির ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। চাহিদা বৃদ্ধি সত্ত্বেও জোগান যদি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে দাম বাড়বে এটাই বাজারের নিয়ম। রমজান ঘিরে বাড়তি চাহিদার বিষয় বিবেচনায় রেখেই কিন্তু সংশ্লিষ্ট পণ্যের জোগান বাড়ানো হয়। তাহলে দাম বাড়বে কেন, এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সর্বোচ্চ বেচাবিক্রির মৌসুমে মুনাফা না করে অন্যান্য মাসের অপেক্ষায় থাকবেন ব্যবসায়ীদের দিক থেকে দেখলে এর পক্ষে যুক্তি খুঁজে পাওয়াও মুশকিল। এজন্য আমরা চাইব, এ মাসে সহনীয় পর্যায়ে মুনাফার নীতি অনুসরণ করবেন ব্যবসায়ীরা। বিক্রি বৃদ্ধির মাধ্যমে কাক্সিক্ষত মুনাফা অর্জন তাদের জন্য কিন্তু কঠিন হবে না। মুনাফায় তারা যদি কিছুটা সংযমের পরিচয় দেন, তাহলে সিয়াম সাধনার উদ্দেশ্যও কিছুটা হাসিল হবে।
রমজানের শেষে হাজির হয় ঈদুল ফিতর। এ উৎসব ঘিরে কেনাকাটা অবশ্য শুরু হয় মাসটি শুরুর আগে থেকেই। উৎসব নিকটবর্তী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়ে নগর ও শহরের বিপণিবিতানে। রাস্তায় পড়ে এর দৃশ্যমান প্রভাব। যানজট বেড়ে ওঠার কারণে নির্দিষ্ট গন্তব্যে কাক্সিক্ষত সময়ে পৌঁছা কঠিন হয়ে পড়ে। মসজিদে তারাবিহ নামাজ আদায় ও কেনাকাটার জন্য রাতের একটি অংশ ঘরের বাইরে থাকেন অনেকে। দুষ্কৃতকারীরা এর সুযোগ নিয়ে আইন-শৃঙ্খলার বিঘœ ঘটায় অনেক স্থানে। এসব ঘটনা এড়াতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর যথাযথ প্রস্তুতিও দেখতে চাইব আমরা। রমজানের শুরু থেকেই সড়কে বাড়তি মনোযোগ দেওয়া হলে মানুষের যাতায়াতে ভোগান্তি কিছুটা হলেও কমানো যাবে। পণ্য পরিবহনও হবে সহজতর।
বাড়তি পুণ্য লাভের আশায় আর্থিক কিছু ইবাদতও এ মাসে পালন করেন অনেকে। এমন কর্মকাণ্ড ঘিরে দুর্ঘটনার উদাহরণও রয়েছে। আশা করব, এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয় এ রমজানে। এসব কার্যক্রমে সংশ্লিষ্টরা যদি স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেন, তাহলে তা এড়ানো সম্ভব বৈকি। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার বড় উদ্দেশ্য হলো নৈতিকতা, শুদ্ধাচার, শিষ্টাচার ও আত্মসংযমে দক্ষতা অর্জন। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে আমরা অনেকেই কিন্তু প্রয়োজনীয় ধৈর্য ধারণ ও সংযমী মনোভাবের পরিচয় দিতে ব্যর্থ হই। মনে রাখা চাই, ইসলামের এ শিক্ষা শুধু ধর্মীয় জীবনের জন্য নয় এর উদ্দেশ্য আরও বিস্তৃত। জীবনের আরও ব্যাপক পরিসরে যদি এর চর্চা না করি, তাহলে সামাজিক সমৃদ্ধি অর্জন ও স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হবে। এ ধরনের ‘সামাজিক পুঁজি’র অভাবেও কিন্তু ব্যাহত হয় উন্নয়ন। আসন্ন রমজান মানুষের আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ লাভের পথ সুগম করার পাশাপাশি এসব সামাজিক পুঁজি বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখবে বলে আশা।