স্মৃতিতে ছোটবেলার ঈদ

মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ: ছোটবেলার সবকিছু ছিল আজকের এ সময়ের তুলনায় অন্যরকম, মজার। বিশেষ করে ঈদ মানে তো অন্যরকম এক আনন্দ। ছোটবেলার ঈদের খুশি আর আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না বলেও বোঝানো যাবে না। এ আনন্দের রেশ থাকত ঈদের কয়েকদিন আগ থেকে কয়েকদিন পর পর্যন্ত। ঈদের দিনের ভালা লাগা ছিল অতুলনীয়।
আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা গ্রামে। আমরা যারা গ্রামে বড় হয়েছি, তাদের কাছে ঈদের আবেদনটা হয়তো আলাদা। ঈদের বেশ কয়েকদিন আগেই স্কুল ছুটি। অর্থাৎ পড়ালেখা বন্ধ। সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে খেলা আর পরিকল্পনা করা  ঈদের সময়টাতে কি করা যায়?
ঈদের স্মৃতি নিয়ে অনেক কথা বলা যায়, লেখা যায়। আজও ঈদগাহে গেলে ছোট ছেলেমেয়েদের দুরন্তপনা দেখলে নিজের ছোটবেলায় চলে যাই। তবে যে স্মৃতিটি সবসময় মনে উঁকি দেয়, সেটি হলো ঈদের সময় দোকান দেওয়ার স্মৃতি।
ক্লাস ফোর থেকে সিক্সÑএ সময়কার ঘটনা। রোজা শুরুর আগে থেকেই তিন-চারজন বন্ধু মিলে টাকা জমানো শুরু করতাম ওই সময়ের ঈদে। আরও যুক্ত হতো ঈদের সালামি। ঈদের সপ্তাহ খানেক আগে একেকজনের ভাগে ৫০ টাকা কিংবা তার একটু বেশি জমতো। চারজন হলে জমত ২০০ টাকার মতো। এই টাকা দিয়েই আমরা ঈদের দিন ঈদগাহের পাশের মাঠে দোকান দিতাম।
ঈদের সপ্তাহ খানেক আগে চারজন মিলে চলে যেতাম হাটে। গ্রাম থেকে হাটের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। সে সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা এতো ভালো ছিল না। তখনকার দিনে পায়ে হেঁটেই হাটে যেতাম। একসঙ্গে দুষ্টামি করতে করতে যেতে ভালোই লাগতো। সপ্তাহের মঙ্গলবার ছিল হাটবার। হাটবারে মানুষ আর মানুষ। আমরা একটু আগেই চলে যেতাম। হাট থেকে চানাচুর, বিস্কুট, সন্দেশ, হজমি, মনেক্কা, চকোলেট কিনতাম পাইকারি দামে। পুঁজি যেহেতু কম, ইচ্ছা করলেও খুব বেশি কিছু কেনার সুযোগ ছিল না।
এসব কিনে বাড়িতে এসে একজনের পড়ার টেবিলে রাখতাম। ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকেই বিক্রি শুরু করতাম। আমাদের বয়সীরাই ক্রেতা। কখনও কখনও ঈদের আগেই কোনো একটা আইটেমের পুরোটা শেষ হয়ে যেত কিংবা সব মিলিয়ে প্রায় অর্ধেক জিনিস বিক্রি হয়ে যেত।
ঈদের আগের দিন থেকেই মহা ব্যস্ততা শুরু হয়ে যেত। কারণ আমাদের বাড়ি থেকে ঈদগাহ অনেকটা দূরে। যাওয়ার কোনো সোজা রাস্তা ছিল না তখন। ক্ষেতের আইল দিয়ে হেঁটে যেতে হতো। ঈদগাহের পাশে যে খোলা জায়গাটায় অস্থায়ী দোকানপাট বসতো সে জায়গাটাও ছিল ছোট। তাই সুবিধামতো জায়গায় নিজেদের টেবিল বসানোর জন্য আমাদের সকাল সকাল যেতে হতো। সকাল মানে একেবারে সকাল। ফজরের পরপর।
আমরা ভোর ৪টার দিকেই ঘুম থেকে উঠতাম। এমনও হয়েছে দুই একবার ঘুমাইনি। ভোর ৪টা থেকেই আমাদের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যেত। ঈদের দিন আমাদের প্রধান বিক্রির আইটেম থাকতো ঝালমুড়ি। ভোর বেলা উঠেই ঝালমুড়ির জন্য সালাদ বানাতে হতো। আগের দিন বাজার থেকে সালাদের অনুষঙ্গ পেঁয়াজ, মরিচ, খিরা এগুলো নিয়ে রাখতাম। তখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। তাই ভোরবেলা কুপি জ্বালিয়ে এগুলো কাটাকাটি করতাম। কষ্ট বা বিরক্ত লাগতো না কখনও, পুরো ব্যাপরাটাই ছিল ভীষণ মজার। সালাদ বানানো শেষ হলে গোসল সেরে নিতাম। ঈদ যদি শীতের সময় হতো তাহলে গোসল করতে আলসেমি চলে আসতো। তখন নদীর ধারে গিয়ে সবাই মিলে আগুন পোহাতাম। এরপর শরীর গরম করে চোখ বন্ধ করে ডুব দিতাম। গোসল সেরেই নতুন কাপড় পড়ে বাকিরা ঘুম থেকে উঠার আগেই আমরা চেয়ার টেবিল আর অন্য জিনিসপত্র নিয়ে ঈদগাহ মাঠের দিকে ছুটতাম।
সুবধিামতো জায়গায় দোকান বসাতাম, কিছুটা স্বস্তির শুরু হতো তখন। এরই মধ্যে অন্যারাও চলে আসতেন তাদের জিনিসপত্র নিয়ে। বেলা বাড়ার সঙ্গে ঈদগাহ মাঠ ও এর আশপাশ ভরে উঠতো সব বয়সের মানুষের পদচারণে। তবে দোকানগুলো থাকতো কম বয়সীদের দখলে। ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই ছোট। মূলত যারা তখনো ঈদগাহে গিয়ে নামাজ পড়তো না তারাই সারাক্ষণ দোকানগুলোতে ঘুরে বেড়াত, কোনো কিছু পছন্দ হলে তা ক্রয় করত।
আমাদের প্রথম লক্ষ্য থাকতো পরিচিতরা। পরিচিতদের সহজেই দোকানে টানা যেত। তাছাড়া প্রায় সব দোকানে একই রকম জিনিস পাওয়া যেত। এরপর আমাদের লক্ষ্য ছিল অন্যরা।
মোটামুটি দুপুর পর্যন্ত দোকানের হাঁকডাক চলতো। প্রায় সবকিছুই বিক্রি হয়ে যেত। তখন ঝালমুড়ি বিক্রি হতো এক টাকায়, সন্দেশ ৫০ পয়সায়। মনেক্কা চারটা এক টাকা, হজমির প্যাকেট ১০টা এক টাকা। লজেন্স ৫০ পয়সা।
বিক্রি শেষে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বাড়ির দিকে ছুটতাম। আবার ক্ষেত পেরিয়ে বাড়ি ফেরা। ফেরার পথে জমিতে বসে আমরা হিসাব করতাম। ২০০ টাকার পুঁজিতে প্রায় ১০০ টাকা লাভ হতো। তার মানে একজনের ভাগে লাভ থাকতো ২৫ টাকা। ৫০ টাকায় ২৫ টাকায় লাভ। খুব সামান্য হলেও সে মজা ছিল অপার্থিব।
পরে এ টাকায় খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করতাম। তখন এক কেজি গরুর মাংস পাওয়া যেত ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। তাই সবার টাকা মিলিয়ে ভালোই ভূরিভোজ হতো। এরপর এ মজার জন্য আরেকটি ঈদের অপেক্ষায় থাকতাম।
এখন বড় হয়েছি। এখনও ঈদের সময় সে একই ঈদগাহে যাই। নামাজ পড়ি। পরিচিত জনদের সঙ্গে কোলাকুলি আর কুশল বিনিময় করি। সব মানুষের জন্য দোয়া চাই সৃষ্টিকর্তার কাছে। সেই মাঠের কাছ দিয়ে গেলে এখনও ছোটবেলার স্মৃতিরা ভিড় করে মনে। ফিরে যাই সে সময়ে যখন নিজেকে ছাড়া অন্য কোনো দায়িত্ব বা কর্তব্য মাথায় ছিল না। নিজেকে নিয়েও এত চিন্তা ছিল না তখন। ইচ্ছা
করলেও এখন আর সে অবস্থায় ফেরার সুযোগ নেই, পারবও না।
ভালো থাকুক আমার ছোটবেলা।