স্মরণ: আনোয়ার হোসেন

আনোয়ার হোসেন চলচ্চিত্র ভুবনে নবাব সিরাজউদ্দৌলা বা ‘মুকুটহীন সম্রাট’ নামে খ্যাত। এ অভিনেতা ১৯৫৮ সালে চিত্রায়িত ‘তোমার আমার’ সিনেমার মাধ্যমে সিনেমা জগতে আসেন। ৫২ বছরের অভিনয় জীবনে পাঁচ শতাধিক মিনেমায় কাজ করেছেন তিনি।

আনোয়ার হোসেন ১৯৩১ সালের ৬ নভেম্বর জামালপুর জেলার সরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম নজির হোসেন ও মায়ের নাম সাঈদা খাতুন। নজির-সাঈদা দম্পতির তৃতীয় সন্তান আনোয়ার হোসেন। ১৯৫১ সালে তিনি জামালপুর স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরবর্তী সময়ে ভর্তি হন ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে। স্কুল জীবনে প্রথম অভিনয় করেন আসকার ইবনে সাইকের ‘পদক্ষেপ’ নাটকে। ১৯৫৭ সালে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং নাসিমা খানমকে বিয়ে করেন।

পরিচালক মহিউদ্দিনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুবাদে প্রথম পরিচয়েই আনোয়ার হোসেন তার অভিনয় দক্ষতা প্রমাণ করে ‘তোমার আমার’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান।

এক সাক্ষাৎকারে আনোয়ার হোসেন তার অভিনয় জীবন শুরুর কথা বলেন এভাবে ‘ছেলেবেলায় স্কুলের নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে অভিনয়ের প্রতি আমার আসক্তি জন্মায়। এরপর তখনকার রুপালি জগতের তারকা ছবি বিশ্বাস, কানন দেবী এদের বিভিন্ন সিনেমা দেখতে দেখতে রুপালি জগতে আসার ইচ্ছাটি প্রবল থেকে প্রবলতর হয়। ৫০ দশকের শেষদিকে সিদ্ধান্ত নিলাম অভিনয় করবো সারা জীবন। সুতরাং অন্য কোনো জীবিকার সন্ধান না করে সরাসরি চলে গেলাম পরিচালক মহিউদ্দিন সাহেবের কাছে। তিনি তখন ‘মাটির পাহাড়’ নামে একটি সিনেমার কাজ করছিলেন। তাকে ধরলাম আমাকে নেওয়ার জন্য। তিনি জানালেন, ছবিতে অভিনয়শিল্পী নির্বাচনের কাজ শেষ। ফলে আমাকে নেওয়া যাচ্ছে না আপাতত। ৫৮ সালে শুরু করলেন ‘তোমার আমার’ সিনেমার কাজ। এখানে আমাকে নির্বাচন করা হলো খলনায়ক চরিত্রে। আমার রুপালি পর্দায় অভিষেক হলো ভিলেন হিসেবে। এ সিনেমায় আমার সহশিল্পী ছিলেন কাফী খান, আমিনুল ইসলাম প্রমুখ।’

আনোয়ার হোসেন জহির রায়হান, আলমগীর কবির, আমজাদ হোসেন, কাজী জহির, নারায়ণ ঘোষ মিতাসহ তার সময়ের বাংলাদেশের প্রায় সব বিখ্যাত পরিচালকের সিনেমায় অভিনয় করেন।

বাংলাদেশে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রবর্তিত হয় ১৯৭৫ সালে। প্রথম বছরই আনোয়ার হোসেন শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে এ পুরস্কার লাভ করেন। নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত ‘লাঠিয়াল’ সিনেমায় অভিনয় করে তিনি এ পুরস্কার লাভ করেন। আমজাদ হোসেনের ‘ভাত দে’ সিনেমায় অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেতার পুরস্কার পান ১৯৭৮ সালে। ২০১০ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা পান। এছাড়া তিনি ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের নিগার পুরস্কার পান। ১৯৮৮ সালে ভূষিত হন একুশে পদকে, বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন ১৯৯৩ সালে এবং ওয়ালটন-বৈশাখী স্টার অ্যাওয়ার্ড পুরস্কার পান ২০১১ সালে।

তার উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘সূর্যস্নান’ (১৯৬২), ‘কাচের দেয়াল’ (১৯৬২), ‘বন্ধন’ (১৯৬৪), ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ (১৯৬৭), ‘অপরাজেয়’ (১৯৬৭), ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০), ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ (১৯৭২), ‘রংবাজ’ (১৯৭৩), ‘ধীরে বহে মেঘনা’ (১৯৭৩), ‘আলোর মিছিল’ (১৯৭৪), ‘লাঠিয়াল’ (১৯৭৫), ‘পালঙ্ক’ (১৯৭৬), ‘রূপালী সৈকতে’ (১৯৭৭), ‘নয়নমণি’ (১৯৭৭), ‘কুয়াশা’ (১৯৭৭), ‘নাগরদোলা’ (১৯৭৮), ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ (১৯৭৮), ‘সূর্য সংগ্রাম’ (১৯৭৯), ‘বড় ভালো লোক ছিল’ (১৯৮২), ‘ভাত দে’ (১৯৮৪), ‘চাকর’ (১৯৯২), ‘অনন্ত ভালোবাসা’ (১৯৯৯) অন্যতম।

আনোয়ার হোসেন ২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।