সড়ক মেরামতে বন্ধ হোক অপচয়

প্রতিবছর জুন মাস কিংবা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা এলে সড়ক-মহাসড়ক মেরামতের তোড়জোর পড়ে যায়। ঈদের আগে মেরামতের কাজ করা হয় গ্রামের বাড়ি ফেরা মানুষের ভ্রমণে স্বস্তি দেওয়ার জন্য। আর জুন মাসে মেরামত করা হয় বাজেট বরাদ্দ নিঃশেষ করার জন্য। কয়েক বছর যাবৎ ঈদ আর জুন কাছাকাছি চলে আসায় এখন ঈদ সামনে রেখেই সড়ক মেরামত করা হয়। এ সূত্রে গেল ঈদের আগেও ভাঙাচোরা সড়ক-মহসড়ক মেরামত করা হলো।
সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণে বাংলাদেশে ব্যয় সবচেয়ে বেশি। এশিয়ার অন্যান্য দেশসহ ইউরোপের যে কোনো দেশের তুলনায় অধিক ব্যয় করা হয় সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণে। ইউরোপে চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ২৮ কোটি টাকা। ভারতে ব্যয় ১০ কোটি আর চীনে ১৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে বাংলাদেশে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয়ের পরিমাণ ৫৯ কোটি টাকা। এদিকে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়ক চার লেন নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৫ কোটি টাকা। এত বিপুল ব্যয় করে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণের পর আবার কয়েক বছরের মধ্যেই তা মেরামত করতে হয়, যা দুর্ভাগ্যজনক।
এমনও অভিযোগ রয়েছে, ঈদের আগে জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে সড়ক মেরামত করা হয়। ফলে ঈদ শেষেই কর্মস্থলে ফিরতে মানুষ নতুন করে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-রংপুর, ঢাকা-বরিশাল, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দশা যাত্রীদের কষ্ট দিয়েছে বেশি। এসব মেরামতে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন পরই আবার চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে সড়ক-মহাসড়ক। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভাঙাচোরা সড়ক মরামত ও পুনর্নির্মাণে আগামী পাঁচ বছরে ব্যয় হবে ২১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরেই এতে প্রয়োজন ১৫ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। বরাদ্দ নিয়ে কেউ হয়তো প্রশ্ন তুলবেন না। কিন্তু প্রশ্ন উঠবে, যদি সড়ক মেরামতের কয়েক মাসের মধ্যেই তা পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। এ থেকে প্রমাণ মেলে, কী পরিমাণ অর্থের অপচয় বা দুর্নীতি হয় এ ধরনের কাজে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এসব দেখভালের যেন কেউ নেই। একজন অবসর প্রাপ্ত প্রকৌশলীর মতে, সড়ক মেরামত বাবদ বরাদ্দের অর্ধেকও সঠিকভাবে কাজে লাগানো হলে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না। বরাদ্দকৃত অর্থের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ চলে যায় মেরামতের বাইরে বিভিন্ন খাতে।
সওজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৯ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার সড়কের অবস্থা ভালো। ৩ হাজার ৬৪০ কিলোমিটারের অবস্থা মোটামুটি। ২ হাজার ১১৫ কিলোমিটার সড়কের অবস্থা দুর্বল। এখন প্রতিবছর মেরামতের পরও ৪৭ শতাংশ সড়কের অবস্থা ভালো না থাকার কারণ খুঁজে বের করা প্রয়োজন। চাই মেরামত কাজের মান নিশ্চিত করা। নতুন সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ বা মেরামত কাজের মান নিশ্চিত করা গেলে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে; এতে মেরামতের ব্যয়ও কমে আসবে। সেক্ষেত্রে প্রতিবছর নতুন নতুন সড়ক নির্মাণও সম্ভব হবে। অন্যথায় কোটি কোটি টাকা অপচয় হবে; কিন্তু যাত্রীদুর্ভোগ লাঘব হবে না, সহজ হবে না পণ্য পরিবহনও। দেশও কাক্সিক্ষত গতিতে এগোতে পারবে না।