‘হালখাতা’য় ঋণ আদায়ের চেষ্টা ব্যাংকগুলোর

বাংলা নববর্ষ

শেখ শাফায়াত হোসেন: ১৪২৬ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখে বকেয়া ঋণ আদায় বা নবায়নের জন্য গ্রাহককে নিয়ে ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’ আয়োজনের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মতো কয়েকটি সরকারি ব্যাংকও দীর্ঘদিন ধরে হালখাতা করে গ্রাহকের কাছ থেকে বকেয়া ঋণ আদায়ের চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে সোনালী ব্যাংকও বিভিন্ন শাখায় হালখাতার আয়োজন করে থাকে। বকেয়া ঋণ আদায়ের তাগাদার পাশাপাশি গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য এ আয়োজন করা হয় বলে জানিয়েছেন ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা।
আজ ১৪২৬ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ। এ উপলক্ষে এবারও গ্রাহক ও শুভানুধ্যায়ীদের হালখাতার দাওয়াত দিতে ময়মনসিংহে কৃষি ব্যাংকের ত্রিশাল শাখা হতে মাইকিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। গত মঙ্গলবার উপজেলার কানিহারী ইউনিয়নে অটোরিকশায় মাইক লাগিয়ে ঋণ পরিশোধে বিভিন্ন সেøাগান, কৃষিবান্ধব ও দেশাত্মবোধক গান বাজিয়ে গ্রাহকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে দেখা গেছে ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের।
‘বৈশাখ মাসে কচু ভালো- চৈত্র মাসে লতা, কৃষক ভাইকে বলে যাই করতে হালখাতা’, ‘কৃষি ব্যাংক দিচ্ছে ডাক- কৃষক ভাই জাগরে জাগ, করতে হবে হালখাতা- লিখতে হবে ঋণের পাতা’ এমন সব সেøাগানে কৃষি ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঋণগ্রহীতাদের হালখাতার আমন্ত্রণ জানানো হয়।
পয়লা বৈশাখের দিন যেহেতু ব্যাংক বন্ধ থাকে, সেহেতু ব্যাংকগুলো এর আগের শেষ কর্মদিবসে হালখাতা করে। কোনো কোনো ব্যাংক পয়লা বৈশাখের পর যেদিন ব্যাংক খোলা থাকে, সেদিনই হালখাতা করে আসছে।
এক্ষেত্রে বরাবরের মতো এবারও এগিয়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। ১১ এপ্রিল হালখাতার আয়োজন করে ব্যাংকটি। এ উপলক্ষে ব্যাংকটির এক হাজার ৩৪ শাখায় চলে মিষ্টি দিয়ে গ্রাহককে আপ্যায়ন। ব্যাংকটির শাখায় শাখায় ছিল নানা ধরনের প্রচার। ওয়েবসাইটেও হালখাতার আমন্ত্রণ জানিয়ে একটি ব্যানার করা হয়। বৈশাখের মোটিফ সংবলিত নানা আলপনায় সাজানো হয় ওয়েবসাইটটি।
ব্যাংকটির কর্মকর্তারা জানান, হালখাতার মূল উদ্দেশ্য হলো শাখার ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে বেশি করে ঋণ আদায় ও নতুন স্কিম সম্পর্কে গ্রাহককে অবহিত করা।
গত বছর নববর্ষে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক দেশের সব শাখায় হালখাতা থেকে এক লাখ ২৯ হাজার ৫৮১ ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে ৪৭৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ঋণ আদায় করে। এর মধ্যে ৮৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা পুরোনো খেলাপি ঋণ ছিল। হালখাতায় ২৬ হাজার ৪৭০ ঋণগ্রহীতার মাঝে ৩৯০ কোটি টাকা ঋণও বিতরণ করা হয়। এছাড়া ব্যাংকটির সারা দেশে অবস্থিত শাখাগুলোয় ৩০ হাজার ৩৩৬ আমানতকারীর কাছ থেকে বিভিন্ন হিসাবে ২০৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা আমানত সংগৃহীত হয়।
গতবারের মতো এবারও কৃষি ব্যাংকের হালখাতা অনুষ্ঠানে সব গ্রাহক ও শুভানুধ্যায়ীকে আমন্ত্রণ জানান ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইল এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আলী হোসেন প্রধানীয়া।
আলী হোসেন প্রধানীয়া বলেন, ‘আশা করছি হালখাতা থেকে আমরা এবার অতীতের যে কোনো সময় থেকে বেশি ঋণ আদায় করতে পারব। সোমবার (আগামীকাল) নাগাদ ঋণ আদায়ের পুরো তথ্য পাওয়া যাবে।’
এদিকে আগামীকাল দেশব্যাপী এক হাজার ২০০’রও বেশি শাখায় একযোগে হালখাতার আয়োজন করছে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড। ঢাকার স্থানীয় একটি শাখায় হালখাতা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে এর উদ্বোধন করবেন ব্যাংকটির এমডি ও প্রধান নির্বাহী মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ।
এছাড়া রাকাবের ৩৮১ শাখায় সপ্তাহব্যাপী হালখাতার আয়োজন চলছে। চলতি সপ্তাহজুড়ে নববর্ষের আয়োজন থাকলেও মূলত আগামী সোমবার সিরাজগঞ্জ থেকে শুরু করে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত রাকাবের বিভিন্ন শাখায় চলবে মিষ্টি-মণ্ডা দিয়ে গ্রাহককে আপ্যায়ন।
রাকাব রাজশাহীর দুর্গাপুর শাখার ব্যবস্থাপক বেনজীর আহমদ গত বৃহস্পতিবার শেয়ার বিজকে বলেন, ‘পুরো সপ্তাহজুড়েই আমাদের হালখাতার আয়োজন রয়েছে। মূলত ঋণ আদায়েই আমরা জোর দিই এ অনুষ্ঠানে। ভালো আদায়ও হয়েছিল গতবার। এবারও ভালো আদায় হবে বলে আশা করছি।’
অন্যান্য ব্যাংক হালখাতার এমন আয়োজন না করলেও বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে শুভেচ্ছাপত্র (গিফট কার্ড) ছাপিয়ে গ্রাহক ও শুভানুধ্যায়ীদের পাঠিয়ে থাকে। এছাড়া বড় বড় গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য কোনো কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বেশ ঘটা করে মিষ্টি-মণ্ডা বিতরণ করে থাকে।