হামিদ ফেব্রিকসের আয়-মুনাফায় ধস

তালিকাভুক্তির পর উল্টোপথে

পলাশ শরিফ: ঋণ পরিশোধ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য পুঁজিবাজার থেকে ১০৫ কোটি টাকা নিয়েছে হামিদ ফেব্রিকস। এরপর পেরিয়েছে প্রায় চার বছর। তার পরও বস্ত্র খাতের ওই কোম্পানিটির অবস্থার উন্নতি হয়নি, বরং তালিকাভুক্তির পর কোম্পানিটির আয়-মুনাফা কমেছে। এর মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বদলে উল্টো পিছিয়েছে হামিদ ফেব্রিকস। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় শেয়ারদরও এখন ইস্যুমূল্যের নিচে।
তথ্যানুসন্ধানে মিলেছে, ২০১৭ সালের জুন শেষ হওয়া আর্থিক বছরে হামিদ ফেব্রিকসের আয় প্রায় ১৩২ কোটি ২৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা এর আগের আর্থিক বছরের তুলনায় প্রায় পাঁচ কোটি টাকা কম। তবে কোম্পানিটির আয় কমা নতুন নয়। তালিকাভুক্তির পর থেকেই আয় কমছে। তালিকাভুক্তির এক বছর আগে ২০১২-১৩ আর্থিক বছরে বস্ত্র খাতের কোম্পানিটির আয় দেখানো হয়েছে ২১২ কোটি চার লাখ টাকা, যা তালিকাভুক্তির পর সর্বশেষ সমাপ্ত আর্থিক বছরে ১৩২ কোটি ২৬ লাখ টাকায় নেমেছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির আয় প্রায় ৭৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বা ৩৭ দশমিক ৬২ শতাংশ কমেছে।
এদিকে আয় কমায় হামিদ ফেব্রিকসের পরিচালন মুনাফাও টানা কমছে। ২০১২-১৩ আর্থিক বছরে কোম্পানিটির পরিচালন মুনাফা ৫২ কোটি ২৬ লাখ টাকা ছিল, যা সর্বশেষ সমাপ্ত আর্থিক বছরে ২১ কোটি ৮৫ লাখ টাকায় নেমেছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির পরিচালন মুনাফা প্রায় ৩০ কোটি ৪১ লাখ টাকা বা ৫৮ দশমিক ১৮ শতাংশ কমেছে।
আয়-পরিচালন মুনাফা কমার প্রভাবে গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে হামিদ ফেব্রিক্সের কর-পরবর্তী মুনাফা প্রায় ১৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বা ৭১ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ কমেছে। তালিকাভুক্তির আগে ২০১২-১৩ আর্থিক বছরে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা ছিল ২৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, যা সর্বশেষ সমাপ্ত আর্থিক বছর শেষে সাত কোটি ২০ লাখ টাকায় নেমেছে। অর্থাৎ শতকোটি টাকা নতুন বিনিয়োগের পরও পাঁচ বছরে হামিদ ফেব্রিক্সের কর-পরবর্তী মুনাফা প্রায় ১৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বা ৭১ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ কমেছে।
তবে আয়-মুনাফা কমার কারণ সম্পর্কে কোম্পানিটির দায়িত্বশীলরা মুখ খুলছেন না। হামিদ ফেব্রিক্সের কোম্পানি সচিব এএসএম মিজানুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘কোম্পানির যত তথ্য-উপাত্ত আছে সেগুলো নিয়ম মেনে প্রকাশ করা হচ্ছে। আয়-মুনাফার তথ্যও নিরীক্ষিত-অনিরীক্ষিত প্রতিবেদনে রয়েছে। এর বাইরে কিছু বলার নেই। আমি এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। একদিন অফিসে আসেন, সাক্ষাতে কথা বলি।’ এরপর সাক্ষাতের জন্য কয়েক দফায় সময় চাইলে ‘আজ নয়, পরে কোনো একদিন আসেন’ বলে এড়িয়ে গেছেন।
তথ্যমতে, হামিদ ফেব্রিক্স তিন কোটি সাধারণ শেয়ার ছেড়ে পুঁজিবাজার থেকে ১০৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। এই অর্থে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও ঋণ পরিশোধের ঘোষণা দিয়েছিল মাহিন গ্রুপের কোম্পানিটি। আইপিও অর্থে বড় অংশই (প্রায় ৭২ কোটি ২০ লাখ টাকা) ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যয় করার ঘোষণা দিয়েছিল কোম্পানিটি। আর ৩০ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ঋণ পরিশোধে ব্যয়ের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ব্যবসা সম্প্রসারণের পর আয়-মুনাফায় উল্টোপথে হাঁটছে হামিদ ফেব্রিক্স। অন্যদিকে ঋণ পরিশোধের পর নতুন করে ঋণ নেওয়ায় কোম্পানিটির মোট ঋণও বেড়েছে। আইপিওতে আসার সময় হামিদ ফেব্রিক্সের স্বল্পমেয়াদি হিসেবে প্রায় ১২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ও দীর্ঘমেয়াদি হিসেবে প্রায় ৬১ কোটি টাকা ঋণ ছিল। আর সর্বশেষ সমাপ্ত আর্থিক বছর শেষে বস্ত্র খাতের কোম্পানিটির মোট ঋণ প্রায় ৮৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে তিন কোটি শেয়ার ছেড়ে পুঁজিবাজার থেকে ১০৫ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে হামিদ ফেব্রিক্স। এর মধ্যে ৭৫ কোটি টাকাই প্রিমিয়াম। প্রতি শেয়ারের বিপরীতে ২৫ টাকা প্রিমিয়াম নিয়েছে কোম্পানিটি। হামিদ ফেব্রিক্সের প্রায় ৯ কোটি ১০ লাখ শেয়ারের মধ্যে ৫১ দশমিক ৭৪ শতাংশই উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে। এর বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ২৫ দশমিক ৮০ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ২২ দশমিক ৪৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। মুনাফায় পিছিয়ে পড়ায় কোম্পানিটির শেয়ারদরও দুই বছরের বেশি সময় ধরে ইস্যুমূল্যের (৩৫ টাকা) নিচে রয়েছে। কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ার ডিএসইতে ২৭ টাকার নিচে লেনদেন হচ্ছে।