স্ম র ণ : অরুন্ধতী দেবী

রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা ছোটগল্পের ভুবনে যে কজন বিশেষ স্থান দখল করে আছেন, তাদের অন্যতম সুবোধ ঘোষ। তার অন্যতম জনপ্রিয় গল্প ‘জতুগৃহ’র মাধুরী রায় হিসেবে তাকে ১৯৬৪ সালে সেলুলয়েডে বন্দি করেছিলেন বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার তপন সিংহ। তাতে শতদল দত্তের ভূমিকায় ছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। উত্তম কুমারের বিপরীতে তিনি আরও কিছু ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। উত্তমের সঙ্গে তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হচ্ছেঃ‘নবজন্ম’ (১৯৫৬), ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’ (১৯৫৮), ‘ঝিন্দের বন্দী’ (১৯৬১), ‘বিচারক’ (১৯৬২) প্রভৃতি। হ্যাঁ, অরুন্ধতী দেবীর কথাই বলা হচ্ছে। তিনি ১৯২৫ সালে বাংলাদেশের বরিশালের বিখ্যাত গুহঠাকুরতা পরিবারে জন্গ্রমহণ করেন। পারিবারিকভাবেই একটা সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন তিনি। ছোটবেলায় নৃত্য ও সংগীতের অনুশীলন করেছেন। অরুন্ধতী দেবী গান শিখেছেন বিশ্বভারতীর অধ্যাপক শৈলজারঞ্জন মজুমদারের কাছে। সংগীত ও নৃত্য ছাড়াও তখন থেকে তার ঝোঁক ছিল অভিনয়ের প্রতি। মাত্র ছয় বছর বয়সে অভিনয়ে হাতেখড়ি; রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ নাটকে অমলের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। এরপর রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে ‘মায়ার খেলা’ নাটকে অভিনয় করেন তিনি। বিখ্যাত চিত্রনির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিউ থিয়েটারসের ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ (১৯৫২) ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তার পথচলা শুরু। চিত্রনাট্যকার বিনয় চট্টোপাধ্যায় নিউ থিয়েটারসের সঙ্গে তাকে যোগাযোগ করিয়ে দেন। প্রথম ছবিতেই অভিনয়ের নিজস্ব ধারায় তার বিশিষ্টতা প্রমাণ করেন। এরপর আর থেমে থাকেননি। একের পর এক ছবিতে অভিনয় ক্ষমতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে এগিয়ে গেছেন। এসবের মধ্যে ‘নদ ও নদী’ (১৯৫৪), ‘বকুল’ (১৯৫৪), ‘সতী’ (১৯৫৪), ‘প্রশ্ন’ (১৯৫৪), ‘গোধূলি’ (১৯৫৫), ‘মা’ (১৯৬০), ‘পঞ্চতপা’ (১৯৬০), ক্ষুধিত পাষাণ (১৯৬০) ও ‘দুজনার’ (১৯৫৫) অন্যতম। শুধু অভিনয়ই নয়, তিনি বেশ কয়েকটি ছবি পরিচালনাও করেন। চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও অরুন্ধতী দেবী যে উল্লেখযোগ্য, তা বোঝা যাবে নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত সম্পাদিত শতবর্ষে চলচ্চিত্র গ্রন্থে অনীল চৌধুরী রচিত ‘সিনেমার বিভিন্ন দিক’ নিবন্ধের কিছু অংশ পাঠ করলে। তাতে তিনি লিখেছেন, ‘…সিনেমায় বিভিন্ন শিল্পকলা জড়িতÑযেমন সাহিত্য, নাটক, অভিনয়, সংগীত ইত্যাদি। এসব এক সঙ্গে মিলিত হয়ে একটি নতুন শিরায় রূপান্তরিত হয়, যার নাম সিনেমা। … অল্পসংখ্যক পরিচালক ওই বিভিন্ন শিল্পকলায় পারদর্শী এবং সিনেমা তৈরির নানাবিধ জ্ঞানে নিজেকে সমৃদ্ধ করে পরিচালক হতে পেরেছেন। কিছু পরিচালক হয়েছেন সাহিত্য ক্ষেত্র থেকে শৈলজানন্দ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, জ্যোতির্ময় রায় প্রমুখ; শিশির ভাদুড়ি, নরেশ মিত্র, উৎপল দত্ত প্রমুখ নাট্যজগৎ থেকে; চলচ্চিত্রের অভিনেতা মহল থেকে প্রমথেশ বড়ুয়া, বিকাশ রায়, উত্তম কুমার, দিলীপ রায়, সুখেন দাশ প্রমুখ, অভিনেত্রী মহল থেকে অরুন্ধতী দেবী, মঞ্জু দে, অপর্ণা সেন প্রমুখ …’

অরুন্ধতী দেবী পরিচালিত ছবিগুলো হচ্ছে গোকুল’ (১৯৮৫), ‘দীপার প্রেম’ (১৯৮৩), ‘পদিপিসির বর্মী বাক্স’ (১০৭২), রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত ‘মেঘ ও রৌদ্র’ (১৯৬৯) এবং ‘ছুটি’ (১৯৬৭)।

আজ অরুন্ধতী দেবীর প্রয়াণ দিবস। ১৯৯০ সালের এই দিনে মারা যান তিনি।