স্মরণ: হাছন রাজা

মরমি কবি ও সাধক হাছন রাজার প্রকৃত নাম দেওয়ান হাছন রাজা চৌধুরী। ১৮৫৪ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনি সুনামগঞ্জের লক্ষ্মণশ্রী গ্রামে এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী। হাছন রাজার পিতৃকুল ও মাতৃকুল উভয়ই ছিল অযোধ্যাবাসী ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী। পরে  ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তারা সুনামগঞ্জ আসেন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

হাছন রাজার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। ১৫ বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়ার পর সংসার ও জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব নেন। যৌবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত শৌখিন ও ভোগবিলাসী। তবে পরিণত বয়সে সব বিষয়-সম্পত্তি বিলিবণ্টন করে দরবেশরূপে জীবনযাপন করেন। তারই উদ্যোগে সুনামগঞ্জ হাছন এমই স্কুল, অনেক ধর্মপ্রতিষ্ঠান ও  আখড়া স্থাপিত হয়। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও তিনি করতেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও হাছন রাজা ছিলেন একজন সুশিক্ষিত ব্যক্তি। তিনি সহজ-সরল সুরে আঞ্চলিক ভাষায় প্রায় এক হাজার আধ্যাত্মিক গান রচনা করেন। স্থানীয় বাউল-ফকিরেরা সেসব গান গেয়ে তাকে পরিচিত করে তোলেন। হাছন রাজা ছিলেন একজন ঐশীপ্রেমী, সেই প্রেমে মাতোয়ারা হয়েই তিনি গান রচনা করতেন। তার গানে প্রেম ও বৈরাগ্যময় আধ্যাত্মিক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। তার গানগুলো যেন হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের একটি মিলনক্ষেত্র। তিনি গানের ভনিতায় নিজেকে ‘পাগলা হাছন রাজা’, ‘উদাসী’, ‘দেওয়না’, ‘বাউলা’ প্রভৃতি বলে অভিহিত করেছেন। তিনি কৈশোর ও যৌবনে শ্রীকৃষ্ণের নানাবিধ লীলায় অভিনয়ও করেছেন।

হাছন রাজার মুখ্য পরিচয় হলো তিনি একজন মরমি কবি। তার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতীয় দর্শন কংগ্রেসের অধিবেশনে (ওহফরধহ চযরষড়ংড়ঢ়যরপধষ ঈড়হমৎবংং) সভাপতির ভাষণে হাছন রাজা সম্পর্কে বলেছিলেনÑ

“পূর্ববঙ্গের একজন গ্রাম্য কবির (হাছন রাজা) গানে দর্শনের একটি বড় তত্ত্ব পাই; সেটি এই যে, ব্যক্তিস্বরূপের সঙ্গে সম্বন্ধ সূত্রেই বিশ্ব সত্য। তিনি গাহিলেনÑ

‘মম আঁখি হইতে পয়দা আসমান জমিন

শরীরে করিল পয়দা শক্ত আর নরম

আর পয়দা করিয়াছে ঠাণ্ডা আর গরম

নাকে পয়দা করিয়াছে খুসবয় বদবয়।’

এই সাধক কবি দেখিতেছেন যে, শাশ্বত পুরুষ তাহারই ভিতর হইতে বাহির হইয়া তাহার নয়নপথে আবির্ভূত হইলেন। বৈদিক ঋষিও এমনইভাবে বলিয়াছেন যে, যে পুরুষ তাহার মধ্যে তিনিই আধিত্যমণ্ডলে অধিষ্ঠিত।

রূপ দেখিলাম রে নয়নে, আপনার রূপ দেখিলাম রে।

আমার মাঝত বাহির হইয়া দেখা দিল আমারে॥”

১৯৩০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘হিবার্ট লেকচারে’ রবীন্দ্রনাথ ‘ঞযব জবষরমরড়হ ড়ভ গধহ’ শীর্ষক যে বক্তৃতা করেন, তাতেও তিনি হাছন রাজার দর্শন ও সংগীতের উল্লেখ করেন।

হাছন উদাস (১৯০৭), শৌখিন বাহার, হাছন বাহার প্রভৃতি গ্রন্থে হাছন রাজার গানগুলো সংকলিত হয়েছে। ১৯২২ সালের ৭ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।