সড়কে প্রাণহানি পরিবহন খাতের অবদানকে যেন ম্লান না করে

এমএফ হোসেন: সড়কে মৃত্যুর মিছিল যেন থামছেই না। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান বিক্ষোভের মাঝেই শুক্রবার (৩ আগস্ট) রাজধানীর মগবাজারে এক মোটরসাইকেল আরোহী ও টাঙ্গাইলে এক ছাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন। প্রতিদিন গড়ে ১২ জনকে সড়ক বিশৃঙ্খলার জন্য প্রাণ দিতে হয়। বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা গেছে, ১৩ বছরে ৫৯ হাজার ৯৪১টি দুর্ঘটনায় ৬৮ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে, আহত হয়েছে দুই লাখের বেশি। ঈদযাত্রায় মৃত্যুর মিছিল আরও বেড়ে যায়। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, গেল জুনে ঈদুল ফিতরের সময় ঈদযাত্রার ১৩ দিনে ৪১৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এআরআই) হিসাবে শহরাঞ্চলে হওয়া দুর্ঘটনার ৭৪ ভাগই হয়ে থাকে ঢাকায়।
প্রশ্ন উঠছে, আসলেই কি এসব দুর্ঘটনা, নাকি হত্যাকাণ্ড? গত ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর এ প্রশ্ন জোরেশোরে এসেছে। এ ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ঢাকাসহ দেশজুড়েই বিক্ষোভ করেছে। তারা চোখে আঙুল দিয়ে প্রশাসনকে দেখিয়ে দিচ্ছেÑচলমান আইন ও ব্যবস্থার প্রয়োগ যদি সঠিকভাবে করা যায়, তাহলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব। শিক্ষার্থীরা যেভাবে গাড়িচালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করেছে, এটা তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। সড়কে স্থায়ীভাবে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে এ বিশৃঙ্খলার পেছনে আসলে দায় কার, সে বিষয়ে আমাদের আগে ভাবতে হবে।
প্রথমেই আসি পরিবহন চালকের কথায়। একজন গাড়িচালক ও শ্রমিককে প্রতিদিন গড়ে ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। ১০ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে যে কোনো মানুষের ক্লান্তি বোধ হওয়া স্বাভাবিক। এই ক্লান্তি দূর করতে বিভিন্ন ধরনের মাদকে ঝুঁকে পড়েন পরিবহন শ্রমিকরা। গত ১২ এপ্রিল মালিক-শ্রমিকদের এক যৌথ সভায় খোদ মালিকরা জানান, ঢাকার ৯৫ শতাংশ বাসচালক মাদকাসক্ত। এর ফলে কী হয়? বুয়েটের এআরআই ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, একজন চালক ইয়াবা সেবন করে গাড়ি চালালে নিজেকে আত্মবিশ্বাসী বোধ করেন। এতে বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালালেও তার কাছে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হয়। আবার বিপদ আঁচ করতে দেরি হওয়ায় যথাসময়ে গাড়ি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে না।
শ্রমিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুমুখে পতিত হন পরিবহন শ্রমিকরাই। শ্রম খাত নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) হিসাব বলছে, ২০১৭ সালে এ খাতেই সবচেয়ে বেশি ৩০৭ শ্রমিক মারা গেছেন। তারপরও কী বোধোদয় হয়েছে? আমরা বলব হয়নি! কেন হয়নিÑএর জবাব পেতে গেলে আমাদের আরেকটু গভীরে যেতে হবে। দেশে ৭০ লাখের মতো চালক থাকলেও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) লাইসেন্স আছে মাত্র ১৬ লাখের। বাকিরা লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছেন। কীভাবে চালাচ্ছেন? এর উত্তর রাস্তায় বের হলেই অহরহ দেখা যায়।
আবার যারা লাইসেন্স পাচ্ছেন, তারা কি সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে পাচ্ছেন? বিআরটিএ’র অফিসগুলোয় দালালের দৌরাত্ম্য দেখলে এর উত্তর পাওয়া যায়। তার মানে নিয়ন্ত্রণকারী দুটি প্রতিষ্ঠান ট্রাফিক বিভাগ ও বিআরটিএ’র মধ্যে যে দুর্নীতির চর্চা হয়ে আসছে, তা আগে বন্ধ করতে হবে। চাইলেই লাইসেন্স না দিয়ে যথাযথ নিয়মকানুন মেনেই তা দিতে হবে। অন্যদিকে লাইসেন্স ছাড়া সড়কে নামলে শাস্তি কিংবা জরিমানার মুখে পড়তে হবে, তা বোঝাতে দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ তৈরি করতে হবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সেটা করে দেখিয়েছে। একাধিক মন্ত্রী থেকে শুরু করে গণমাধ্যম, এমনকি পুলিশ প্রধানের গাড়িচালকেরও যে লাইসেন্স নেইÑতাও প্রকাশ হয়ে পড়েছে।
চালকদের লাইসেন্স না থাকার পাশাপাশি তাদের কর্মঘণ্টা ঠিক করে দিতে হবে। তাদের বেতনভুক্ত শ্রমিক হিসেবে যাতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত রফতানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্প। এ খাতে সরাসরি ৪০ লাখ শ্রমিক জড়িত। তৈরি পোশাককে সরকার যেভাবে গুরুত্ব দেয়, সেভাবে কি পরিবহন খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? এ খাতেও কম-বেশি ৪০ লাখ শ্রমিক সরাসরি জড়িত। তাদের জীবনমানের উন্নতি তো দূরে থাক, কর্মঘণ্টাই ঠিক করা যাচ্ছে না। অথচ পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের উন্নয়নে সরকার কয়েক অর্থবছরের বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখছে।
চলতি অর্থবছরে এক লাখ ৭৯ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা উন্নয়ন খাতে ব্যয় করবে সরকার। এর মধ্যে পরিবহন খাতে সর্বোচ্চ ২৬.৬ শতাংশ বা পৌনে ৪৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এ ব্যয়ের বেশিরভাগই যাবে সড়কের উন্নয়ন ও সংস্কারে। কিন্তু যারা এই সড়কে গাড়ি চালাবেন, তাদের উন্নয়নে কোনো প্রকল্প কী নেওয়া হয়েছে? পরিবহন খাতের শ্রমিকদের দক্ষতা কিংবা জীবনমান উন্নয়ন-সংক্রান্ত কোনো প্রকল্পের কথা এখনও শোনা যায়নি। কেন তাদের উন্নয়ন হচ্ছে না? এ উন্নয়নের পেছনে বড় বাধা পরিবহন মালিকরা। চুক্তিভিত্তিক গাড়ি দিয়ে তারা তাদের প্রতিদিনের আয় নিশ্চিত করেন। শ্রমিকরা কী পেল-না পেল, এটা তারা দেখেন না। যদি শ্রমিকদের উন্নয়ন হয়, তাহলে তাদের আয় কমে যেতে পারে। তাই এটিও বিশৃঙ্খলার আরেক উৎস।
চুক্তির কারণে গাড়িগুলো যত বেশি ট্রিপ দিতে পারে, তত লাভ হবে। এমন তাড়না, ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা ও মাদকাসক্তÑএ তিনে মিলে সড়কে কাউকে পরোয়া করেন না পরিবহন শ্রমিকরা। ফল হিসেবে দেখি প্রায় সব সময়ই যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার। এমনকি হরহামেশা যাত্রী লাঞ্ছনার ঘটনাও ঘটছে। যেহেতু তাদের কেউ বাধা দিচ্ছে না, তাই হয়ে পড়ছে বেপরোয়া। এখন আর মারধর নয়, মানুষ মেরেই ফেলছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মেরে নদীতে ফেলে দেওয়া তারই প্রমাণ। বাসগুলোর মধ্যে মরণ প্রতিযোগিতা বন্ধে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। সেখানে বাসগুলোকে কয়েকটি পরিবহন কোম্পানির মাধ্যমে রাখার কথা ছিল। বাস মালিকরা হবেন এসব কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার। যা আয় হবে, তা সবাই সমভাবে ভাগ করে নেবেন। এ ব্যবস্থা কার্যকর করা ছাড়া রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ ব্যবস্থা কার্যকর করলে আবার অনেকের স্বার্থে আঘাত লাগতে পারে। কমে যেতে পারে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি। বলা হয়ে থাকে, এ খাত হচ্ছে কাঁচা টাকার উৎস। পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি নিয়ে গবেষণা না থাকলেও গণমাধ্যমে আসা বিভিন্ন তথ্যে দেখা যায়, প্রতিদিন এ খাত থেকে ছয় থেকে ১১ কোটি টাকা তোলা হয়। এ টাকার ভাগ শ্রমিক সংগঠনগুলো যেমন পায়, তেমনি পান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পর্যন্ত। এ খাত কালোটাকার অন্যতম বড় উৎস। তাই শৃঙ্খলা ফেরাতে গেলে স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহলগুলো তা করতে দেবে বলে মনে হয় না। এর আগে আমরা দেখেছি সড়ক পরিবহন আইন পাসের উদ্যোগ নিলেও পুরো দেশের মানুষকে জিম্মি করে তা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবারও আইনটি পাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে আইন করলেই যে যথাসময়ে বিচার নিশ্চিত হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সড়ক দুর্ঘটনায় হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির হার মাত্র ১০ ভাগ। মামলা নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকে সুবিচার চাওয়ার আশা ছেড়ে দেন। আবার অনেক সময় মালিক ও শ্রমিকপক্ষের হুমকির কারণেও মামলা তুলে নিতে বাধ্য হন ভুক্তভোগীরা। এসব সমস্যা নিরসনের পাশাপাশি বহু বছর ধরে চলে আসা এ খাতের দুর্নীতি বন্ধ করাই হতে পারে একমাত্র বড় সমাধান।
আর দুর্নীতি বন্ধে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছার। কিন্তু সেই সদিচ্ছা আমরা খুব একটা দেখি না। না দেখার পেছনে কারণ পরিবহন খাতের দুর্নীতির টাকার ভাগ সব সময় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো পেয়ে থাকে। এমনকি সরকারের একজন মন্ত্রী এ খাতের শ্রমিক সংগঠনের কার্যকরী সভাপতি। মন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ করা। কিন্তু বরাবরই আমরা দেখেছি তিনি জনগণ নয়, শ্রমিকদের স্বার্থ দেখেছেন। তারই আশকারায় পরিবহন খাতের শ্রমিকরা এত বেশি বেপরোয়া বলে অভিযোগ আছে। অন্যদিকে নানা সময়ের রাজনৈতিক আন্দোলনে এ খাতের শ্রমিকদের ব্যবহার করা হয়। বলা হয়ে থাকে, দ্রুত কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হলে সবার আগে হাতের কাছে পাওয়া যায় এই শ্রমিকদেরই।
তাই শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে আগে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আসতে হবে। লোক দেখানো কিংবা বিক্ষোভ প্রশমিত করতে কিছু পদক্ষেপ হয়তো সাময়িক সমাধান এনে দেবে, কিন্তু সেটি টেকসই হবে না। পরিবহন খাত আমাদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখছে। অভ্যন্তরীণ সেবা খাতের অন্যতম বড় খাত এই পরিবহন সেবা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে এ খাতের অংশগ্রহণ ১১ দশমিক ১২ শতাংশ, যার মধ্যে রেলসহ সড়ক পরিবহনের অবদান সাত দশমিক এক শতাংশ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে পরিবহন খাতের অবদান ছিল সাড়ে ১১ শতাংশ। জিডিপিতে অংশগ্রহণ কমে আসার পেছনে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা শুধু সড়কের উন্নয়নে আটকে থাকার কারণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবকিছুর সামগ্রিক উন্নয়নে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। সড়কে প্রাণহানি পরিবহন খাতের অবদানকে কোনোভাবে যেন ম্লান না করে, সে ব্যবস্থাও নিতে হবে।

গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]